বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০০

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০০

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫৭ জনে পৌঁছেছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৪০০ মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক, নিরাপত্তাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারাও রয়েছেন।

বুধবার (২৬ আগস্ট) দেশটির ভোটেকোশি নদীতে এই ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে।

চীনের তিব্বত অংশে একটি তুষারধসের কারণে লহেন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়ে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। কোনো ধরনের ভারী বৃষ্টির খবর না থাকায় নদীর তীরবর্তী মানুষও এ দুর্যোগের কোনো আগাম সতর্কতা পাননি। খবর কাঠমান্ডু পোস্ট।

রাশুয়া জেলার চীনা সীমান্তসংলগ্ন তিমুরে প্রথম আঘাত হানে এ দুর্যোগ। মুহূর্তের মধ্যে জনবসতি, ঘরবাড়ি, সড়ক ও অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায় পানির প্রবল স্রোত। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, বন্যার পানির উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার পর্যন্ত উঠেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

রাশুয়ার প্রধান কাস্টমস কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা বলেন, সকালে প্রথমে তার মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হয়েছে। বাইরে বের হয়ে তিনি দেখেন, উজান থেকে ধোঁয়ার মতো কিছু নিয়ে বিশাল পানির ঢেউ এগিয়ে আসছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিমুর বাজারের বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বন্যায় সীমান্ত কাস্টমস এলাকায় অপেক্ষমাণ ৩০০টিরও বেশি গাড়ি ও ট্রাক ভেসে গেছে। এরপর স্রোত স্যাফ্রুবেশি ও ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। পথে মানুষ, পশু, বাড়িঘর, সেতু ও সরকারি স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯১ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৪৪ জন নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন।

বন্যায় অন্তত নয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক পানিতে ভেসে গেছে।

নুওয়াকোটের বিদুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র নেপাল জানান, সোল থেকে আক্কারে বাজার পর্যন্ত শত শত বাড়ি বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। অনেক মানুষ নিরাপদে সরে যেতে পারলেও বহু শিশু ও প্রবীণ এখনো নিখোঁজ।

স্থানীয় বাসিন্দা গোকর্ণ অধিকারী বলেন, তার গ্রামের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। অনেক বাড়ি দূর থেকে অক্ষত মনে হলেও সেগুলো কাদা ও ধ্বংসস্তূপে পুরোপুরি ঢেকে গেছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতা প্রকাশ পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগের বিষয়ে নেপালের মানুষকে কেন আগেভাগে সতর্ক করা গেল না?

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার উৎপত্তি তিব্বতের দিকে হলেও নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আগাম তথ্য পায়নি। এমনকি নেপালের নিজস্ব বন্যা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও এবার কার্যকরভাবে সতর্কতা দিতে পারেনি।

ফ্লাড ফোরকাস্টিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ জলবিদ বিনোদ পারাজুলির মতে, বুধবার সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে বিভাগটি বন্যার তথ্য পায়। মাত্র চার মিনিটের মধ্যে ভাটির এলাকাগুলোতে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। তবে ততক্ষণে বন্যার পানি রাশুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পৌঁছে গেছে।

ভোটেকোশি নদীর উজানে স্থাপিত স্বয়ংক্রিয় বন্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোও প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। ফলে নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করলেও সেগুলো কোনো সতর্ক সংকেত পাঠাতে পারেনি।

পারাজুলি বলেন, রাশুয়ায় সময়মতো সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে নুওয়াকোটসহ ভাটির অন্যান্য এলাকায় পাঠানো সতর্কবার্তার কারণে সম্ভবত কয়েক শ মানুষ প্রাণে বেঁচেছেন।

নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে তিব্বতের একটি এলাকায় তুষারধসের পর লহেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষসহ ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।

দুর্যোগের পর নেপালের জলবিদ্যুৎ ও আবহাওয়া বিভাগের কর্মকর্তারা চীনের আবহাওয়া প্রশাসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন। বৈঠকের পর চীন সম্মত হয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে নদীর পানি বাড়তে শুরু করলে নেপালকে দ্রুত তথ্য জানানো হবে।

নেপাল ও চীনের মধ্যে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহযোগিতার বিষয়ে ২০১৯ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে তথ্য আদান-প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়।

তবে বুধবারের ভয়াবহ বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে, কাগজে থাকা চুক্তিকে কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থায় রূপান্তর করা এখনো সম্ভব হয়নি।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে রিয়েল-টাইম সেন্সর, ক্যামেরা ও আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন জরুরি। বিশেষ করে, কোনো দুর্যোগের উৎস যদি সীমান্তের ওপারে হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর আগাম সতর্কতা দেওয়া কঠিন।

গত বছরও একই নদীতে বন্যায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছিলেন এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী মিতেরি সেতুসহ সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানেই আবার ভয়াবহ বন্যার আঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, ওই অঞ্চলের ঝুঁকি এখনো অত্যন্ত বেশি।

ঠিকানা/এনআই

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz