শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

ফের গণভোটের উদ্যোগে বিতর্ক

ফের গণভোটের উদ্যোগে বিতর্ক

বিজ্ঞাপন
সংবিধান সংশোধনের পর আবার গণভোট আয়োজনের সরকারি উদ্যোগ ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর একই বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আবার গণভোটের প্রয়োজন কেন—এ প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল ও কয়েকজন আইনজ্ঞ। অন্যদিকে সরকার বলছে, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হলে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী গণভোট আয়োজন করতে হবে।
সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন জমা দিতে পারে। এরপর আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদে বিল পাস হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে সংবিধানের মৌলিক কিছু সংশোধনী গণভোটে দেওয়া হবে। তার ভাষ্য, সংবিধানের প্রস্তাবনা, ৮, ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা হলে গণভোট সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
সরকারের এ অবস্থানের পরই সামনে এসেছে আগের গণভোটের রায়ের প্রশ্ন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ ও তাতে থাকা সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর প্রতি জনগণের সম্মতি নেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০টি। ফলে ওই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দেওয়া রায়ের সাংবিধানিক অবস্থান কী এবং সেই রায় বাস্তবায়নের আগেই নতুন গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে তার প্রয়োজনীয়তা কী—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে মূল বিরোধটি সংবিধান ‘সংস্কার’ নাকি প্রচলিত পদ্ধতিতে ‘সংশোধন’ করা হবে, তা নিয়েও। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব পালন করবে—এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। বিরোধী দলগুলোর এমপিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এ অবস্থায় বিরোধী দল বিশেষ কমিটির কার্যক্রমে অংশ নেয়নি এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে।
বিরোধীদের প্রশ্ন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণ যখন ইতিমধ্যে রায় দিয়েছে, তখন আবার নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন কেন। তাদের অভিযোগ, নতুন গণভোটের মাধ্যমে আগের গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে সরকার নিজেদের প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনী অনুমোদন করিয়ে নিতে চাইছে। বিশেষ কমিটির পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, আগের গণভোটকে তারা ধারণ করে; তবে সেটি ছিল জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে, আর এখন সংবিধান সংশোধনের নির্দিষ্ট প্রস্তাবের ওপর সাংবিধানিক গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে।
আইনজ্ঞদের মধ্যেও এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, জুলাই সনদ নিয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় পাশ কাটিয়ে নতুন গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা স্ববিরোধী হতে পারে। তার বক্তব্য, জনগণ ইতিমধ্যে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া ও এর কাঠামো সম্পর্কে মতামত দিয়েছে। সেই রায় ও বাস্তবায়ন আদেশ উপেক্ষা করে পুরোনো পদ্ধতিতে সংশোধনের পথে যাওয়া জনগণের রায়ের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হলেও গণভোটের বিধান পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে। তিনি মনে করেন, এ বিষয়ে আদালতের বিভিন্ন রায় ও বর্তমান সংবিধানের অবস্থান একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আবার ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকের মতে, উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে গণভোটের বিধান সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না—এ প্রশ্নের চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় গুরুত্বপূর্ণ।
গণভোটের বিধান নিয়েও রয়েছে দীর্ঘ সাংবিধানিক পটভূমি। ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে গণভোটের বিধান যুক্ত হয়েছিল। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল হওয়ায় গণভোটের বিধান পুনর্বহালের প্রশ্ন সামনে আসে। সরকার সেই আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কথা বলছে।
ফলে সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নটি এখন শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগের গণভোটের রায়, জনগণের ম্যান্ডেট, সংসদের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্ন। সরকার প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে। বিরোধী দলগুলো চাইছে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদের সংস্কার বাস্তবায়ন। দুই পক্ষের অবস্থানের এই পার্থক্য দূর না হলে নতুন গণভোটের উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz