বাংলা সাহিত্যে ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা ও আত্মঅন্বেষণমূলক গদ্যের একটি দীর্ঘ ও গৌরবময় ধারা রয়েছে। কিন্তু এমন গ্রন্থ খুব বেশি পাওয়া যায় না, যেখানে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, গবেষণার জগৎ, শিক্ষকতার সাধনা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ এবং আত্মবিকাশের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়ে ওঠে সাহিত্যিক অনুভূতির এক বর্ণময় ক্যানভাসে। প্রণবকান্তি দেবের ‘জানা পথে অজানা প্রান্তরে’ সেই বিরল ধরনের একটি বই। এটি কেবল বিদেশভ্রমণের বিবরণ নয়, কেবল সেমিনার-সম্মেলনের দিনলিপিও নয়; বরং একজন শিক্ষকের জ্ঞানযাত্রা, মননযাত্রা এবং মানবিক বিস্তারের এক আন্তরিক দলিল।
প্রণবকান্তি দেব সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বহু একাডেমিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকেই এই গ্রন্থের জন্ম। তবে লেখকের সাফল্য এখানে যে তিনি অভিজ্ঞতাকে তথ্যের স্তূপে পরিণত করেননি; বরং তা রূপ পেয়েছে সাহিত্যিক গদ্যে, আত্মজিজ্ঞাসায় এবং শিক্ষকের অন্তর্লোকের সূক্ষ্ম অনুরণনে।
গ্রন্থের ভূমিকা থেকেই লেখক পাঠককে একটি বিশেষ মানসিক পরিসরে নিয়ে যান। তিনি শিক্ষকতাকে চাকরি হিসেবে দেখেন না; দেখেন সাধনা, ব্রত এবং ভ্রমণ হিসেবে। তাঁর এই উপলব্ধি-শিক্ষক একদিকে শিক্ষার্থীর মনোজগতে ভ্রমণ করেন, অন্যদিকে জ্ঞানসমুদ্র, প্রকৃতি ও সমাজের মধ্যে-সমগ্র বইটির দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। বর্তমান সময়ের পেশামুখী শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য গভীর তাৎপর্য বহন করে।
প্রথম অধ্যায় ‘প্রথম কনফারেন্স : অজানার দোরগোড়ায়, শেখার অনন্তযাত্রা’ বইটির অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া এক তরুণ শিক্ষকের দুরুদুরু বুক, গবেষণায় অনভিজ্ঞতা, প্রপোজাল পাঠানোর উৎকণ্ঠা, এক্সেপ্টেন্স পাওয়ার আনন্দ এবং ঢাকা নায়েমে প্রথম আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে প্রবেশের মুহূর্ত-এসব বর্ণনা অত্যন্ত জীবন্ত। লেখক নিজের দুর্বলতা আড়াল করেননি। বরং আত্মসন্দেহকেই তিনি শেখার সূচনা হিসেবে দেখেছেন। এই সততা পাঠকের আস্থা অর্জন করে।
এই অংশে বাংলাদেশের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার বাস্তবতা, রাজধানী ও মফস্বলের বৈষম্য, গবেষণার সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক-জীবনের অনিশ্চয়তা এবং একাডেমিক সংস্কৃতির ঘাটতি স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে। ফলে বইটি কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা হয়ে থাকে না; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার এক অন্তরঙ্গ সামাজিক দলিল হয়ে ওঠে।
পরবর্তী অধ্যায় ‘নেপাল : হিমালয়ের দেশে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে’ গ্রন্থটির নান্দনিক উচ্চতাকে আরও প্রসারিত করেছে। কাঠমান্ডুর থামেল, বাগমতি নদীর তীর, পাহাড়ঘেরা নগরী, নেপালি সুরের আবেশ-এসব বর্ণনায় লেখকের ভ্রমণদৃষ্টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু তিনি কেবল দৃশ্য দেখেন না; দৃশ্যের অন্তর্লোকও অনুধাবন করেন। নেপালি শিক্ষকদের অনুসন্ধিৎসু মন, সেশন রেকর্ড করার অভ্যাস, নোট নেওয়ার আন্তরিকতা, নেটওয়ার্কিংয়ের সংস্কৃতি-এসব দেখে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ল্যাঙ্গুয়েজ ফেয়ারের অভিজ্ঞতা। গবেষণাকে তিনি এখানে কোনো দূরবর্তী, ভয়াবহ বিষয় হিসেবে দেখাননি; বরং আলাপ, প্রশ্নোত্তর, কৌতূহল ও অংশগ্রহণের এক প্রাণবন্ত উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে তাঁর সংলাপ পাঠককে এক বৈশ্বিক একাডেমিক পরিসরের স্বাদ দেয়।
‘ভারত : ঘুরি আমি বিস্ময়ে’ অধ্যায়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ আরও বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। চেন্নাই শহর, তামিল সংস্কৃতি, আতিথেয়তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ-সবকিছুই তাঁর চোখে বিস্ময়ের উৎস। ফিবি নামের ছাত্রী, হোটেল বয় অরুণ, কলাপাতায় পরিবেশিত খাবার, মেরিনা বিচের সন্ধ্যা-এসব খুঁটিনাটি বইটিকে মানবিক উষ্ণতায় ভরিয়ে দেয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় : লেখক মানুষের ছোট ছোট আচরণে সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন। আন্তর্জাতিক কনফারেন্স তাঁর কাছে কেবল পেশাগত অর্জন নয়; বরং মানুষের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের অভিজ্ঞতা। তিনি উপলব্ধি করেন, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে মানুষের সঙ্গে মিশেই অ নক বড় শিক্ষা অর্জিত হয়। এই উপলব্ধিই বইটির মানবিক শক্তি। ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি স্বপ্নপূরণের গল্প’ অংশে লেখক স্মৃতি, ভৌগোলিকতা ও আত্মপরিচয়ের এক গভীর মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। শিক্ষাজীবনের আবেগ, শৈশব-যৌবনের অনুরণন এবং একাডেমিক স্বপ্নপূরণের অনুভূতি এখানে মিলেমিশে গেছে। গৌহাটির প্রসঙ্গে তাঁর ভাষা আরও অন্তর্মুখী ও আবেগঘন হয়ে ওঠে। ‘গৌহাটি : হৃদয়ের গভীরে ফিরে দেখা এক শহর’ অংশটি বিশেষভাবে হৃদয়স্পর্শী। এখানে শহর কেবল স্থান নয়; স্মৃতি, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত ভূগোল। গ্রন্থের মধ্যভাগে এসে ‘আইভিএলপি ও টিসল ২০১৮ : স্বপ্নপূরণের আমেরিকা অধ্যায়’ এবং ‘সিলেট থেকে পোর্টল্যান্ড : এ জার্নি টু ড্রিমল্যান্ড’ অধ্যায়গুলো বইটিকে বৈশ্বিক পরিসরে নিয়ে যায়। ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো, পোর্টল্যান্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, কনফারেন্স ভেন্যু, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ-এসবের বর্ণনায় লেখকের বিস্ময় যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মসমালোচনাও। তিনি বারবার ফিরে আসেন মূল প্রশ্নে : একজন শিক্ষক কীভাবে নিজেকে প্রতিনিয়ত নবায়ন করবেন? কীভাবে শ্রেণিকক্ষকে জীবন্ত করবেন? কীভাবে বিশ্বজ্ঞানকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করবেন?
এ প্রসঙ্গে লেখকের একটি বড় শক্তি হলো, তিনি বিদেশকে অন্ধভাবে মহিমান্বিত করেন না। তিনি যা ভালো দেখেছেন, তা গ্রহণ করতে চান; যা অনুপস্থিত দেখেছেন নিজের দেশে, তা নিয়ে ভাবেন। এই ভারসাম্য তাঁর মননের পরিণতিকে প্রকাশ করে।
গ্রন্থের শেষের দিকে ‘একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়’ অধ্যায়টি পুরো বইয়ের দার্শনিক সমাপ্তির মতো কাজ করে। এখানে লেখক বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ভবন, সিলেবাস বা ডিগ্রির প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না; দেখেন মুক্ত চিন্তা, মানবিকতা, গবেষণা, সংলাপ ও স্বপ্নের এক জীবন্ত পরিসর হিসেবে। এই অংশে তাঁর গদ্য সবচেয়ে বেশি মননশীল।
ভাষার দিক থেকে প্রণবকান্তি দেবের গদ্য উল্লেখযোগ্যভাবে প্রবহমান, সহজ এবং কাব্যিক। তিনি তথ্য দেন, কিন্তু তথ্যকে কখনো শুষ্ক হতে দেন না। মেঘের ভেলায় উড়ে চলা বিমান, ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমে থাকা স্মৃতি, আইডি কার্ডকে ‘মাস্টার ক্লাস’-এর প্রতীক হিসেবে দেখা-এসব রূপক তাঁর ভাষাকে সাহিত্যিক দীপ্তি দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, রবার্ট ফ্রস্ট, এমিলি ডিকিনসন প্রমুখের উদ্ধৃতি তিনি কৃত্রিমভাবে ব্যবহার করেননি; বরং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জৈবভাবে মিলিয়েছেন।
গ্রন্থটির ব্যাপ্তি ও লেখকের অভিজ্ঞতার সমৃদ্ধতার ফলে কোথাও কোথাও কনফারেন্সের নাম, বক্তাদের পরিচয় এবং বিভিন্ন সেশনের বিবরণ কিছুটা বিস্তৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এই তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপন পাঠককে গ্রন্থের একাডেমিক প্রেক্ষাপট, বিষয়বৈচিত্র্য ও লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনুধাবনে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। ভবিষ্যৎ সংস্করণে এসব তথ্যের কিছু অংশ আরও সংহত ও সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপিত হলে গদ্যের প্রবাহ এবং পাঠের স্বাচ্ছন্দ্য আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে বিষয়বস্তুর প্রতি এমনই যত্নশীল দৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরবর্তী সংস্করণে গ্রন্থটির সামগ্রিক সৌন্দর্য, সংহতি ও পাঠযোগ্যতা নিঃসন্দেহে আরও সমৃদ্ধ হবে।
সবশেষে বলা যায়, ‘জানা পথে অজানা প্রান্তরে’ আসলে তিনটি সমান্তরাল যাত্রার কাহিনি-পথের যাত্রা, জ্ঞানের যাত্রা এবং আত্মার যাত্রা। সিলেট থেকে ঢাকা, কাঠমান্ডু, চেন্নাই, গৌহাটি, লন্ডন, আমেরিকা-এই ভৌগোলিক বিস্তার যেমন আছে, তেমনি আছে ভয় থেকে আত্মবিশ্বাসে, সংকীর্ণতা থেকে প্রসারে, একাকিত্ব থেকে বৈশ্বিক মানবিক সংযোগে উত্তরণের গল্প।
বাংলাদেশে শিক্ষকতা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের সাহিত্যিক গদ্য খুব কম রচিত হয়। সেই শূন্যতায় প্রণবকান্তি দেবের এই গ্রন্থ একটি মূল্যবান সংযোজন। তরুণ শিক্ষক, গবেষক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য অনুরাগী, এমনকি সাধারণ পাঠকও এ বই থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন।
বইটি পড়ে শেষ করলে মনে হয়, সত্যিকারের শিক্ষক কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছান না; তিনি পথেই থাকেন, শিখতে থাকেন, বিস্মিত হতে থাকেন। আর সেই বিস্ময়ের আলোকরেখাই প্রণবকান্তি দেব তাঁর এই গ্রন্থে যত্নের সঙ্গে ধরে রেখেছেন। ‘জানা পথে অজানা প্রান্তরে’ তাই কেবল একটি বই নয়; এটি জ্ঞানচর্চার প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি আস্থা এবং শিক্ষকের অনন্ত যাত্রার এক উজ্জ্বল সাহিত্যিক স্বাক্ষর।
গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে অভ্র প্রকাশন। প্রকাশক অপূর্ব শর্মা বইটির প্রকাশনায় আন্তরিক পরিচর্যার পরিচয় দিয়েছেন। নান্দনিক প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পী ধ্রুব এষ, যার শিল্পদৃষ্টি বইটির ভ্রমণ-মননধর্মী আবহকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮০ টাকা। পাঠকের কাছে বইটি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে দেশের সুপরিচিত পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘর ও পাঠক সমাবেশ।
লেখক : অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।