মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ :

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
জাতিসংঘে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শান্তিমিশনে বাংলাদেশের অংশ- গ্রহণ আরো জোরদারের আহ্বান

শান্তিমিশনে বাংলাদেশের অংশ- গ্রহণ আরো জোরদারের আহ্বান

নিউইয়র্ক : জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ-পিয়েরে ল্যাক্রোয়ারের হাতে স্মারক তুলে দিচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। পাশে বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকির।

বিজ্ঞাপন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ও পুলিশ সদস্যদের অধিকতর মোতায়েন, বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য আরও নেতৃত্বস্থানীয় পদে নিয়োগ এবং বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট পাঠানোর ক্ষেত্রে জোরালো জাতিসংঘ সমর্থনের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৬ জুলাই সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের দুই জন আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেলের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষা অবদান, পেশাগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে এ আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের প্রেস উইং জানিয়েছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে ল্যাক্রোয়ার সঙ্গে বৈঠকে তিনি পিসকিপিং ক্যাপাবিলিটি রেডিনেস সিস্টেমের আওতায় বাংলাদেশের একটি ফর্মড পুলিশ ইউনিটকে (এফপিইউ) র‌্যাপিড ডেপলয়মেন্ট লেভেলে উন্নীতকরণ, আরো বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি অফিসারদের মোতায়েন এবং বর্তমান বা ভবিষ্যৎ শান্তিরক্ষা মিশনে একটি বাংলাদেশি এফপিইউ বিবেচনার অনুরোধ জানান। একইসঙ্গে তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ফিল্ড মিশনে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের জন্য আরো নেতৃত্বস্থানীয় ও পেশাগত পদে নিয়োগের আহ্বান জানান।
আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের ধারাবাহিক অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং প্রশিক্ষিত ও দক্ষ পুলিশ সদস্য পাঠাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতিকে স্বাগত জানান। তিনি বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকারও প্রশংসা করেন।
পৃথক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের অপারেশনাল সাপোর্টবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারের সঙ্গে হাইতিতে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট মোতায়েন, সরঞ্জাম, পরিবহন, রিইম্বার্সমেন্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য সহায়ক অবকাঠামো এবং লজিস্টিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা করেন।
অতুল খারে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন।
এদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের এক বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত অংশীদার। এ পর্যন্ত ২৬টি দেশের ২৭টি শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। তিনি বলেন, অন্যতম শীর্ষ পুলিশ অবদানকারী দেশ (পিসিসি) হিসেবে বর্তমান এবং ভবিষ্যতের যে কোনো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও কার্যকারিতা বাড়াতে নানামুখী বিনিয়োগ ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের দ্রুত সাড়াদানের সক্ষমতাকে আরও জোরদার করতে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য দুটি ফর্মড পুলিশ ইউনিটের (এফপিইউ) র‌্যাপিড ডেপ্লয়মেন্ট লেভেল (আরডিএল) যাচাইকরণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে জাতিসংঘ পুলিশ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। ইউনিট দুটি জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম, নিজস্ব রসদ ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ জনবলে সম্পূর্ণ সুসজ্জিত। মন্ত্রী এই যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে ডিপার্টমেন্ট অব পিস অপারেশনস এর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে মন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে কঙ্গোর মোনুস্কো মিশন থেকে গত বছরের অক্টোবরে স্বল্প সময়ের নোটিশে ১৮০ সদস্যের বাংলাদেশি নারী এফপিইউ (বিএএনএফপিইই) প্রত্যাহারের বিষয়টি উত্থাপন করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, অন্যান্য মিশন যেমন সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক বা দক্ষিণ সুদানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আনুপাতিক হারে কমানো হলেও, কঙ্গোতে কেবল বাংলাদেশের পুরো ইউনিটটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা সমতা ও ন্যায্যতার নীতি পরিপন্থী। বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দক্ষিণ সুদান, আবেয়ি বা সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে একটি নতুন বাংলাদেশি এফপিইউ মোতায়েনের জন্য তিনি আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে অনুরোধ জানান।
শান্তিরক্ষা মিশনের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের অবদান বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সদরদপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন মিশনসমূহের শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিশেষায়িত পেশাদার পদে (পি-লেভেল এবং ডি- লেভেল) যোগ্য ও দক্ষ বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের আরও বেশি সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ শান্তি মিশনের পরিবর্তিত চাহিদাকে ধারণ করতে সক্ষম এমন অত্যন্ত যোগ্য পুরুষ ও নারী কর্মকর্তা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত।
বৈঠকে আরো জানানো হয়, ২০২৪ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সিলেকশন অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট টিম (এসএএটি) পরীক্ষায় ১০৭ জন কর্মকর্তা উত্তীর্ণ হলেও এখনো ৮৫ জন কর্মকর্তা নিয়োজনের অপেক্ষায় আছেন। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও কঙ্গোতে বাংলাদেশি ইন্ডিভিজুয়াল পুলিশ অফিসার (আইপিও)-এর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায়, সেখানে ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ এবং অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের দ্রুত পদায়নের অনুরোধ জানানো হয়। একইসঙ্গে, বর্তমান তালিকার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলায়, আগামী সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে পরবর্তী ‘সাট’ পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলকে সময়োচিত সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ অবদান, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি কঙ্গো মিশনের ভারসাম্য ও সমতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং বাংলাদেশের উত্থাপিত যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো পূরণে ও বিশেষায়িত পুলিশ দল গঠনে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এর আগে জাতিসংঘের পুলিশ প্রধানদের পঞ্চম সম্মেলনে যোগ দিতে ৬ জুলাই সোমবার দুপুরে নিউইয়র্কে আসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম ও মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুনসহ পাঁচ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। আগামী ১২ জুলাই রোববার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও জাতিসংঘ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ৭ জুলাই মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নকভি, ভিয়েতনামের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী সিনিয়র লেফটেন্যান্ট জেনারেল নগুয়েন ভ্যান লং এবং জাতিসংঘের রাজনৈতিক ও শান্তিনির্মাণবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ. ডি-কার্লোর সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
পাকিস্তানের ফেডারেল মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নকভির সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপ্র গুরুত্বারোপ করেন। তিনি পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিকদের ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড প্রাপ্তিতে সম্মুখীন মানবিক জটিলতার বিষয়টিও উত্থাপন করেন। 
বৈঠকে দুই মন্ত্রী চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁরা উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা করেন।
ভিয়েতনামের উপমন্ত্রী নগুয়েন ভ্যান লংয়ের সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, কনসুলার সহযোগিতা জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং মানবপাচার ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমনে সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
ভিয়েতনামের উপমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ও শান্তিনির্মাণ কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমন এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ও গুরুত্বারোপ করেন। 
আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ. ডি-কার্লোর সঙ্গে বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শান্তিরক্ষা ও শান্তিনির্মাণে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের টেকসই ও জোরালো সহায়তার আহব্বান জানান। 
ডি-কার্লো জাতিসংঘে বাংলাদেশের গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের অব্যাহত অবদানের প্রশংসা করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz