বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

স্মৃতির আলপনায় আঁকা

(পর্ব-২৫)
স্মৃতির আলপনায় আঁকা

বিজ্ঞাপন
অনেক ভালো মানুষের ভিড়ে একজন খারাপ মানুষ পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে। কোনো একটা সম্পর্কই একতরফা গড়ে উঠতে পারে না। সব সম্পর্কই যে আবার তার সঠিক গতিপথ খুঁজে পাবে, তাও নয়। যে সম্পর্ক যন্ত্রণাদায়ক, যেখানে হাঁসফাঁস অবস্থা রয়েছে, সে সম্পর্ক ভেঙে ফেলাই যথাযথ। যে সম্পর্কে বিশ্বাস নেই, আস্থার অভাব, সে সম্পর্ক বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া যায় না। আবার জোর করেও সম্পর্ক করা যায় না। জোর করে ভালোবাসা যায় না। ভালোবাসা মানেই পাওয়ার আকাক্সক্ষা নয়। প্রেমের তলায় থিক থিক করে শরীর। ভালোবাসা হচ্ছে একটা অনুভব। একে যত্ন করে লালন করতে হয়। সব কথা লিখে প্রকাশ করা যায় না। যারা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না, তাদের কষ্ট আরও বেশি। সবাইকেই কমবেশি এই পরিস্থিতি ফেস করতে হয়। আমি যে লিখি, আমি কি সব কথা প্রকাশ করতে পারি! পারি না। এমন কিছু কথা আছে, অনুভূতি আছে, কষ্ট আছে জীবনে, যা কখনো প্রকাশ করা যায় না। মানুষ যদি তার সব কথা প্রকাশ করতে পারত, তাহলে এই পৃথিবী কথার ভারে নুইয়ে পড়ত। বাইরে থেকে একজন মানুষকে যতই সুখী আর সুন্দর মনে হোক না কেন, তারও রয়েছে অনেক অজানা কষ্ট, অজানা বেদনা। সেসব কথা বলার তার কেউ নেই, শোনার কেউ নেই। অনেক কষ্ট আর যন্ত্রণা মানুষকে একা একা বয়ে বেড়াতে হয়। যে লেখে, সে হয়তো কিছুটা হলেও তার কষ্ট লাঘব করতে পারে, শেয়ার করতে পারে অন্যের সঙ্গে। কিন্তু সবটুকু পারে না। জীবন অনেক রহস্যময়।

সব মানুষ স্বাধীনতা চায়। একটি পরাধীন রাষ্ট্রের যেমন স্বাধীনতার আকুতি থাকে, তেমনি মানুষও স্বাধীন থাকতে ভালোবাসে। স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়, বলো কে বাঁচিতে চায়! বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আমরা পৃথিবীর বুকে গর্ব নিয়ে চলতে পারি। আমরা যদি স্বাধীনতা না পেতাম, যদি পাকিস্তানের অধীন থাকতাম, তাহলে আমাদের নিজস্বতা বলে কিছু থাকত না। আমরা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারতাম না। আমরা বড় কোনো পদ পেতাম না কোথাও। আমাদের নতুন প্রজন্ম পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেত না। কিন্তু একজন একক মানুষ কি স্বাধীন! এই প্রশ্নটা মাঝে মাঝে জাগে আমার মধ্যে। আমি জন্ম থেকেই আউলা-ঝাউলা স্বভাবের বলে জীবনের প্রচলিত নিয়মকানুনের প্রতি আমার একধরনের বিতৃষ্ণা আছে। আমি যদি এই পৃথিবীতে না আসতাম, তাহলে এত দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ, রোগ-শোক, প্রেম-ভালোবাসা, সমাজের নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড, মিথ্যা অভিযোগ, ভুল-বোঝাবুঝি এবং নানা দায়িত্বের বোঝা বইতে হতো না। পৃথিবীর ‘ভালো ও মন্দ’, ‘সু ও কু’-এর পার্থক্য নির্ণয় করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেতে হতো না। আমি কি এই রকম জীবন চেয়েছিলাম! সুনাম, খ্যাতি, জাত্যাভিমান, অহংকার, আনন্দ, বেদনা, দারিদ্র্য, বদনাম, পরিশ্রান্ততা-এসব! মানুষ বেঁচে থাকে একটা প্রাণী হয়ে। যার সব আছে, সেও বেঁচে থাকে; যার কিছু নেই, সেও বেঁচে থাকে। আমার এই বেঁচে থাকাকে মাঝে মাঝে অর্থহীন মনে হয়। এই যে প্রতিদিনই একটা লড়াই, প্রতিদিন রোগ-শোকে ভোগা, প্রতিদিন কিছু কষ্ট, কিছু অভিযোগ, কিছু অভিমান, কিছু পাওয়া, কিছু হারানোÑএটাই কি বেঁচে থাকার নিয়ম! তার পরও এসবের মধ্যেই বাঁচতে হয় সবাইকে। মানুষের কুৎসিত মনোবৃত্তি, ঝগড়া-বিবাদ, প্রতিশোধ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, সম্মানহানির চেষ্টা, একই সঙ্গে আবার মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, অনুরাগ, আকর্ষণÑএসবের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে জীবন। বড় অদ্ভুত আর রহস্যময় এই জীবন। মাঝে মাঝে বেঁচে থাকা ক্লান্তিকর।

নিজেকে নিজেই বুঝতে পারি না আমি, অচেনা লাগে। কখন কী করব, নিজেই জানি না। অনেক অপ্রত্যাশিত কাজ করি। অন্যরা হয়তো সেটা টের পায় না। কিন্তু আমি বুঝতে পারি। আমি আমাকে ঠিকমতো উপস্থাপনও করতে পারি না। আমি যা করতে চাই, তা করতে পারি না। আমি প্রতিদিন ভুল করি। ভুলের পাহাড়ের ওপর আমি দাঁড়িয়ে থাকি। সেই পাহাড়ের ভার নিতে পারি না। আমি কখনো কারও হতে পারিনি। কেউ আমার হতে পারেনি। কেউ কখনো আমাকে বোঝেনি, আমিও বুঝিনি। আপন মানুষেরাও আমাকে দূরে সরিয়ে দেয়। আপন মানুষেরাও আমাকে ভুল বোঝে। আমিও আপন মানুষদের ধরে রাখতে পারি না। যাদের কাছে ছিলাম কখনো, তারাও ভুল বোঝে, আমাকে দূরে সরিয়ে দেয়। যা করতে চাই না, তা করি। কখনো কখনো প্রলোভিত হয়ে ভুল করি। ফাঁদে পা দিই। তাই মনে হয়, এই পৃথিবীতে না এলেই ছিল ভালো! কিন্তু সেখানে তো আমাদের কোনো হাত নেই। আমরা আকস্মিকতার সন্তান। প্রতিদিন একটা লড়াই-সংগ্রাম। এর নামই হয়তো জীবন! ব্যর্থতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসার প্রাণান্তকর লড়াই। অনেক কিছুর প্রতিই আমার নির্লিপ্ততা আছে। এটা না হলে চলবে না, এটা না পেলে বাঁচব না, ওকে না পেলে জীবন বৃথা হয়ে যাবেÑতা কখনো মনে হয় না। অনেক কিছুই মানুষ পাবে না, অনেক কিছুই জীবনে ঘটবে না, তাই বলে জীবন বৃথা হয়ে যাবে না। তবে আমি নির্বিকার নই। অনেক ব্যাপারেই আমি প্রতিক্রিয়া দেখাই। যেহেতু আমি এই পৃথিবীতে বেঁচে আছি, পৃথিবীর রূপ-রস গ্রহণ করছি, তাই আমি নির্বিকার থাকতে পারি না। পারলে ভালো হতো। অন্যায় দেখলে আমি প্রতিক্রিয়া দেখাই। অনেক সময় অদরকারেও প্রতিক্রিয়া দেখাই। যেমন কেউ হয়তো একটা বিপদে পড়েছে, কারও একটা সমস্যা হয়েছে, সামান্য হাত বাড়ালে সমস্যাটার সমাধান হয়, বা কেউ হয়তো একটা পরামর্শ চাচ্ছে, বা কেউ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছেÑএসব ক্ষেত্রে আমি নির্বিকার থাকতে পারি না। কিন্তু যখন আমি নিজের মধ্যে ডুব দিই, তখন জাগতিক সব ব্যাপারে আমার মধ্যে একটা নির্লিপ্ততা চলে আসে। নির্লিপ্ততার একটা ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে যাই। তখনই বেঁচে থাকা নিয়ে বা এই পৃথিবীতে কেন এলাম, এসব নিয়ে আমার মধ্যে একটা টানাপোড়েনের শুরু হয়।

মানুষের বয়স হয়ে গেলে মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে, বিশেষ করে নর্থ আমেরিকায়। স্বামী বা স্ত্রী হয়তো ছেড়ে চলে গেছে বা মারা গেছে, আর কখনোই বিয়ে করেনি। একসময় তারা সঙ্গী খোঁজে। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। মানুষের সঙ্গী দরকার। তাই তো এসব দেশে অধিকাংশ বাড়িতে কুকুর পোষে। কুকুর কি মানুষের চেয়েও বিশ্বস্ত! কে জানে। মানুষ কি মনের মতো সঙ্গী পায়! সারা জীবনেও কি পায়? আমি আমার ছেলে-মেয়েকে খেয়াল করি। সব সময়ই করতাম। ওরা যখন থেকে শিশু, তখন থেকে। ওদের কেমন করে পরিবর্তন ঘটছে, এটা আমি খুব আগ্রহ নিয়ে লক্ষ করি। আমি আমার পরিবর্তন বুঝতে পারি। নিজের পরিবর্তনগুলো টের পাওয়া যায়। 

শৈশবকাল থেকেই আমি এমনি বেড়ে উঠেছি। আমাকে কখনো কেউ খেয়াল করেনি। প্রকৃতির মাঝেই ছিল আমার বেড়ে ওঠা। এখনো যখন কোথাও যাই, নিজের মনে থাকি। হাঁটি, ঘুরে বেড়াই। কোনো চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হলে বিব্রত লাগে। কী না কী বলবে! হঠাৎ কেউ এমন একটা মন্তব্য করে বসল যে আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাব। নিজেকে আয়নায় দেখে বিপন্ন বোধ করি অনেক সময়। এই আমি কি সেই আমি! এই আমিকে তো চিনি না। অচেনা একজন আমি। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের কাছে নিজে অচেনা হই। অন্যদের ক্ষেত্রেও এমন মনে হয় আমার। খুব চেনা কাউকে হঠাৎ আবিষ্কার করিÑআরে, মানুষটা তো কেমন বুড়োটে মেরে গেছে! গাল বসে গেছে, চুলে পাক ধরেছে বা কোনো সুবেশী বন্ধুর কড়া মেকআপ করেও ঢাকা সম্ভব হয়নি তার চামড়ার ভাঁজ।

আমার কথা বলার বেশি মানুষ নাই বলে আমি একা একা কথা বলি। একা কথা বলতে আমার খারাপ লাগে না। একদিন আমার মেয়ে অরিত্রি বলল, বাবা একা একা কথা বলে, দেখেছ মা! জেসমিন বলল, মাথা খারাপ হয়ে গেছে তাই। স্ত্রীরা এমনই। স্বামীর সবকিছুতেই দোষ। আমি মুভিটা দেখতে দেখতে জেসমিনকে বললাম, সুন্দর মুভি, আসো দেখি। দুই বৃদ্ধ মানুষের গল্প। জেসমিন বলল, বৃদ্ধদের ছবি দেখছ কেন! বুড়ো হয়ে গেছ নাকি! আমি বললাম, হুম। দেখো না, কত ধরনের ব্যথায় ভুগছিÑব্যাক পেইন, ফুট পেইন, ডায়াবেটিস...। কেউ কারও কষ্ট বোঝে না, বুঝছ! স্ত্রীরাও বোঝে না। শুধু দোষ ধরতে পারে। স্বামী ছাড়া পৃথিবীর সব ভালো। জেসমিন হিউমার নিতে পারে না। সিরিয়াস হয়ে যায়। বলল, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করো নাই ছোটবেলায়, তাই নানা অসুখ। আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে আসি। বয়স কোনো ব্যাপার না আসলে। মনই আসল। একটা সুন্দর মন জীবনকে স্বর্গীয় করে তুলতে পারে। মনের দিক থেকে আমি কত রোমান্টিক। জেসমিন যে কেন তা বোঝে না! নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিই। অবসরে ফেসবুক দেখি। বন্ধুদের সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস পড়ি। কারও কারও লেখা পড়ে মন ভালো হয়ে যায়। দুই লাইনের কোনো পোস্ট বা কবিতার লাইন, তাও কত হৃদয়গ্রাহী। কখনো কখনো আমার লেখায় যারা কমেন্টস করেন, সেগুলো মন দিয়ে পড়ি আর ভাবি, এই আমি যদি কাল না থাকি, তাহলে কেউ আমার ফেসবুক খুলবে না। আমার পাসওয়ার্ড জানা নাই কারও। আমাকে অনলাইন দেখাবে না আর। কেউ আর ইনবক্সে কুশল জানতে চাইবে না। কতজন কত সমস্যার কথা বলত আমাকে-কষ্টের কথা, শূন্যতার কথা, ভালোবাসার কথাও। কত ইনফরমেশন চাইত কানাডা আসার, চাইত সাহায্য। আমি চেষ্টা করতাম সেই সব চাহিদা পূরণ করতে। কিন্তু সব সময় পারিনি। আমার এই অক্ষমতার জন্য আমি লজ্জিত। আমিও বন্ধুদের খোঁজখবর নিই। যারা আমার বন্ধু, তারা যেন একটা পরিবার সবাই। কতজনকে কষ্টও দিয়েছি। সে জন্য ক্ষমা চাইতেও দ্বিধা নেই। সেদিন কেউ আর ভালো লাগা বা মন্দ লাগা প্রকাশ করবে না। যেসব বন্ধু প্রতিদিন অপেক্ষা করত আমি কী লিখলাম, তারা আর অপেক্ষা করবে না। এটাই বাস্তবতা।

যখন আমার মনটা আউলা-ঝাউলা থাকে, তখন যা মনে আসে লিখি। জানি, কোনো মাথামুণ্ডু নেই। আমি একটা ভ্যাকেশন করতে চাইছিলাম। আমি বেশি দিন এক জায়গায় থাকতে পারি না। হাঁপিয়ে উঠি। জেসমিনকে বললাম, চলো কোথাও ঘুরে আসি। জেসমিন বলল, কোথায় যাবা! আমি বললাম, ক্যালিফোর্নিয়া যাই বা মেক্সিকো বা নিদেনপক্ষে নিউইয়র্ক যাই। ঘুরকুনো জেসমিন কিছুতেই রাজি হয় না। এসব ভাবি আর টরন্টোর রাস্তায় একা একা ঘুরি। খারাপ লাগে না তো! আমার প্রিয় এই শহর। আমার কাজের জায়গায় একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে দেখা প্রায়ই। একা থাকে প্রায় ৩০ বছর ধরে। বাড়ির সামনে একটা ষাটের দশকের জাগুয়ার গাড়ি। অ্যান্টিক টাইপ। দেখলেই বলবে, হাই নেইবার। আমি বলি, হাই লুই। হাউ আর ইউ। পথ চলতে আমাদের একটা-দুটো কথা হয়। লুইয়ের নিঃসঙ্গতা আমি টের পাই। বিকেল হলে একা বসে বিয়ার খায়। লুই একদিন বলেছিল, সে তার স্ত্রীকে এখনো ভালোবাসে, তাই আর বিয়ে করেনি। এক ছেলে আছে, আমেরিকায় থাকে। লুইয়ের বয়স প্রায় আশি। ভালোবাসা কখনো মরে না। লুই ওল্ড হোমে যেতে চায় না। কারণ এই বাড়িতে স্ত্রীর অনেক স্মৃতি। (চলবে)

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz