ইনফান্তিনোর সঙ্গে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট
বিশ্বকাপ ফাইনালে ট্রাম্প, কার্নি ও শেইনবাউম এক মঞ্চে
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২১:৫৪
•
অনলাইন সংস্করণ
ছবি সংগৃহীত
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে পরিণত হতে যাচ্ছে। রোববার (১৯ জুলাই) নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল ম্যাচে উপস্থিত থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম। ম্যাচ শেষে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের হাতে ট্রফি তুলে দেবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতিতে এমন একটি টুর্নামেন্টের ‘যথাযথ সমাপ্তি’ হবে, যা বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের সক্ষমতা তুলে ধরেছে। তিনি বলেন, এই বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সাংগঠনিক দক্ষতারও একটি বৈশ্বিক প্রদর্শনী।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমি এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একসঙ্গে ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করব এবং পরে যৌথভাবে বিজয়ী দলের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেব।’ বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে দুই নেতার একসঙ্গে ট্রফি প্রদান বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফাইনাল ম্যাচে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম। হোয়াইট হাউসের আমন্ত্রণে দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। যেহেতু ২০২৬ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, তাই তিন দেশের শীর্ষ নেতার একসঙ্গে উপস্থিতিকে উত্তর আমেরিকার সহযোগিতা ও ক্রীড়া কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এটি হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের এবারের বিশ্বকাপে প্রথম মাঠে উপস্থিতি। তবে ফুটবলের নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির জন্য এটি হবে বিশ্বকাপের তৃতীয় ম্যাচ। তিনি এর আগে ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত কানাডার দুটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬–০ গোলের ঐতিহাসিক জয়ও তিনি গ্যালারি থেকে প্রত্যক্ষ করেন, যা পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে কানাডার প্রথম জয় হিসেবে রেকর্ড হয়।
অন্যদিকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম বিশ্বকাপ চলাকালে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ১৩টি ম্যাচের কোনোটিতেই মাঠে যাননি। অতিরিক্ত টিকিট মূল্যের প্রতিবাদ হিসেবে তিনি স্টেডিয়ামে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবর্তে বিভিন্ন ফ্যান জোনে সাধারণ সমর্থকদের সঙ্গে বসে মেক্সিকোর খেলা উপভোগ করেন এবং জাতীয় দলের শেষ ষোলো পর্যন্ত যাত্রা অনুসরণ করেন।
শুক্রবার কুইন্টানা রুতে এক অনুষ্ঠানে শেইনবাউম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আমাকে বিশ্বকাপ ফাইনালে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ হওয়ায় আমি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও সেখানে থাকবেন। এ বিষয়ে আমি আরও বিস্তারিত জানিয়ে একটি বার্তা প্রকাশ করব।’
ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর যৌথ উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। গত বছর একই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের ফাইনালেও তারা একসঙ্গে ট্রফি প্রদান করেছিলেন। ওই ম্যাচে ইংলিশ ক্লাব চেলসি ৩–০ গোলে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনকে হারিয়ে শিরোপা জেতে। ট্রাম্প শুধু ট্রফি প্রদানই করেননি, পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে খেলোয়াড়দের সঙ্গে উদযাপনেও অংশ নেন। তার সেই উপস্থিতি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে চেলসির তারকা কোল পামার বলেন, ট্রাম্প মঞ্চে থেকে উদযাপনে অংশ নেবেন, তা তিনি আগে জানতেন না।
এবারের বিশ্বকাপেও ট্রাম্প একটি বিতর্কিত ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড নিয়ে তিনি ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। পরে বিষয়টি পর্যালোচনা করে বালোগুনকে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়। ট্রাম্প পরে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি কাউকে নির্দেশ দেননি; শুধু নিজের মতামত জানিয়েছিলেন। তার মতে, ঘটনাটি ছিল দুই খেলোয়াড়ের স্বাভাবিক সংঘর্ষ, ইচ্ছাকৃত ফাউল নয়।
ফিফার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনের জন এফ কেনেডি সেন্টারে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক ড্র অনুষ্ঠানে তাকে ফিফার প্রথম ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশাপাশি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউমও উপস্থিত ছিলেন। তিন নেতার সেই সাক্ষাৎ এখন বিশ্বকাপ ফাইনালে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের ফাইনাল এবার কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়; এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কূটনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিন দেশের শীর্ষ নেতার একত্রে উপস্থিতি সহযোগিতা ও সংলাপের ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।
একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর হাতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়কের ট্রফি গ্রহণের দৃশ্য বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন ক্রীড়া ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। ফুটবল, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক ঐক্যের এক অনন্য সমন্বয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের এই সমাপনী অনুষ্ঠান ইতিহাসের পাতায় বিশেষ স্থান করে নেবে।