এক বছরেই ১০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি তেল আমদানি, ব্যয় বেড়েছে ১০৭%
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১২ অগাস্ট ২০২৬, ১১:২৩
•
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট (পিওএল) আমদানিতে ১ হাজার ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ব্যয় বেড়েছে ১০৭ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই খাতে ব্যয় হয়েছিল ৫১৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় বেড়েছে ৫৪৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারের এই ব্যয় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এক বছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের নজির নেই।
এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে সর্বোচ্চ ৮৯৮ কোটি ৫০ লাখ বা ৮ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল। কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পকারখানা সচল হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ওই সময়ে আমদানি ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গত অর্থবছরে ব্যয় বাড়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি। এর সঙ্গে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বাজারকে অস্থির করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, মূলত দাম বৃদ্ধি ও চাহিদা বাড়ার কারণেই আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও বাড়তির দিকে থাকায় আগামী মাসগুলোতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু অপরিশোধিত তেল ও পিওএল আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দেশের মোট পণ্য আমদানি ব্যয়ের ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশই গেছে জ্বালানি তেল কিনতে।
অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৯২ শতাংশ। আর পিওএল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১০৯ দশমিক ১০ শতাংশ।
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণেই নয়, দেশে জ্বালানি তেলের ব্যবহারও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে বাংলাদেশ ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫০ লাখ ৫ হাজার টন।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নয় মাসেই আমদানি বেড়েছে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন।
আমদানির তালিকায় রয়েছে ডিজেল, অপরিশোধিত তেল, ফার্নেস তেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে দেশে মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল ৭৪ লাখ টন।
সম্প্রতি দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের গুজব ছড়িয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত মজুত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অধ্যাপক ম তামিমের মতে, আতঙ্কের কারণেই সাম্প্রতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। মানুষ তেল পাওয়া যাবে না মনে করে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করেছিল। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সরকারের অন্তত দেড় মাসের জ্বালানি তেলের মজুত রাখা উচিত।
সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানও মনে করেন, প্রতি বছর দেশে তেলের চাহিদা বাড়ছে। এর সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে যুদ্ধ ও অস্থিরতার প্রভাব যুক্ত হওয়ায় গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত ১ জুন ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুলাই ও আগস্টেও এসব দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।