রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ পুলিশ একযোগে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাহিনীর ভেতরে পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গ্রুপিং যেমন বাড়ছে, তেমনি অতীত সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও বাধ্যতামূলক অবসরের আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর হামলার মানসিক অভিঘাত এবং সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চাপ যুক্ত হয়ে বাহিনীতে একধরনের নীরব অস্থিরতা তৈরি করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন ইউনিটের একাধিক কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলি ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়ানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণার প্রবণতাও বেড়েছে। এতে পারস্পরিক আস্থা কমছে এবং চেইন অব কমান্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সব অভিযোগ যেমন ভিত্তিহীন নয়, তেমনি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব তথ্যও সত্য নয়। যাচাই-বাছাইয়ের আগেই প্রচারণা শুরু হওয়ায় প্রকৃত অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়। অতীত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং নতুন পদায়ন ও পদোন্নতির মাধ্যমে বাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট, হাইওয়ে পুলিশ, শিল্পাঞ্চল পুলিশ এবং বিভিন্ন রেঞ্জ ও জেলা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো ঘিরে প্রতিযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তাও অস্থিরতার অন্যতম কারণ। পুলিশ সূত্র জানায়, গত দুই বছরে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়া এবং বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে অন্তত ১৪২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও কয়েকজনকে অবসরে পাঠানোর আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি ৫৭ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে একই পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তার মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা জানান, কে কখন অবসরে যাবেন বা কার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এই অনিশ্চয়তা অনেককে মানসিক চাপে রাখছে। এর প্রভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণেও পড়ছে। ভবিষ্যতে সমালোচনা বা অভিযোগের আশঙ্কায় অনেক কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতেও অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে পড়ছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ওপর হামলার স্মৃতি। সে সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা না গেলে সদস্যদের মনোবল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরেকটি বড় উদ্বেগ লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। পুলিশের আশঙ্কা, এসব অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধীদের হাতে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি অপরাধে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
এদিকে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পুলিশের জন্য নতুন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, স্থানীয় বিরোধ, প্রার্থী-সমর্থকদের সংঘর্ষ এবং দাগি অপরাধীদের তৎপরতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ কারণে পুলিশ সদর দপ্তর ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত, পেন্ডিং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর এবং অতীতে নির্বাচনী সহিংসতায় জড়িতদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে সব সদস্যকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, পুলিশের বর্তমান সংকট শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি মনোবল, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্বেরও পরীক্ষা। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে চেইন অব কমান্ড শক্তিশালী করা, সদস্যদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।