সরকারকে ঘাবড়াতে পেরে এবার সূক্ষ্ম স্বস্তিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার চট করে চলে আসা বা ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কোনো কর্মসূচি না দিয়েও দলটি একটি হাইপে উঠতে পারায় পুলকিত। সরকারি পর্যায় থেকে হুলুস্থুল করে ফেলা হয়েছে। এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করে দেশকে প্রকারান্তরে একটা ভয়ে ফেলে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে এ আদেশ জারি হয়েছে। এতে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন সংগঠনের বেআইনি মিছিল, শোডাউন ও অন্যান্য কর্মসূচির মাধ্যমে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পাশাপাশি জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। এ অবস্থায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, গোপালগঞ্জ জেলা এবং ফরিদপুর জেলার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার লক্ষ্যে ২২ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এ অফিস আদেশে। ঢাকাসহ ৬ জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, সেনা মোতায়েন রুটিন ওয়ার্ক। এর আগে ছোট করে একটা আতঙ্ক বোমা ছাড়েন আইনজীবী চৈতালী চক্রবর্তী।
আরও পড়ুন
তিস্তা মেগাপ্রজেক্ট চীনের বেহাত
চীনের দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে বেইজিংয়ের পথে প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি গোটা আবহই পাল্টে দিয়েছেন। একে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ঘিরে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেছেন অনেকে। চৈতালীর বক্তব্যকে বিজেপির বাংলাদেশ-বিদ্বেষী প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। সরকারপ্রধানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ভারতপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দিকে তীক্ষè নজরের সমান্তরালে গোয়েন্দা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। কথায় এবং প্রচার-অপপ্রচারে কেউ পিছিয়ে নেই। এর ধারাপাতে বাংলাদেশে হামাসের উপস্থিতির তথ্যও প্রচার হয়েছে। এর নেপথ্য কুশীলব হিসেবে আঙুল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের দিকে। প্রচারকারীদের ভাষ্য, ক্ষেত্রটি ড. ইউনূসই তৈরি করেছেন। একদিকে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা, পুশ-ইন চেষ্টা। আরেকদিকে মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সামগ্রিক বিষয়টির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে হামাস আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত ও নিষিদ্ধ। মিয়ানমার, ভারত, পাকিস্তান এখন কেবল দেশ নয়, এক একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। এমন একটা সঙিন সময়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর।
মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঢাকার একাধিক চুক্তি, স্মারক আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত। সুদূর রাশিয়ারও অনেক হিসাব এখানে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীনের দিকে হেলান দেওয়ায় অনেক সমীকরণ বদলে যাচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে ব্রিকস দেশগুলো ডলার নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে এরই মাঝে বের হয়ে যেতে শুরু করেছে। এই দলে ভারতও আছে। রয়েছে উদ্বেগও। উদ্বেগ ও স্ট্রেস থেকে হাইপার টেনশন হয়। হাইপার টেনশন থেকে হয় হাই ব্লাড প্রেশার। এরপর স্ট্রোক! ভারত এগোচ্ছে তার মতোই। সার্কের বিকল্প হিসেবে ভারত বর্তমানে বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য জোরদারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। চীন ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে বাঁধ দিচ্ছে, তাতে উদ্বেগ! বাংলাদেশ পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা প্রকল্প করছে, তাতে উদ্বেগ! পাকিস্তান হাঙর ক্লাস সাবমেরিন নামাচ্ছে, তাতেও উদ্বেগ! বাংলাদেশ কয়টা বিমান কিনবে, তাতেও উদ্বেগ! অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে পঙ্গু দেখতে চায় তারা। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠে। দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন চুক্তি হলেও তা কাগজে কলমেই রয়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি অপসারণের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে বাংলাদেশকে কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহন, পানি সরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
আরও পড়ুন : রুশ-মার্কিন ডুয়েল গেমে বিএনপি-আ. লীগ
ভারত এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। এরপর টিপাইমুখ বাঁধ, তিস্তা বাঁধ এবং বাংলাদেশের উজানের অধিকাংশ নদীতে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহার করেছে, মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধের মতোই বাংলাদেশের জনজীবন বিপর্যস্ত করেছে। দুই দেশের তিক্ত সম্পর্ক মিষ্টি করার লক্ষ্যে সম্প্রতি বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দু’দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মিলেমিশে কাজ করার বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘ভারতের প্রায় ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে ১৬০ কোটির একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ-ভিত্তিক শক্তি তৈরি হয়; দু’দেশের সহযোগিতা বাড়লে এ অঞ্চল বৈশ্বিক প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হতে পারে।’ এখানে ‘বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বশক্তি’ কথাটি সাধারণত রাজনৈতিক একীভূতকরণ বা সার্বভৌমত্ব বিলুপ্তির অর্থে বলা হয়নি বলে প্রচার করা হলেও বার্তা সুখকর নয়।
তারেক রহমানের বিদেশ নীতি, সবার আগে বাংলাদেশ। তিনি আওয়ামী লীগের লুণ্ঠনে রিক্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে আগ্রহী ও এ দেশে বিনিয়োগ ইচ্ছুক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন। ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি ভালো অবস্থানে থাকলেও নিজ দেশেই ধনী-দরিদ্রের এত ব্যবধান, কৃষক-শ্রমিকের এত দুর্গতি আর কর্মসংস্থানহীন তরুণদের এত হাহাকার যে তাদের পক্ষে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব নয়। প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের নিরন্তর বাংলাদেশ বিদ্বেষ প্রদর্শন, বাংলাদেশ বিদ্বেষকে নির্বাচনে জেতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার; মুসলিম বিদ্বেষের কারণে বাংলাভাষী মুসলমান মানেই বাংলাদেশি এমন তকমার রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ধার না ধেরে বে-আইনিভাবে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা; ২০০৯-২৪-এর জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনাকারী দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও তার মানবতাবিরোধী অপরাধের দোসরদের ভারতে আশ্রয় দেওয়া-এসবের পরতে পরতে নানা ঘটনার বাঁক।
নিউজটি শেয়ার করুন