প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে : চীনা রাষ্ট্রদূত
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ২০:২৫
•
অনলাইন সংস্করণ
ছবি : সংগৃহীত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক এবং এর মাধ্যমে দুদেশের সম্পর্ক একটি নতুন কৌশলগত উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। ২ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ঢাকায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সফরের নানা দিক তুলে ধরে এই মন্তব্য করেন তিনি।
ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো চীন-বাংলাদেশ কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপকে আরো এগিয়ে নেওয়া, যাতে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের এক চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি গড়ে তোলা যায়।’
তিনি বলেন, ‘উভয় দেশ উচ্চ-পর্যায়ের সফর বিনিময় বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা (স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ মেকানিজম) প্রতিষ্ঠা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।’
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘চীন সবসময়ই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের সব জনগণের প্রতি ভালো প্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অবিচল থেকেছে। বিশ্ব পরিস্থিতি যতই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশনার প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতি কখনোই নড়চড় হবে না। চীন সবসময়ই বাংলাদেশের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার হয়ে থাকবে।’
ইয়াও-এর মতে, চীনই প্রথম দেশ যারা কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় দলিলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সমর্থন করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও ‘এক চীন নীতি’র প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং তাইওয়ানের যেকোনো ধরনের স্বাধীনতার বিরোধিতার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোকপাত করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় উচ্চ-মানের সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, নিজ নিজ উন্নয়ন কৌশলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে এবং গ্রিন ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্য প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, অর্থায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।’
তিনি জানান, বিনিয়োগ সহযোগিতা আরো সহজতর করতে বাংলাদেশ চীনে তার প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ কার্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। এই সফরকালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি কৃষি বাণিজ্য প্রটোকল। এগুলো উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, গণমাধ্যম, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, সবুজ উন্নয়ন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতায় জোর দেওয়া হয়েছে।
তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত এই উদ্যোগে চীনের ধারাবাহিক সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয়ে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, তিস্তা নদী প্রকল্পের বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের জন্য চীন তার সক্ষমতার মধ্যে সমর্থন ও সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখবে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ও সংশ্লিষ্ট কাজ ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা করবে। তিস্তা বাংলাদেশের একটি প্রকল্প।’
প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’-কে একটি নতুন কৌশলগত সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন রাষ্ট্রদূত। বলেন, ‘অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণের ধারণাটি নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর আগে ‘বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার’ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার স্বার্থে চীন ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ নির্মাণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
তিস্তা নদী প্রসঙ্গে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এই সফরের সময় তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের (টিআরসিএমআরপি) ওপর বিশেষভাবে জোর দেয়া হয়েছে। কারণ এর সাথে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত।’
গত ২২ জুন (সোমবার) রাতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে যোগ দিতে চীনের দালিয়ানে যান তিনি। দুদিন সেখানে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে ২৪ জুন (বুধবার) বিকেলে বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং দেশটির ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি’র সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন।
বৈঠকে উভয়পক্ষ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করেন। এছাড়া তারা বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করেন এবং একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে নিজের প্রথম বিদেশ সফর শেষ করে গত ২৬ জুন (শুক্রবার) বেইজিং থেকে দেশে ফেরেন।