বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​সেরা উপহার

​সেরা উপহার

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কের মে মাসের বাতাসটাতে তখনো হালকা একটা হিমেল ভাব লেগে আছে। সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় হিমেল অনুভূতিটা ক্রমেই বাড়ছিল। চারপাশের এই কনকনে আবহাওয়ার মাঝেই জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে বসেছে ‘নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা’। মেলাজুড়ে বইয়ের স্টল, চেনা-পরিচিত মানুষের ভিড়, নতুন বাংলা বইয়ের গন্ধ আর আড্ডার কলতান। প্রবাসের এই ব্যস্ততার মাঝেও গুলশান মাহমুদের মনটা বারবার ছুটে যাচ্ছিল কয়েক হাজার মাইল দূরে, চিরচেনা ঢাকায়।
মেলা প্রাঙ্গণের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ঢাকা থেকে আসা বইয়ের শেষ কার্টুনটা খুলছিলেন তিনি। কার্টুনগুলো পাঠিয়েছে তার আদরের একমাত্র ছেলে, অন্বয়। মনের ভেতর একধরনের কৌতূহল আর মৃদু উত্তেজনা-এই কার্টুনের ভেতর আর কী কী বই আছে কে জানে! গুলশান মাহমুদ একে একে বিভিন্ন লেখকের নানা বিষয়ের বই নামিয়ে টেবিলে রাখছিলেন। সব বই নামানো শেষ হতেই একদম নিচে তার চোখে পড়ল একটি শপিং ব্যাগ। গুলশান মাহমুদ কিছুটা অবাক হলেন। বইয়ের কার্টুনে শপিং ব্যাগ কেন! অন্বয় তো শুধু বই পাঠানোর কথা বলেছিল।

ইতস্তত মনে ব্যাগটা হাতে তুলে নিলেন তিনি। ভেতর থেকে বের করে আনলেন একটা চমৎকার শার্ট আর একটা সুতি লুঙ্গি। কাপড়ের চেনা সুবাসটা নাক দিয়ে ঢুকতেই বুকটা এক অদ্ভুত গৌরবে ভরে উঠল গুলশান মাহমুদের। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠল গত রমজান মাসের ঢাকা শহরের চেনা ছবিটা।
তীব্র গরম, অন্তহীন জ্যাম আর ইউনিভার্সিটির পড়াশোনার চাপের মাঝেই অন্বয় এবার একটা পার্ট-টাইম চাকরি জুটিয়েছিল। গুলশান মাহমুদ ঢাকা থাকার সময় অন্বয়কে কখনো রোদে পুড়তে দেননি। সেই আদরের ছেলে ইফতারের পর ক্লান্ত-বিধ্বস্ত হয়ে যখন রাতে বাসায় ফিরত, মায়ের মন কেঁদে উঠত। বাবা হিসেবে গুলশান মাহমুদও প্রবাস থেকে ফোনে বলতেন, ‘কী দরকার আব্বাজান এই কষ্টের? পড়াশোনাটায় মন দাও।’ অন্বয় হেসে বলত, ‘তুমি ভাবছ কেন বাবা? আমি তো বড় হচ্ছি, একটু নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখি!’

প্রথম উপার্জনের টাকা হাতে পেয়ে অন্বয় কিন্তু ছেলেমানুষি বিলাসবহুল কোনো ইচ্ছে পূরণ করেনি। বন্ধুদের নিয়ে দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়া কিংবা নিজের জন্য কোনো গ্যাজেট কেনা-সব বাদ দিয়ে সে ছুটে গিয়েছিল শপিংমলে। নিজের জমানো প্রথম টাকা দিয়ে সবার আগে মায়ের জন্য কিনেছিল একটা সুন্দর শাড়ি, আর বাবার জন্য পাঠিয়েছে এই উপহার।

হাতে থাকা সুতি শার্টটা ছুঁয়ে দেখতে দেখতে গুলশান মাহমুদের মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত দামি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পোশাকও এই সাধারণ শার্টটার কাছে নস্যি। এর প্রতিটি সুতোয় জড়িয়ে আছে তার সন্তানের প্রথম উপার্জনের ঘাম আর অফুরন্ত ভালোবাসা। সন্তানের সততা আর পরিশ্রমে মোড়ানো এই উপহারটিই তার জীবনের সেরা উপহার।

দুই.
দেখতে দেখতে বইমেলা শেষ হলো ঈদের দুদিন আগে। আজ ঈদের দিন। সন্ধ্যা নেমে এল নিউইয়র্কের আকাশে। এখানকার ঈদগুলো দেশের মতো অতটা উৎসবমুখর হয় না, যান্ত্রিক জীবনের নিয়মে অনেকেই ঈদের দিনও কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে আজ সন্ধ্যায় সুহৃদ শাহ চৌধুরীর বাসায় একটা ঘরোয়া আড্ডার নিমন্ত্রণ। গুলশান মাহমুদ ঠিক করলেন, আজকের এই বিশেষ সন্ধ্যায় তিনি অন্বয়ের পাঠানো সেই উপহারটিই গায়ে জড়াবেন।

নতুন শার্ট আর সুতি লুঙ্গিটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার মুখে একচিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ছোটবেলায় অন্বয় যখন প্রথম বর্ণমালা শিখে বাবার হাত ধরে মেলায় যেত, তখন গুলশান মাহমুদ ভাবতেন-কবে ছেলে বড় হবে! আজ একজন বাবার কাছে সন্তানের স্বাবলম্বী হওয়ার চেয়ে আর সন্তানের প্রথম আয়ের উপহার গায়ে জড়ানোর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী-ইবা হতে পারে!

শাহ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছাতেই আড্ডা জমে উঠল। ড্রয়িংরুমে বসার জায়গা নেই বললেই চলে। প্রবাসী বন্ধুদের কোলাহলে মনে হচ্ছিল যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যদিও ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই গুলশান মাহমুদ একটু ইতস্তত করছিলেন। নিমন্ত্রিত অন্য অতিথিদের দু-একজন অবশ্য আড়চোখে তাকালেন, কেউ কেউ মৃদু হাসলেন। তাকানোটাই স্বাভাবিক; আমেরিকার বুকে সাধারণত কেউ সুতি লুঙ্গি আর শার্ট পরে কারও বাসায় ঈদের নিমন্ত্রণে যায় না। সবাই স্যুট-কোট কিংবা দামি পাঞ্জাবিতে অভ্যস্ত।
কিন্তু গৃহকর্তা শাহ চৌধুরী তার পোশাকটি দেখে প্রশংসা না করে পারলেন না। মুখে চওড়া হাসির রেখা টেনে বললেন, ‘চমৎকার দেখাচ্ছে তো আপনাকে! একদম খাঁটি বাঙালি বাবু! প্রবাসের ঈদে এমন রূপ সচরাচর দেখা যায় না।’

গুলশান মাহমুদ বুক ফুলিয়ে, গর্বিত হেসে জবাব দিলেন, ‘জানেন শাহ ভাই, এটা সাধারণ কোনো শার্ট-লুঙ্গি নয়। আমার আব্বাজান অন্বয় তার প্রথম পার্ট-টাইম জবের টাকা দিয়ে এটা ঢাকা থেকে আমার জন্য পাঠিয়েছে। এর চেয়ে দামি কোনো পোশাক পৃথিবীর কোনো শোরুমে পাওয়া যাবে না। তাই ভাবলাম, লোকে যা-ই মনে করুক, আজ ছেলের দেওয়া উপহার পরেই ঈদের আড্ডায় যাব।’

গুলশান মাহমুদের মুখে ছেলের এই কৃতিত্বের কথা শুনে ড্রয়িংরুমের গুঞ্জন এক মুহূর্তে থেমে গেল। আড়চোখে তাকানো মানুষগুলোর চোখে তখন কৌতুকের বদলে শ্রদ্ধা আর ঈর্ষার মিশ্রণ। শাহ চৌধুরী আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, ‘খুব ভালো করেছেন ভাই। সত্যি, আপনাকে দারুণ লাগছে। টোটালি অন‍্য রকম এবং রিয়েল!’

গল্পের মাঝখানেই শাহ চৌধুরী তার ডিএসএলআর ক্যামেরাটা হাতে নিলেন। বললেন, ‘এই বিশেষ মুহূর্ত আর এই বিশেষ পোশাকের কিছু ছবি না তুললে তো অন্বয়ের প্রতি অন্যায় হবে!’
ক্যামেরার শাটার ক্লিকের সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেমে বন্দী হয়ে রইল একজন গর্বিত ও সার্থক বাবার অকৃত্রিম হাসিমুখ।

রাতের দিকে যখন চারপাশ কিছুটা শান্ত হলো, গুলশান মাহমুদ মেলা আর আড্ডার ক্লান্তি ভুলে মুঠোফোনটা হাতে নিলেন। ছবিগুলো অন্বয়কে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে পাঠাতে মনে মনে বললেন, ‘ধন্যবাদ আব্বাজান। তোমার এই উপহার আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তোমার জন্য সারা জীবনের দোয়া আর শুভকামনা।’
প্রবাসের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনের মাঝেও এক প্রবাসী বাবার বুকজুড়ে তখন বইছিল এক পরম শান্তির হাওয়া।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz