শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
ট্রাম্প-মামদানির অসম রাজনৈতিক রসায়ন

বিরোধের মধ্যেও যোগাযোগে অস্বস্তিতে রিপাবলিকানরা

বিরোধের মধ্যেও যোগাযোগে অস্বস্তিতে রিপাবলিকানরা

বিজ্ঞাপন
একজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট, অন্যজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট মেয়র। আদর্শিক অবস্থান দুই মেরুতে। প্রকাশ্যে একে অপরের কঠোর সমালোচনাও করেছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির মধ্যে গড়ে উঠেছে এমন এক কার্যকর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, যা এখন মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সাংবাদিক মার্ক হ্যালপেরিনের বিশ্লেষণ, এই অপ্রত্যাশিত সম্পর্কের একটি কারণ  হতে পারে— মামদানি ট্রাম্পের সামনে ভীত বা অতিমাত্রায় অনুগত আচরণ করেন না। হ্যালপেরিনের মতে, ট্রাম্প শক্ত অবস্থান নেওয়া মানুষকে মূল্য দেন এবং মামদানির আত্মবিশ্বাসী আচরণ তাঁদের ব্যক্তিগত বোঝাপড়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি হ্যালপেরিনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা; ট্রাম্প বা মামদানি কেউই তাঁদের সম্পর্কের কারণ এভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
বাস্তবতা হলো, দুজনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য গভীর হলেও তাঁদের যোগাযোগ এখন আর গোপন নয়। মামদানি নিজেই সম্প্রতি ‘জিমি কিমেল লাইভ!’ অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, তিনি সময়-সময় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেক্সট মেসেজে যোগাযোগ করেন। আলোচনার বিষয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; নিউইয়র্কের আবাসন, বিশেষ করে কুইন্সের সানিসাইড ইয়ার্ড প্রকল্প এবং হাইতিয়ান নিউইয়র্কবাসীর অভিবাসন সুরক্ষা। 
গত ২১ সেপ্টেম্বর গ্রেসি ম্যানশনে ট্রাম্প-মামদানির বৈঠকেও সেই বাস্তব সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। এর আগে হোয়াইট হাউসে তাঁদের দুবার বৈঠক হয়েছিল। সর্বশেষ বৈঠকে সানিসাইড ইয়ার্ড-এর ওপর প্রায় ১২ হাজার বাড়ি নির্মাণ এবং আনুমানিক ৩০ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে সিটি হল ও হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ট্রাম্পও স্বীকার করেন, প্রকল্পটির জন্য বিপুল ফেডারেল অনুমোদন এবং সম্ভবত ফেডারেল অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। 
সম্পর্কটি আরও বিস্ময়কর কারণ অতীতে ট্রাম্প মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং তাঁর করনীতিরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে মামদানিও ট্রাম্পের রাজনীতি ও অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু মতপার্থক্যের মধ্যেও তাঁরা কাজের সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। 
মামদানির ব্যাখ্যা বেশ সরল— নিউইয়র্কবাসীর জন্য ফল পাওয়া গেলে তিনি প্রেসিডেন্টসহ যে কারও সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত। গ্রেসি ম্যানশনের সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, আগের বৈঠকের পর নিউইয়র্কের আটক কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও নগরবাসীর জন্য স্বস্তি আনার সুযোগ থাকলে সেই আলোচনা তিনি চালিয়ে যাবেন। 
ট্রাম্পও সাম্প্রতিক বৈঠকে মামদানির প্রতি আগের তুলনায় অনেক উষ্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মামদানি একজন সফল মেয়র হয়ে উঠবেন এবং বলেন, তাঁর যাত্রা ইতিবাচকভাবে শুরু হয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগেও মামদানির নীতির সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি নিউইয়র্ককে ধ্বংস করছেন। এই ওঠানামাই দেখায়, তাঁদের রাজনৈতিক বিরোধ শেষ হয়নি; বরং বিরোধের পাশাপাশি একটি কার্যকর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। 
এই সম্পর্ক এখন জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে— বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে। রিপাবলিকানদের একটি অংশ মামদানিকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিজমের প্রতীক হিসেবে সামনে রেখে ভোটারদের কাছে ডেমোক্র্যাটদের বামঘেঁষা অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু একই সময়ে ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা সেই প্রচারবার্তাকে জটিল করে তুলছে বলে কিছু রিপাবলিকান কৌশলবিদ মনে করছেন।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডগ হেই অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, একদিকে রিপাবলিকানরা ভোটারদের বোঝাতে চাইছেন মামদানির রাজনীতি কতটা চরম; অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রতি প্রকাশ্যে উষ্ণতা দেখাচ্ছেন। হেইয়ের মতে, এতে দলের প্রচার কৌশল সহজ হচ্ছে না। 
নিউইয়র্কের রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া রয়েছে। রিপাবলিকানদের কেউ কেউ মামদানির রাজনৈতিক দর্শনকে আক্রমণ করে প্রচার চালালেও নিউইয়র্ক রিপাবলিকান পার্টির মুখপাত্র ট্রাম্পের অবস্থানকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রয়োজনীয় ‘ডিলমেকিং’-এর অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকানদের মধ্যেও সম্পর্কটির রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে একক ব্যাখ্যা নেই।
ট্রাম্প ও মামদানির এই অসম সম্পর্ক কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত নয়। অতীতে দেখা গেছে, প্রশংসার পর ট্রাম্প আবার মামদানির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁদের মধ্যে অভিবাসন, কর, অর্থনীতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে মৌলিক রাজনৈতিক পার্থক্যও বহাল রয়েছে।
তবে আপাতত একটি বিষয় পরিষ্কার— ব্যক্তিগত যোগাযোগের দরজা দুজনই খোলা রেখেছেন। মামদানি রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নিউইয়র্কের স্বার্থে কাজ করতে চাইছেন; আর ট্রাম্পও নিজের শহরের মেয়রের সঙ্গে সেই যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনী রাজনীতির তীব্র মেরুকরণের মধ্যে এই অস্বাভাবিক সম্পর্ক তাই শুধু ব্যক্তিগত রসায়নের গল্প নয়; নিউইয়র্কের প্রয়োজন এবং জাতীয় রাজনীতির হিসাব— দুটিই এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।.

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz