সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:১০
•
অনলাইন সংস্করণ
জাতিসংঘে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সৌজন্যে বিএসএস
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈশ্বিক সহায়তা, সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগ। সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে আমাদের সংকল্পও আরও দৃঢ় হোক, আর আমাদের পদক্ষেপ হোক তার চেয়েও দ্রুত এই কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বানও জানিয়েছেন। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। সেই সাথে এই বৈঠক আয়োজন এবং এ বিষয়ে ঘোষণাপত্র প্রণয়নে সহযোগিতা ও প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈশ্বিক সহায়তা, সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, সমুদ্র তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য একই সঙ্গে বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সমুদ্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশকে একটি সক্রিয় বদ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। ফলে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা, সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলীয় পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এমন একটি বিপর্যয়কর ভবিষ্যৎ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে দেশে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
নদী-খাল খনন ও পানি সংরক্ষণে উদ্যোগ এর কথাও তুলে ধরেছেন। জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা হবে, অন্যদিকে পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দেশের জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করা হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ অর্থনীতির কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথেও এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সবুজ শিল্পের বিকাশ, পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার প্রতিষ্ঠা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সুরক্ষা জোরদারে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
চারটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এরমধ্যে রয়েছে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয়, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর রয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করতে হবে।
সবশেষ হলো, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো দেশ যেন একা রাইজিং টাইডের মুখোমুখি না হয় সেই বিষয়েও তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। তাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কার্যক্রমকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যৎ ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশা প্রকাশ করেন, বিশ্বনেতারা ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবেন এবং কোনো দেশকে যেন একা রাইজিং টাইড বা ক্রমবর্ধমান জোয়ারের মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করবেন।
উল্লেখ, জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের ওপর যে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়।