নিউইয়র্কে মেডিকেইড জালিয়াতির আড়ালে কোটি ডলারের খেলা * হোমকেয়ার ও অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারের নামে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ * রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক একশ্রেণির প্রবাসী বাংলাদেশি
হঠাৎ ধনীদের দরজায় এফবিআই
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৮
•
অনলাইন সংস্করণ
কিছুদিন আগেও ছিলেন সাধারণ চাকরিজীবী। এখন একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিক। বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি, বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য আর সামাজিক অনুষ্ঠানে বিত্তের প্রকাশ্য প্রদর্শনী। নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একশ্রেণির মানুষের এমন আকস্মিক আর্থিক উত্থান নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু সেই আলোচনায় এবার যোগ হয়েছে নতুন উদ্বেগ-মেডিকেইডের অর্থ আত্মসাৎ, হোমকেয়ার ও অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার ব্যবসায় অনিয়ম এবং ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থার অভিযান।
বিষয়টি এখন আর কেবল কমিউনিটির গুঞ্জনে সীমাবদ্ধ নেই। নিউইয়র্কের বিভিন্ন এলাকায় অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার ও স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাচ্ছে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোথাও চলছে তল্লাশি, কোথাও গ্রেপ্তার, আবার কোথাও জালিয়াতির অভিযোগে আদালতে হাজির করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালকদের।
গত ২০ অক্টোবর মঙ্গ কুইন্স, ব্রুকলিন ও স্ট্যাটেন আইল্যান্ডসহ নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালায় ফেডারেল তদন্তকারীরা। একাধিক অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার প্রতিষ্ঠান থেকে বাক্সভর্তি নথিপত্র ও অন্যান্য আলামত নিয়ে যেতে দেখা যায় তদন্তকারীদের। অভিযানের লক্ষ্য ছিল মেডিকেইডের অর্থে পরিচালিত সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ কমিশন, অর্থ পাচার ও ভুয়া বিলিংয়ের অভিযোগ।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল জানিয়েছেন, শতাধিক সেবাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের সেবার জন্য বরাদ্দ অর্থের অপব্যবহার বন্ধে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য সরকার যৌথভাবে সক্রিয় হয়েছে। গত ২০ অক্টোবরের অভিযান ছিল সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কে মেডিকেইড জালিয়াতি প্রতিরোধে অন্যতম উল্লেখযোগ্য সমন্বিত পদক্ষেপ।
কুইন্সের ফ্লাশিং এলাকায় একটি অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার প্রতিষ্ঠান থেকে ফেডারেল এজেন্টদের বাক্স নিয়ে বের হতে দেখা যায়। ব্রুকলিনের সানসেট পার্ক ও বরো পার্ক এলাকাতেও অভিযান চলে। স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তদন্তের আওতায় আসে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনওয়াইওয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শতাধিক সেবাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সরকারি অর্থে যেসব সেবা দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো বাস্তবে দেওয়া হয়েছে কি না এবং সেবাগ্রহীতাদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া বিল জমা দেওয়া হয়েছে কি না।
গত ২১ অক্টোবর বুধবার নিউইয়র্ক স্টেট কম্পট্রোলার থমাস ডিনাপোলি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানান, ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত এই অভিযান মেডিকেইড ব্যবস্থায় অনিয়ম শনাক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ।
তার দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যৌথ কার্যক্রমে মেডিকেইড জালিয়াতিসংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পাঁচ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ বা অর্থ ফেরতের নির্দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফলাফল অর্জিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের একটি অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার প্রতিষ্ঠানের দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্থানীয় প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে দেওয়া হয়নি এমন সেবার বিপরীতে মেডিকেইড ও সংশ্লিষ্ট লং-টার্ম কেয়ার ব্যবস্থার কাছে বিল দাখিল করেছে। গত ১৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া প্রায় চার মাসের কার্যক্রমে প্রায় পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ডলারের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন মৃত ব্যক্তি এবং বিদেশে অবস্থানরত সেবাগ্রহীতার নামেও সেবা দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। অন্তত ৩২ জনের নামে এ ধরনের বিলিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
এই ঘটনা মেডিকেইড জালিয়াতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি সামনে এনেছে। সেবাগ্রহীতা বাস্তবে উপস্থিত না থাকলেও বা সেবা গ্রহণ না করলেও তার নামে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারলে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত বড় প্রতিষ্ঠানে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কত হতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন বিচার বিভাগ কুইন্সের দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১২০ মিলিয়ন বা ১২ কোটি ডলারের মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ করে।
অভিযুক্ত ইনউ কিম, যিনি টনি কিম নামেও পরিচিত, ফ্লাশিং এলাকায় একটি ফার্মেসি ও দুটি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। অপর অভিযুক্ত ড্যানিয়েল লি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
আদালতে দাখিল করা অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সেবাগ্রহীতাদের নগদ অর্থ ও উপহারসামগ্রী দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নাম লেখাতে উৎসাহিত করা হতো। একই সঙ্গে প্রয়োজন ছিল না কিংবা বাস্তবে দেওয়া হয়নি এমন সেবার বিল সরকারি কর্মসূচিতে জমা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীরা আরও জানান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি মানুষের সেবা দেওয়ার বিল জমা দেওয়া হয়েছিল।
এই মামলায় এফবিআই, আইআরএস ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন, স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের দপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্তে অংশ নেয়। তল্লাশি পরোয়ানা কার্যকর করার পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা আইনত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।
নিউইয়র্কে মেডিকেইড জালিয়াতির ভয়াবহতার আরেকটি উদাহরণ ব্রুকলিনের হ্যাপি ফ্যামিলি ও ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতারণা চক্র।
২০২৪ সালে প্রকাশিত মামলায় প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে নগদ অর্থ ও অবৈধ কমিশনের বিনিময়ে মেডিকেইড সুবিধাভোগীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসা হতো। পরে বাস্তবে সেবা দেওয়া হয়নি এমন ক্ষেত্রেও বিল আদায় করা হতো।
এ মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত জাকিয়া খান ২০২৫ সালে দোষ স্বীকার করেন। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ব্রুকলিনের ফেডারেল আদালত তাকে ৭৬ মাস বা ছয় বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেন।
আদালত তাকে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে এবং ৫০ লাখ ডলারের প্রতারণালব্ধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেন। তদন্তের সময় তার বাড়ি থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছিল। বাজেয়াপ্ত সম্পদের মধ্যে একাধিক স্থাবর সম্পত্তিও ছিল।
একই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আহসান ইজাজ চলতি বছরের ২ অক্টোবর প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের মেডিকেইড জালিয়াতির ঘটনায় নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। বিচার বিভাগের তথ্যমতে, তিনি এই চক্রের দশম ব্যক্তি, যিনি দোষ স্বীকার করেছেন। এই মামলার ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, শুধু প্রতিষ্ঠানের মালিক নন, রোগী সংগ্রহকারী, বিপণনকর্মী এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও ফৌজদারি তদন্তের আওতায় আসতে পারেন।
ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি নিউইয়র্ক সরকারের নিজস্ব নিরীক্ষাতেও অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার ব্যবস্থার তদারকিতে বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত স্টেট কম্পট্রোলারের নিরীক্ষায় ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মেডিকেইডের সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়।
নিরীক্ষায় ২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি প্রশ্নবিদ্ধ পেমেন্ট শনাক্ত হয়। এসব পেমেন্টের সঙ্গে এমন প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল, যাদের অন্তত একটি পর্যালোচিত ম্যানেজড লং-টার্ম কেয়ার নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুই কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি অর্থ এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যাদের অনিয়ম, জালিয়াতির ঝুঁকি, সেবার মান বা অন্যান্য গুরুতর কারণে নেটওয়ার্ক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
নিরীক্ষায় আরও দেখা যায়, কোনো একটি স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক একটি প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিলেও অন্য নেটওয়ার্ক থেকে প্রতিষ্ঠানটি অর্থ পেতে থাকত। তবে নিরীক্ষায় চিহ্নিত সব প্রশ্নবিদ্ধ অর্থকে প্রমাণিত জালিয়াতি বলা যায় না। নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ ও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
মেডিকেইড মূলত স্বল্প আয়ের মানুষ, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য পরিচালিত সরকারি কর্মসূচি। নিউইয়র্কে এই কর্মসূচির মাধ্যমে হোমকেয়ার, ব্যক্তিগত সহায়তা এবং অ্যাডাল্ট ডে কেয়ারসহ নানা ধরনের সেবা দেওয়া হয়।
এই সেবাগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। বরং হাজার হাজার পরিবার প্রবীণ ও অসুস্থ সদস্যদের যত্ন নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সরকারি তদন্তে উঠে আসা মামলাগুলোতে কয়েক ধরনের জালিয়াতির পদ্ধতি দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, সেবা না দিয়েও সেবা দেওয়ার নামে বিল জমা দেওয়া। দ্বিতীয়ত, সেবাগ্রহীতা সংগ্রহের জন্য নগদ অর্থ বা অবৈধ কমিশন দেওয়া। তৃতীয়ত, সেবাগ্রহীতার উপস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তার তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা। চতুর্থত, বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে জালিয়াতির অর্থের প্রকৃত উৎস আড়াল করা।
হোমকেয়ার ব্যবস্থায়ও কাজের সময়, সেবাদানের বাস্তবতা এবং অর্থপ্রাপ্তির যথার্থতা গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের বিষয় হতে পারে।
তদন্তকারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাংক লেনদেন, বিলিং রেকর্ড, সেবাগ্রহীতার তথ্য, প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির হিসাব এবং ব্যবসায়িক আর্থিক সম্পর্ক পরীক্ষা করছেন।
মেডিকেইড জালিয়াতির ধারাবাহিক ঘটনাগুলোর মধ্যে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও হোমকেয়ার ও অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার ব্যবসাকে ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। কমিউনিটির সামাজিক পরিসরে এমন কিছু ব্যবসায়ীর আর্থিক উত্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যারা তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন, বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের মাধ্যমে নিজেদের সাফল্য তুলে ধরছেন।
কেউ দামি বাড়ি কিনছেন, কেউ বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করছেন, আবার কেউ সামাজিক ও ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক বিস্তারের ঘোষণা দিচ্ছেন। গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারি অর্থপ্রবাহের সুযোগে দ্রুত বড় হয়ে ওঠা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্রুত সম্পদ অর্জন করা, একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা কিংবা বিলাসবহুল জীবনযাপন করা কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। বৈধ ব্যবসার মাধ্যমেও এমন আর্থিক সাফল্য অর্জন সম্ভব।
একইভাবে মেডিকেইড খাতে জালিয়াতির ঘটনা প্রমাণিত হলেও তা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা সেই খাতের সব ব্যবসায়ীকে দায়ী করা যায় না। তবু সরকারি অর্থে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসায় স্বচ্ছতার দাবি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের সেবার নামে সরকারি অর্থ নেওয়া হলে তার যথাযথ হিসাবদিহি থাকা প্রয়োজন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, উদ্যোগ ও সুনামের সঙ্গে যুক্ত একটি কমিউনিটির জন্য এসব অভিযোগ উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
মেডিকেইড জালিয়াতির মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শুধু ফৌজদারি অভিযোগই আনা হচ্ছে না; তদন্তকারীরা অর্থের উৎস শনাক্ত করে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পদক্ষেপও নিচ্ছেন। প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, জরিমানা, ক্ষতিপূরণ, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
২০২৬ সালের ব্রুকলিনের মামলায় বাড়ি, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার বাজেয়াপ্ত করার ঘটনা দেখিয়েছে, অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হলে সেই সম্পদের ওপরও সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
মেডিকেইড ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে জালিয়াতি শুধু নিউইয়র্কের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের গত তিন বছরের জাতীয় অভিযানগুলোতে উঠে এসেছে বিপুল পরিমাণ সন্দেহভাজন আর্থিক অনিয়ম। ২০২৪ সালে দেশজুড়ে ১৯৩ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ২৭৫ কোটি ডলারের স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতিসংশ্লিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। ২০২৫ সালে আরও বড় অভিযানে ৩২৪ জনের বিরুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতিসংশ্লিষ্ট অভিযোগ প্রকাশ করা হয়।
চলতি বছরের ২৩ জুন ঘোষিত জাতীয় অভিযানে ৪৫৫ জনের বিরুদ্ধে ৬৫০ কোটি ডলারের বেশি কথিত জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিন বছরের এসব অভিযানে সব মিলিয়ে ৯৭২ জন অভিযুক্ত এবং প্রায় দুই হাজার ৩৮৫ কোটি ডলারের কথিত বা সম্ভাব্য জালিয়াতির পরিমাণ সামনে এসেছে। তবে এই পরিসংখ্যানে মেডিকেয়ার, মেডিকেইড ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিমাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের মামলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সম্পূর্ণ অর্থ সরকার থেকে আদায় করা হয়েছে, কিংবা প্রতিটি অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।
গত ২০ অক্টোবরের সমন্বিত অভিযান এবং সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, নিউইয়র্কে মেডিকেইড জালিয়াতির বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেলের দপ্তর, অঙ্গরাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা এবং ফেডারেল প্রসিকিউটররা বিভিন্ন মামলায় সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
সাম্প্রতিক অভিযান ও মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আরও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ব্যবসায়িক সাফল্য, আর্থিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক মর্যাদা অবশ্যই প্রশংসার বিষয়। কিন্তু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায় সাফল্যের প্রকৃত ভিত্তি হতে হবে বৈধতা, স্বচ্ছতা ও সেবার মান।
আলাদিনের চেরাগের মতো রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই সম্পদের ভিত্তি যদি হয় প্রতারণা, তাহলে দামি বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা কোম্পানির দীর্ঘ তালিকাও আইনের জবাবদিহি থেকে কাউকে রক্ষা করতে পারবে না।