বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপের শিক্ষা: উগ্রতা নয়, সহমর্মিতা

বিশ্বকাপের শিক্ষা: উগ্রতা নয়, সহমর্মিতা

বিজ্ঞাপন
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ চলাকালে বাংলাদেশে ফুটবল-উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ জনের প্রাণহানির তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যম ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সর্বশেষ ১৬ জুলাই (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে সমর্থকদের সংঘর্ষ, ধারালো অস্ত্রের হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া এবং উল্লাস করতে গিয়ে ঘটে যাওয়া নানা দুর্ঘটনা। এসব অনাকাঙ্খিত মৃত্যু প্রতিরোধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ও করণীয়-বর্জনীয় বিষয় নিয়েই ‘‘বিশ্বকাপের শিক্ষা: উগ্রতা নয়, সহমর্মিতা’’ বিষয়ক শিরোনামে এই নিবন্ধন।

একটি হৃদয়বিধারক ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। সম্প্রতি আর্জেন্টিনা ও মিসরের ম্যাচ চলাকালে কুমিল্লার একটি রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে খেলা দেখছিলেন ৩৮ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক শরিফুল ইসলাম। লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করার পর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক আর্জেন্টিনা সমর্থককে উদ্দেশ করে তিনি হালকা রসিকতা করেন। কথার অর্থ ছিল— ‘তোমার বাবাও এই গোল করতে পারতেন না।’ সেই সামান্য মন্তব্যই কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেয়। তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে পাশের একটি মেসে আশ্রয় নিতে গেলেও সেখানেও হামলার শিকার হন। পরে দোকানের সামনে অচেতন হয়ে পড়ে যান এবং আর বাঁচানো যায়নি। মাত্র আট মাস আগে স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়েকে নিয়ে নীলফামারী থেকে কুমিল্লায় এসেছিলেন শরিফুল। স্বপ্ন ছিল কিছু অর্থ সঞ্চয় করে সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাবেন। পরিবারের দাবি, তিনি আসলে ব্রাজিলের সমর্থক ছিলেন; সেদিন শুধু মিসরের পক্ষে উল্লাস করছিলেন। অর্থাৎ যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে তার মৃত্যু, সেই দ্বন্দ্বে তার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থই ছিল না। অথচ চলমান ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ঘিরে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জনের প্রাণহানির তালিকায় যুক্ত হয়েছে তার নামও।

বাকি ১১ জনের মধ্যে তিনজন প্রতিপক্ষ সমর্থকদের হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। চারজন প্রিয় দলের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। একজন মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এবং আরও দুজন ফুটবল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

অবশ্য বাংলাদেশে এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জার্নাল অব ইনজুরি অ্যান্ড ভায়োলেন্স রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে দেশের ১৫টিরও বেশি জেলার সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সে সময় ২৩ জনের মৃত্যু, ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি এবং অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছিলেন। গবেষণাটি পরিচালনা করে ঢাকার বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন; এতে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষকও সহলেখক ছিলেন।

গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটেছিল বাড়ির ছাদ বা উঁচু স্থানে পতাকা টানাতে গিয়ে পড়ে যাওয়ার কারণে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কারণ ছিল টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে হত্যাকাণ্ড এবং বিজয় উদযাপনের সময় দুর্ঘটনাও মোট মৃত্যুর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগের জন্য দায়ী ছিল।

গবেষকদের মতে, এসব ঘটনার মূল কারণ হলো অত্যন্ত শক্তিশালী দলগত পরিচয়ের অনুভূতি। সমর্থকেরা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের জয়-পরাজয়কে নিজের ব্যক্তিগত সম্মান ও অপমানের বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেন। সেই আবেগ অনেক সময় অন্ধ সমর্থনে বা উগ্রতায় পরিণত হয়।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে সাতজন পতাকা টানাতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। ছয়জন মারা যান ম্যাচের চরম উত্তেজনা বা প্রিয় দলের পরাজয়ের মানসিক ধাক্কায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিচয়বোধকে আরও তীব্র করে তোলে। সেখানে গালিগালাজ, বিদ্রুপ, অনলাইন ট্রলিং ও উসকানি বাস্তব জীবনের সহিংসতায় রূপ নেয়। এর ফল হিসেবে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় প্রতিপক্ষ সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে। আরও পাঁচজন ম্যাচ দেখা বা উদযাপনের সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। গবেষকদের ভাষায়, ‘সামাজিক আবেগ’ এবং প্রদর্শনমূলক আনুগত্য অনেক সময় একটি খেলাকে প্রাণঘাতী ঘটনায় পরিণত করে।

এ ধরনের প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই নয়। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে জার্মানিতে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলাকালে সমর্থকদের মধ্যে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি তীব্র হৃদরোগজনিত সমস্যা দেখা দেয়, বিশেষ করে আগে থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে।

বিশ্বকাপের ফলাফল মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ জেতার পর দেশটিতে আত্মহত্যার হার কমেছিল। অন্যদিকে ২০১৪ সালে ইরান গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা বেড়ে যায়।

বাংলাদেশেও এর অনুরূপ একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। কুষ্টিয়ার ১৯ বছর বয়সী রতন তার বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে ব্রাজিলের ম্যাচ দেখছিলেন। বাবা ও ভাই দুজনই ছিলেন আর্জেন্টিনার সমর্থক। ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর থেকেই রতনের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে বলে পরিবারের দাবি। পরদিন সকালে তিনি নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। অনেক ডাকাডাকির পর দরজা ভেঙে পরিবারের সদস্যরা তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পান। তিনি রেখে গেছেন একটি ছোট মেয়েকে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই বাংলাদেশি গবেষকদের দুজনের আগে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশ ও ভারতে সমর্থকদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো নিয়েও গবেষণা করেছিলেন।
এসব ঘটনা দেখে সহজেই মনে হতে পারে সমস্যার নাম ‘ফুটবল’। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষ একই বিশ্বকাপ দেখে, একই জয়-পরাজয়ে আবেগাপ্লুত হয়। অথচ খুব কম দেশেই এ ধরনের মৃত্যুর খবর নিয়মিত শিরোনাম হয়। ফুটবল কেবল ঘটনাগুলোর সূচনা করে; প্রকৃত বিস্ফোরণের কারণ অন্য কোথাও।
২০২২ সালের গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তুলে ধরে। সে সময় নিহত ২৩ জনের প্রত্যেকেই ছিলেন পুরুষ এবং তাদের মধ্যম বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। এটি প্রমাণ করে না যে তরুণ পুরুষেরা স্বভাবগতভাবে সহিংস। তবে এটি অবশ্যই প্রশ্ন তোলে- বাংলাদেশে ছেলেদের কীভাবে হতাশা, অপমান, ক্ষোভ ও বিরোধ মোকাবিলা করতে শেখানো হয়?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সমাজে পুরুষদের দুর্বলতা বা কান্না প্রকাশকে নিরুৎসাহিত করা হয়, কিন্তু রাগ প্রকাশকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশেও প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক ধারণায় শক্ত, আত্মনিয়ন্ত্রিত, পরিবারের উপার্জনকারী এবং নিজের সম্মান রক্ষাকারী পুরুষ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে অনেক তরুণের কাছে ভয়, কষ্ট বা মানসিক চাপ প্রকাশের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য পথ থাকে না। যখন এই চাপের সঙ্গে দলগত পরিচয়, প্রকাশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক উসকানি যুক্ত হয়, তখন একটি ফুটবল ম্যাচ আর শুধু খেলা থাকে না।

আবার এটাও সত্য, বাংলাদেশিরা শুধু মেসি, নেইমার বা রোনালদোকে ঘিরেই মারামারি করেন না। বাসে সিট নিয়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানে দেরিতে খাবার পরিবেশন নিয়ে, স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা ক্রিকেট ম্যাচ নিয়েও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। অর্থাৎ সমস্যার মূল বিষয়টি ফুটবল নয়; বরং তুচ্ছ মতবিরোধ কীভাবে খুব দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়, সেটিই বড় উদ্বেগ।

এ ধরনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপনের ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আমরা প্রায়ই শুধু ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ জানাই ‘মেসির পেনাল্টি মিস’, ‘ব্রাজিলের হার’, ‘পতাকা নিয়ে বিরোধ’- কিন্তু এর পেছনের গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকট নিয়ে খুব কমই আলোচনা করি। বাস্তবে একটি পেনাল্টি মিসের কারণে কাউকে হত্যা করা স্বাভাবিক নয়। কোনো বিদেশি দলের পরাজয়ের কারণে আত্মহত্যাও স্বাভাবিক নয়। এসব ঘটনা সমাজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, দ্বন্দ্ব সমাধান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সম্মান-অপমানের সংস্কৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। ফুটবল না থাকলেও অন্য কোনো বিষয় একই বিস্ফোরণের উপলক্ষ হতে পারত।
এর অর্থ এই নয় যে ফুটবলকে উপেক্ষা করতে হবে। 

২০২২ সালের গবেষণার লেখকেরা কয়েকটি বাস্তবসম্মত সুপারিশ দিয়েছেন। যেমন- ছাদ বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পতাকা টানানো নিরুৎসাহিত করা, হৃদরোগীদের উচ্চ-উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ সম্পর্কে সতর্ক করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতি পরিবারের বাড়তি নজর রাখা।

এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বড় কাজ করতে হবে। তরুণদের, বিশেষ করে তরুণ পুরুষদের- হতাশা ও বিরোধ মোকাবিলার সুস্থ উপায় শেখানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, ছোটবেলা থেকেই আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও দ্বন্দ্ব নিরসনের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা দেওয়া এবং সেই সাথে সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শাস্তির ভয় না থাকলে এবং উগ্র সমর্থনের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে একই ধরনের সহিংসতা আবারও ফিরে আসবে।

মোদ্দাকথা, ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা নামছে আগামী ১৯ জুলাই, রোববার। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায়) নিউইয়র্ক–নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল ম্যাচের মাধ্যমে শেষ হবে এই আসর। এরপর নামবে সমর্থকদের পতাকা, থেমে যাবে তর্ক-বিতর্ক, মানুষের মনোযোগও সরে যাবে অন্যদিকে। কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে ঘটে যাওয়া প্রাণহানির ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের যে গভীর সামাজিক ও মানসিক দুর্বলতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, সেগুলো যদি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করি এবং ‘বিশ্বকাপের শিক্ষা: উগ্রতা নয়, সহমর্মিতা’—এই বার্তাটি হৃদয়ঙ্গম করতে না পারি, তাহলে হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোর আত্মত্যাগ থেকে কোনো শিক্ষাই নেওয়া হবে না।
লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz