নিজের স্ত্রী-সন্তানদের খবর নেই, একের পর এক ভাঙছে সংসার
পরকীয়ার ফাঁদে ‘বিনিয়োগ’ করে কউিনিটিতে সর্বস্বান্ত বহু পুরুষ
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫৫
•
অনলাইন সংস্করণ
প্রেমের বিয়ে ছিল সবুজ ও দীপার (ছদ্মনাম)। ডিভি লটারি জিতে স্ত্রীকে নিয়ে সবুজ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান ২০০৬ সালে। প্রথমে পেশা হিসাবে চালাতেন ট্যাক্সি। ভালো আয়-রোজগার হতো তার। পরে শুরু করেন ব্যবসা। রাতারাতি যেন আলাদীনের চেরাগ পেয়ে যান সবুজ। ব্যবসায়িক সাফল্যে চার বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রে দুটি বাড়ির মালিক হন তিনি। একাধিক ইয়েলো ক্যাবসহ গ্রোসারি ও লন্ড্রির মালিক বনে যান। প্রায় ২০ বছর সংসার করার পর সম্প্রতি তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে।
সবুজ ও দীপার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। দুই বছর আগে যখন দীপা জানলেন- তার স্বামী পরকীয়ায় আসক্ত, তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। প্রায় চার বছর একটানা দাম্পত্য কলহের পর তারা বিচ্ছেদে যান। দুই ছেলে ও এক মেয়ে এখন দীপার কাছেই থাকে।
জ্যামাইকা এস্টেটের বাসিন্দা দীপার অভিযোগ- টাকা-পয়সা বেড়ে যাওয়ায় তার স্বামীর কমিউনিটিতে ওঠাবসা বেড়ে যায়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্পন্সর করেন। নারী শিল্পীদের গিফট দেন। তাদের গাড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান। শপিংয়ে যান। এসব খবর দীপার কানে আসলেও গুরুত্ব দিতেন না। কিন্তু দিন দিন মিথ্যাচার ধরার পর দীপা যখন বিশেষ সূত্র মারফত খবর পেয়ে একটি আবাসিক হোটেলে এক নারীসহ হাতেনাতে ধরলেন, তখন স্বামীকে আর বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
দীপা বলেন- এরপর থেকে সংসারে নানা অশান্তি দেখা দেয়। সন্তানের কথা মাথায় রেখে সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছি। কিন্তু স্বামীকে একেক সময় একেক নারীর সঙ্গে চলাফেরার খবর পাচ্ছিলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি- আর না।
দীপা অভিযোগ করেন- টাকা-পয়সা হাতে এলে মানুষের এত পরিবর্তন হতে পারে তা তার স্বামীকে না দেখলে বুঝতাম না। আমাদের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল। বাবা-মায়ের কথা উপেক্ষা করে বিয়ে করেছিলাম। অথচ বিদেশে ভালো জীবনযাপনের জন্য এসে এখন জীবন নিয়েই সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, সবুজের পরকীয়ার সঙ্গী একজন সঙ্গীতশিল্পী। তার নিজেরও স্বামী-সংসার আছে। শুধু লোভে পড়ে ওই শিল্পী তার স্বামীকে ঠকাচ্ছেন, তার সংসারও তছনছ করলেন।
সবুজ ও দীপার সংসার তছনছের ঘটনা অহরহ বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। চারপাশে তাকালে শুধুই হতাশার গল্প। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ ব্যবসায়ী নেতা, কেউ রিয়েলটর। তাদের অনেকেই পরকীয়ায় ক্ষতবিক্ষত। সুন্দরী-সেলিব্রেটির সঙ্গ পেতে ঢালছেন অর্থ। ব্যবসা-বাণিজ্যে মনযোগ না দিয়ে দূরে কোথাও গিয়ে কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছেন। আর এভাবেই তাদের পকেট ফাঁকা হচ্ছে। সেই ফাঁকা পকেট আর কখনো ভরছে না। অনেকে নিঃস্ব হয়েছেন। কেউ হয়েছেন সর্বস্বান্ত।
বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এমন কিছু বিকৃত মানসিকতার পুরুষ আছেন- যাদের কাজই হচ্ছে শিল্পী বা সেলিব্রেটিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করা। নিজের গাড়িতে নিয়ে ঘোরাফেরা করা, শপিংয়ে যাওয়া, গভীর রাতে বাসায় পৌঁছে দেওয়া। এসব পুরুষের আচরণ দেখলে মনে হয়- সেলিব্রেটি নারীর সান্নিধ্যে পেলে তাদের জীবন যেন ধন্য হয়ে যায়।
পুরুষের অনেকে যে নারীলোভী এমন নয়, অনেকে নারীর ফাঁদে পড়েও সর্বস্বান্ত হচ্ছে পুরুষ। বরং লোভী নারীরা বিত্তশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্কে একজন নারী শিল্পীর কারণে অতিসম্প্রতি একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সংসার ভাঙার ঘটনা সবার মুখে মুখে। আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে ওই নারী বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। শুধু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নয়, বিভিন্ন স্টেটে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে সমানভাবে সখ্যতা রেখেছেন ওই নারী শিল্পী। বর্তমানে ওই নারী কমিউনিটির কোনো অনুষ্ঠানে আসছেন না।
নিউইয়র্কে আরেক নারী শিল্পীর কারণে কয়েক বছর আগে সংসার ভেঙেছে আরেকজন ব্যবসায়ীর। স্ত্রী-সন্তান ফেলে ওই ব্যবসায়ী বিয়ে করেছেন নারী শিল্পীকে। আর ওই নারী শিল্পীও এ পর্যন্ত স্বামী বদল করেছেন অন্তত চার বার। শোনা যাচ্ছে- তাদের সম্পর্ক এখন ভালো যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি অংশে পরকীয়া বা বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে অর্থ অপচয় এবং তথাকথিত ‘বিনিয়োগ’-এর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে অনেক পুরুষ নিজেদের উপার্জিত অর্থের বড় অংশ ব্যয় করছেন, ফলে তারা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন এবং পরিবার-পরিজনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন।
দাম্পত্য কলহ নিয়ে কাজ করা একজন নারী নেত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব সম্পর্কের মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে কিছু ব্যক্তি আবেগ বা সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে অর্থ আদায় করছেন, যা অনেক সময় ‘সহায়তা’ বা ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর ফলে প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারিবারিক জীবনে। তিনি জানান, অনেকেই স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ ঠিকমতো দিচ্ছেন না, এমনকি খোঁজখবরও নিচ্ছেন না। এতে করে দীর্ঘদিনের সংসার ভেঙে যাচ্ছে এবং সন্তানরা আর্থিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।
কমিউনিটির প্রবীণ ব্যক্তি বলছেন, বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তিনি মনে করছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করা ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি ও কাউন্সেলিং সংশ্লিষ্টরা জানান, নিউইয়র্কের আইনে ভরণপোষণ না দেওয়া একটি গুরুতর বিষয়, যার আইনি পরিণতিও রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা বা জটিলতার কারণে আইনি সহায়তা নিতে এগিয়ে আসেন না। তারা বলছেন, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রম, কাউন্সেলিং এবং কমিউনিটি পর্যায়ে আলোচনা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তাঁদের মতে, প্রবাস জীবনের একাকিত্ব, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।