আদালতের রায়ে ‘ডাকা’ প্রাপকদের নাগরিকত্বের পথ আরো সংকুচিত
বিয়ে করলেও গ্রিনকার্ড পাওয়া কঠিন হতে পারে
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৫৫
•
অনলাইন সংস্করণ
যুক্তরাষ্ট্রে ‘ড্রিমার’ হিসেবে পরিচিত ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস বা ‘ডাকা’ প্রাপকদের জন্য গ্রিনকার্ড এবং পরবর্তীতে নাগরিকত্ব লাভের বহুল ব্যবহৃত পথটি উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়ে এসেছে। আমেরিকান ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের এক নতুন আপিল রায়ের ফলে বিশেষ করে যেসব ডাকা প্রাপক অনথিভুক্ত বা অবৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, পরবর্তীতে কোনো মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করা সত্ত্বেও তাঁদের পক্ষে নিজ দেশে থেকে গ্রিনকার্ড লাভ করা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলস (বিআইএ) ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে স্পষ্ট জানিয়েছে, ডাকা প্রাপকরা ‘অ্যাডভান্স প্যারোল’ (বিশেষ ভ্রমণ অনুমতি) নিয়ে বিদেশে ভ্রমণ ও পুনঃপ্রবেশের মাধ্যমে অভিবাসন মর্যাদা সমন্বয় (অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস) করার যে সুবিধা এতদিন পেয়ে আসছিলেন, তা সীমিত করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে অ্যাডভান্স প্যারোল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে অতীতে জমা হওয়া ‘আনলফুল প্রেজেন্স’ বা অনথিভুক্ত অবস্থানের কারণে তিন বা দশ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার (ইনএডমিজিবিলিটি বার) মুখে পড়তে হতে পারে।
২০১২ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় চালু হওয়া ডাকা কর্মসূচি ছোটবেলায় অভিভাবকের সঙ্গে আসা কয়েক লাখ অনথিভুক্ত তরুণকে সাময়িক বহিষ্কারাদেশ থেকে সুরক্ষা ও কাজের অনুমতি দিয়ে আসছে। তবে এটি সরাসরি কোনো গ্রিনকার্ড বা স্থায়ী বসবাসের অধিকার দেয় না। এতদিন কোনো ডাকা প্রাপক শিক্ষাগত, পেশাগত বা মানবিক কারণে অ্যাডভান্স প্যারোল নিয়ে বিদেশে গিয়ে পুনরায় অনুমোদিতভাবে (ইনস্পেক্টেড অ্যান্ড পারমিটেড) দেশে প্রবেশ করলে তাঁর প্রথমবার অবৈধ প্রবেশের আইনি ত্রুটি দূর হতো। পরবর্তীতে কোনো মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করলে যুক্তরাষ্ট্রে বসেই সরাসরি গ্রিনকার্ড আবেদন করা যেত। কিন্তু বিআইএ-এর নতুন রায়ে বলা হয়েছে, অ্যাডভান্স প্যারোল ব্যবহার করে বিদেশে যাওয়াকেও আইনত ‘ডিপারচার’ বা দেশত্যাগ হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে ইউএস আইন অনুযায়ী অতীতে অবৈধ অবস্থানের কারণে ১০ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন সংস্থা ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কাহলার এই রায়কে সমর্থন করে বলেন, “কংগ্রেস প্রণীত আইনি নীতিটি অত্যন্ত স্পষ্ট- অনথিভুক্ত অবস্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে তার আইনি পরিণতি ভোগ করতেই হবে। অ্যাডভান্স প্যারোলেও সেই বিধান প্রযোজ্য।” ইউএসসিআইএস নিশ্চিত করেছে, ভবিষ্যতে সব আবেদন বাধ্যতামূলক এই আইনি নজিরের ভিত্তিতেই নিষ্পত্তি করা হবে।
অভিবাসন আইনি সংস্থা ‘জাস্টিস অ্যাকশন সেন্টার’-এর পরিচালক কারেন টামলিন এবং ফ্লোরিডার বিশিষ্ট অভিবাসন আইনজীবী শিল্পা মালিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন। তাঁরা জানান, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো বহিষ্কারাদেশ (ডিফেনসিভ রিমুভাল অর্ডার) রয়েছে বা লম্বা সময় অনথিভুক্ত অবস্থান ছিল, তাঁদের জন্য এখন অ্যাডভান্স প্যারোলে বিদেশ যাওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাসসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিমাফিক নথি পরীক্ষা না করে এখন বিদেশে যাওয়া ঠিক হবে না।
কর্নেল ল স্কুলের ‘পাথ২পেপার্স’ প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ডাকা প্রাপক এই ১০ বছরের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সক্রিয় ডাকা প্রাপকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার, যার মধ্যে শুধু ক্যালিফোর্নিয়াতেই রয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার। এর আগে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭৬ হাজার ডাকা প্রাপক বৈবাহিক সূত্রে গ্রিনকার্ড পেয়েছিলেন, যার মূল সহায়ক ছিল এই অ্যাডভান্স প্যারোল।
এদিকে, রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন যে, ডাকা প্রাপকরা অ্যাডভান্স প্যারোলের সুবিধা নিয়ে আইনগত ফাঁকফোকর তৈরি করছেন। আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্র্যাসলি দীর্ঘদিন ধরে এটি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিআইএ-এর এই সিদ্ধান্ত কার্যত রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আইনি দাবিরই বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে।
আইনজীবীরা অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, নতুন রায়টি মূলত ভবিষ্যৎ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, যেসব ডাকা প্রাপক অতীতে অ্যাডভান্স প্যারোল ব্যবহার করে বিদেশে গেছেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তাঁদের ওপর এই রায় অতীতপ্রভাবী (রেট্রোঅ্যাক্টিভ) হবে না; তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় গ্রিনকার্ডের আবেদন চালিয়ে যেতে পারবেন।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ডাকা থাকা শত শত অভিবাসীকে ইতিমধ্যে আটক করার অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন সিনেটরদের কাছে পাঠানো চিঠিতে তৎকালীন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম জানান, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ নভেম্বরের মধ্যে ৮৬ জন ডাকা প্রাপককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে স্যাক্রামেন্টোর বাসিন্দা মারিয়া দে জেসুস এস্ট্রাদা জুয়ারেজের মতো ঘটনাও ঘটেছে, যাকে গ্রিনকার্ড ইন্টারভিউর পরপরই ডিপোর্ট করা হয় এবং পরে আদালতের নির্দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
সার্বিকভাবে, বিআইএ-এর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে অনথিভুক্ত প্রবেশের পর মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করে বৈধ হওয়ার সবচেয়ে সহজ আইনি কৌশলটি প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। ফলে অ্যাডভান্স প্যারোল নথি হাতে থাকলেও একক আইনি পরামর্শ ব্যতিরেকে কোনো ডাকা প্রাপকের পক্ষে এখন বিদেশ ভ্রমণে বের হওয়া আত্মঘাতী হতে পারে।