Thikana News
০৭ ডিসেম্বর ২০২৩
  1. ই-পেপার
  2. চলতি সংখ্যা
  3. বিশেষ সংখ্যা
  4. প্রধান সংবাদ
  5. আমেরিকার অন্দরে
  6. বিশ্বচরাচর
আমেরিকা বৃহস্পতিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২৩

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ফিলিস্তিনে গণহত্যার ধারাবাহিকতা

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং ফিলিস্তিনে গণহত্যার ধারাবাহিকতা
এবিএম সালেহ উদ্দীন


রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রপুঞ্জের গণবিরোধী ও মানব ক্ষতিকর নীতিমালার কঠোর সমালোচনাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের সমালোচক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিক ও কলামিস্ট নোয়াম চমস্কির একটা বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শুরু করি। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা যখন শিক্ষিত ও সুশীল শ্রেণি কর্তৃক সমর্থিত হয় এবং সেইসব প্রোপাগান্ডার বাইরে যখন কোনো স্বাধীন মতামত কিংবা চিন্তা প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না, তার প্রভাব হয় ভয়াবহ। হিটলারসহ পৃথিবীর আরও অনেক ডিক্টেটরের কাছ থেকে নেওয়া সেসব শিক্ষা এখনো বিশ্বের দেশগুলোতে চলে আসছে!’

ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের স্বাধীনতার পক্ষে মি. চমস্কি প্রচুর লিখেছেন। তিনি তার জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকাকে ‘বদমাশ পরাশক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সকল অন্যায় যুদ্ধের সোচ্চার প্রতিবাদকারী এবং মানববিধ্বংসী যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচক। কেবল মানবিক অনাচারের কারণেই নয়, মানববিধ্বংসী অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে মূলত নেপথ্যের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র উন্মোচনের লক্ষ্যে তিনি সাহসী কলাম লিখে খ্যাতিমান হন।

বর্তমানে নোয়াম চমস্কির বয়স শতায়ুর কাছাকাছি। প্রায় ৬৫ বছর ধরে মি. চমস্কি তার দেশের মানুষকে তথ্য-প্রমাণসহ দেখিয়ে যাচ্ছেন কীভাবে তাদের শাসকেরা সমগ্র বিশ্বকে ‘অমানুষ’ হিসেবে গণ্য করে আসছেন এবং অযাচিতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের খুদে দানবদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। যে দানবেরা সব সময় নিজের ক্ষমতা ও নিজ স্বার্থের বাইরে অপরের স্বার্থ নিয়ে ভাবে না। সেটি চীনের পূর্ব তিমুর, মধ্য আমেরিকা, ভিয়েতনাম, হাইতি অথবা ইসরায়েল-যেখানেই হোক।

নোয়াম চমস্কি সত্যনিষ্ঠ লেখার মধ্য দিয়ে সর্বদাই নিপীড়িত মানুষের পক্ষে মতামত প্রদান করেন। তার লেখায় রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্যায় ও অপশাসনের কঠোর সমালোচনা প্রকাশ পায়। তিনি আপাদমস্তক নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী এবং আপাদমস্তক একজন মানবতাবাদী মানুষ।

তিক্ত হলেও সত্য, বর্তমান বিশ্বে স্বাধীন চিন্তা ও মতামত প্রকাশের সুযোগ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই নেই। রাষ্ট্রতান্ত্রিক কঠোর বিধিনিষেধের গ্যাঁড়াকলে বিভিন্ন দেশের জনগণের সত্য কথা প্রকাশ করার অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিকতা ও বিচার-বিশ্লেষণে দেখা যায়, পৃথিবীর সকল দেশের জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ সর্বদাই মানববিধ্বংসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে। যদিও পৃথিবীর রাষ্ট্রপুঞ্জের শক্তিধর দেশগুলোতে যুদ্ধবিরোধী নীতিসমূহ রক্ষা করা হয় না।

পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে স্বাধীনতা ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সাধারণ মানুষের ওপর নিষ্ঠুর বর্বরতা, পৈশাচিক নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানোর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী মানববিধ্বংসী কার্যক্রম সচল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের শাসকবৃন্দ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষামূলক জনহিতকর কাজের পরিবর্তে গণবিরোধী কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। এভাবেই মূলত রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়। এই অপব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি গণবিরোধী স্বৈরশাসন এবং টেকসই উগ্র ক্ষমতায়ন।

বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন রাষ্ট্রপুঞ্জের হটকারী চিন্তা ও গণবিরোধী কার্যক্রমসমূহ দুঃখজনকভাবে বহাল রয়েছে। এভাবেই বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাধর শক্তির পাশবিকতাপূর্ণ অমানবিকতার বীভৎস চিত্রসমূহ প্রকট হয়ে ওঠে। তাদের সেসব অপশাসন ও জনবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় দলন, নিপীড়ন এবং মানববিধ্বংসের নানা উপকরণ (!), যা রুখে দেওয়ার ক্ষমতা জনগণের থাকে না।
এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধংদেহী নীতির উদাহরণ খুবই স্পষ্ট। যিনি একজন মানবতাবিরোধী নির্দয় শাসক। যার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, ফিলিস্তিনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া! ফিলিস্তিনের নিরীহ জনগণের ওপর নির্মম অত্যাচার ও দলন-নিপীড়নমূলক নিষ্ঠুরতম কার্যক্রমের ফিরিস্তি দেওয়া কঠিন এবং তা অনেক করুণ ও বিষাদময়।

ইসরায়েলি শাসক নেতানিয়াহু কারণে-অকারণে (নানান অজুহাতে) ফিলিস্তিনের জনগণকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্নকরণের উপায় হিসেবে ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালানোর ওপর জোর দিয়ে থাকেন। যার ফলে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর বিভিন্ন রকম নিষ্ঠুরতম নিষ্পেষণমূলক, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ও হত্যাযজ্ঞকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষের প্রতি নির্মম আচরণ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও নেতানিয়াহুর এই দলন-নিপীড়নমূলক নীতি পৃথিবীর সর্বমহলে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এ ব্যাপারে শুধু ফিলিস্তিনের জনগণই নয়, খোদ ইসরায়েলের জনগণের মাঝেও তার বিরুদ্ধে অনেক ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ রয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী প্রমাণিত হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে নেতানিয়াহু একজন উচ্চাভিলাষী এবং দুর্নীতিপরায়ণ শাসক হিসেবে চিহ্নিত। অভিযোগ উঠেছে, ইসরায়েলের সাধারণ জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করেন। নানাবিধ অপকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি মানবতাবিরোধী নীতির প্রবর্তক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর মি. নেতানিয়াহুর মতো এমন নির্দয়, ভয়ংকর ও হিংস্র শাসক পূর্বে কমই দেখা গেছে।

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইসরায়েলের ক্ষমতায় আরেক শাসক ছিলেনÑঅ্যারিয়েল শ্যারন। ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি অমানবিক নিপীড়ন আর ধ্বংসযজ্ঞের জন্য তিনিও গণধিক্কৃত শাসক হিসেবে সমালোচিত। ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা পিএলওর প্রতিষ্ঠাতা ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের সময় শ্যারন ফিলিস্তিনের জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য অনেক মানববিধ্বংসী কার্যক্রম চালিয়েছেন। বিশেষ করে, সেপ্টেম্বর ১১-এর পর, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে, পর্যায়ক্রমে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ড দখল করার পথ সুগম করে যান। রামাল্লাস্থ ফিলিস্তিনি সদর দপ্তরে প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতকে কয়েক মাস অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং সেখানেই জনাব আরাফাত গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অবশেষে ভগ্নশরীর নিয়ে প্যারিসের একটি হাসপাতালে ১১ নভেম্বর ২০০৪ সালে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

মি. শ্যারনের শাসনামলে ফিলিস্তিনের লক্ষ মানুষ নিজস্ব জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ ও বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেন। হাজার হাজার মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটে এবং ফিলিস্তিনের বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। নিরস্ত্র অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্মম আগ্রাসন চালিয়ে, জোরপূর্বক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করা হয় এবং তদস্থলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করা হয়। ফিলিস্তিনি ভূমিতে বিভিন্ন রকমের উৎপাদনমূলক কার্যক্রম চালু করা হয়।
প্রকাশ থাকে, অ্যারিয়েল শ্যারনের শাসনামলে ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী জেরুজালেম শহরের রামাল্লা, বেথলেহাম, জেনিনসহ গণবসতিপূর্ণ পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকার ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। তখন ফিলিস্তিনে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সে সময় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন তুঙ্গে ছিল।

পরে শ্যারন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছিল, তা নিয়ে নানা ধূম্রজাল রয়েছে। অ্যারিয়েল শ্যারনের মৃত্যুর পর আইজ্যাক রবিন প্রধানমন্ত্রী হন এবং তারপর (দুবারের মতো) শিমন পেরেজ হন ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান। শিমনের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন হন মি. বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।

সত্যি বলতে কি, এই রাষ্ট্রনায়কেরা চাইলে ফিলিস্তিন ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত ও সংকট নিরসন করে দুই দেশের মধ্যকার বিবদমান সংকট নিরসন ঘটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথ সৃষ্টি করতে পারতেন। ফিলিস্তিনকে কয়েক যুগ ধরে অমানবিক ও অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ না রেখে, স্বাধীন ফিলিস্তিনকে মুক্ত করে দিতে পারতেন। জাতিসংঘের নীতিমালা অনুপাতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল, উভয় দেশের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারতেন। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিস্থিতি শেষ হয়ে যেত এবং ইতিহাসে তারা মানবিকতার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন।
পরিতাপের বিষয়, ইসরায়েলের শাসকবৃন্দ মানবতার পথে না গিয়ে, ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর নির্মম অত্যাচার, নিপীড়নমূলক যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইসরায়েল রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।
১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় এলে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন শুরু হয়। সেখানকার ইহুদিরা পালিয়ে ফিলিস্তিনে আসে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। ব্রিটিশ শাসন ও ইহুদি দখলদারির বিরুদ্ধে ১৯৩৬-১৯৩৯ সালে সংঘটিত হয় ‘আরব বিদ্রোহ’। সেই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয়, যাতে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি যোদ্ধা নিহত হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকার এবং বিশ্বের কয়েকটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্রশক্তির চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে ইসরায়েল রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম দিকে ফিলিস্তিনিরা সেটিকে মেনে নিলেও পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি শাসকদের আসল মুখোশ উন্মোচিত হয়। ক্রমে ক্রমে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে বৈরিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনিকে দ্বিখণ্ডিতকরণের মাধ্যমে পৃথক দুটি রাষ্ট্র তথা ইহুদি ও ফিলিস্তিন (আরব) রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট প্রদান করে। আরবদের বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিকল্পনাটি এগিয়ে যায়। ব্রিটিশ সরকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীলনকশায় ইহুদিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনির ম্যান্ডেট ছেড়ে দেয়। সেদিনই চিহ্নিত মোড়ল রাষ্ট্রসমূহের আশকারায় ইহুদি নেতাদের মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরদিন আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ বেধে যায় এবং যুদ্ধে মিসর, জর্ডান এবং সংশ্লিষ্ট আরবদেশসমূহ পরাজিত হয়। সে সময় প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনের এবং আরব রাষ্ট্রের একটা বড় অংশ ইসরায়েল দখল করে নেয়। তখন ইসরায়েলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি নিজস্ব ভূখণ্ড ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে লেবাননসহ বিভিন্ন স্থানে শরণার্থী হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার পর থেকে ৭৫ বছর যাবৎ ফিলিস্তিন অবরুদ্ধ এবং ইসরায়েলি শাসকদের অমানবিক নির্যাতনের মধ্যেও ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত। এ-যাবৎ ফিলিস্তিনের লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রতিনিয়ত মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বিগত ও বর্তমান শতাব্দীর সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম বর্বরতা চলছে অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনে। ইসরায়েলি বর্বরতায় বর্তমানে ফিলিস্তিন একটি করুণতম বিষাদময় মৃত্যু উপত্যকা। আল-জাজিরা ১১ নভেম্বর ২০২৩ জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, গির্জা ও হাসপাতাল কোনোটাই নিরাপদ নয়। সর্বত্র ভয়ংকর মারণাস্ত্রবিশিষ্ট বোমা হামলা ও শত শত ট্যাংক নামিয়ে ঐতিহাসিক গাজায় আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি বাহিনী। প্রতিনিয়ত হতাহতের ঘটনায় এ পর্যন্ত গাজায় প্রায় ১২ হাজার মানুষের (নারী ও শিশু) প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজারই শিশু। রয়টার্সের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা আরও জানায়, ‘ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ইতিমধ্যে গাজার সর্ববৃহৎ আল-শিফা হাসপাতালে হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েলি সৈন্যরা মারাত্মক রাসায়নিক সাদা ফসফরাস ব্যবহার করেছে, যার শিকার হিসেবে প্রতি ১০ মিনিটে একটি করে ফিলিস্তিনি শিশু মারা যাচ্ছে।’ ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘মাই আল-কাইলা’ বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ একটি রাসায়নিক অস্ত্র। আমরা ভাবছি, আল-শিফা হাসপাতালে সাদা ফসফরাস দিয়ে হামলার জন্য ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনার দায়িত্ব কার।’ গাজায় ইসরায়েল ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে অভিযোগ করে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গাজার হাসপাতালগুলোয় ভর্তি রোগীদের ভাগ্যে এখন অনিবার্য মৃত্যু। আমরা এ জন্য ইসরায়েল, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়ী করব।’ ইসরায়েলের হামলায় গাজায় এ-যাবৎ শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। (গাজা সিটি, ৩ নভেম্বর ২০২৩, ছবি : রয়টার্স)

হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের নির্বিচার হামলা অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় প্রাণ হারানো ৮৮ জনই জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থায় (ইউএনআরডব্লিউএ) কাজ করতেন। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠন হামাস। সেই হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। বর্তমানে ইসরায়েলের দুই শতাধিক জিম্মি হামাসের হাতে বন্দী। সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এদিকে লন্ডন, ইস্তাম্বুল, নিউইয়র্ক, বাগদাদ ও রোমের মতো বিশ্বের বড় শহরগুলো ছাড়াও সমগ্র বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনের সমর্থনে লাখ লাখ মানুষের প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ মিছিল ও বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব বিক্ষোভ থেকে অবিলম্বে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানানো হয়। লাখো কণ্ঠে স্লোগান উঠেছে, ‘বাইডেন আপনি পালাতে পারবেন না, আমরা আপনার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলছি’ এবং ‘যুদ্ধবিরতি হবে না তো ভোটও দেব না’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে।’

কমেন্ট বক্স