বোয়িং-এয়ারবাস লড়াই : বাংলাদেশে সমান সুযোগ চায় ইইউ
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৬
•
অনলাইন সংস্করণ
ছবি সংগৃহীত
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপের এয়ারবাসকেও সমান সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করলেও এয়ারবাসের প্রস্তাবকে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক উল্লেখ করে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইইউর ২৭ সদস্যরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দেন মিলার। বৈঠকে সরকারি ক্রয়-প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মিলার বলেন, এয়ারবাস বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত এবং এয়ারবাস ও বিমানের চলমান আলোচনা দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে বলে ইইউ আশা করছে।
তিনি সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক যোগ্যতা, মূল্য, প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোও অন্যান্য দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
গত ৩০ এপ্রিল মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তির মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে উড়োজাহাজগুলো সরবরাহ করবে বোয়িং।
এই চুক্তি ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কেও গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চুক্তিটির কথা উল্লেখ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো এক চিঠিতে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ জানান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
একই সময়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত সাংবাদিকদের জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনছে। ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত বিমানের বড় অর্ডারটি যায় বোয়িংয়ের কাছে। তবে ইউরোপীয় পক্ষের আগ্রহের পর এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।
রোববারের বৈঠকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয় ছাড়াও বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক, অশুল্ক বাধা দূর করা এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, ইইউ বাংলাদেশের বাণিজ্যে ৬১টি অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করেছিল। গত ছয় মাসে এর মধ্যে ৪৮টি বাধা দূর করা হয়েছে। এর মধ্যে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়ন জটিলতা নিরসন, বাণিজ্যিক নমুনা আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার ডলার করা এবং রপ্তানি পণ্যের ‘ট্রেসেবিলিটি’ নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্মার্ট কার্ডের শুল্ক মূল্যায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের মতো পদক্ষেপ রয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার দুটি ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উঠলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা করছে ঢাকা।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আলোচনা হতে পারে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় অঙ্কের চুক্তির পর এয়ারবাসের জন্য ইইউর এই প্রকাশ্য তৎপরতা আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ বাজারে দুই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের তীব্র প্রতিযোগিতারই প্রতিফলন। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যৎ বহর সম্প্রসারণে একক নির্মাতার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখা হবে, নাকি বাণিজ্যিক ও কারিগরি বিবেচনায় বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসকেও যুক্ত করা হবে।