‘নির্বাচিত সরকার ছাড়া দেশ স্থিতিশীল হবে না’-এর নতুন ভার্সন ‘আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে স্থিতিশীলতা আসবে না’। সাংবাদিক, বিশ্লেষক, সুশীল সমাজ, নাগরিক সমাজ ইত্যাদি পরিচয়ে তা এত দিন বাজারজাতের পর এখন রাজনৈতিক মহল থেকেও বলা শুরু হয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের গত কদিন ধরে খুব দায়িত্ব নিয়েই তা বলতে শুরু করেছেন। ভুলে বা মুখ ফসকে নয়, লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ারেই তা বলছেন তিনি। কেবল ভারতের প্রেসক্রিপশন নয়, দেশি-বিদেশি আরও কিছু শক্তির অ্যাসাইনমেন্ট অনুযায়ীই জিএম কাদের আওয়াজটি দিচ্ছেন। সমান্তরালে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও এর কূটনৈতিক ভার্সন দিয়েছেন।
মিলেমিশে কাজ করলে দুই দেশ বিশ্বশক্তি হয়ে যাবে বলে আশাবাদ শুনিয়েই থামেননি। বলেছেন, ভারতের প্রায় ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে ১৬০ কোটির একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদ-ভিত্তিক শক্তি তৈরি হবে। এ অঞ্চল হয়ে যাবে বৈশ্বিক প্রভাবশালী শক্তি। এখানে ‘বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব শক্তি’ কথাটি সাধারণত রাজনৈতিক একীভূতকরণ বা সার্বভৌমত্ব বিলুপ্তির অর্থে বলা হয়নি। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের বক্তব্য সাধারণত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে যৌথ শক্তি গড়ে তোলার ধারণাকে বোঝানো হলেও ভেতরের তথ্য ও ফের ভিন্ন। কেউ এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সংহতির পক্ষে বক্তব্য হিসেবে দেখেন, আবার কেউ বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখেন।
এ ধরনের আঞ্চলিক উন্নয়নের কথা ভারতের আগে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন। তবে তিনি দুই দেশের ঐক্য মিন করেননি। বলেছিলেন সাত দেশের কথা। সার্ক গঠনের মূল প্রস্তাবক হিসেবে ১৯৮০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার লক্ষ্যে এই আঞ্চলিক জোট গঠনের ধারণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ভারতের অনড় অবস্থানের কারণেই কার্যত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ।
সার্কের বিকল্প হিসেবে ভারত বর্তমানে বিমসটেকের মাধ্যমে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য জোরদারে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রশ্নে তাদের পাশার দান উল্টে গেছে চব্বিশের আগস্টে। এর পরও একদিকে সম্পর্ক উতরানোর চেষ্টা, আরেকদিকে মাঝেমধ্যেই দেশকে চাপে ফেলার ছক ঘোরানো হচ্ছে। আবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি খেলছে দশ দিকেই। মার্কিন ডিপ স্টেটকে আস্থায় রেখে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতেও কম করছে না। ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে আবারও বাংলাদেশে রাশিয়ার বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘এসবার’ ব্যাংকের শাখা চালুর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনা তা আটকে রেখেছিলেন। বিগত চার-পাঁচ বছর আগে এই ব্যাংকের শাখা ঢাকায় খোলার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলেও তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের প্রচ্ছন্ন চাপের কারণে তা থমকে গিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা-মস্কো দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিকল্প লেনদেন-ব্যবস্থা সচল করতে এই উদ্যোগ পুনরায় সচল করা হয়েছে। রাশিয়া সফরে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান মস্কোতে এসবার ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন।
রাশিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্রমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রোসাটমের বিরুদ্ধে এর আগে বিএনপি বহুবার অভিযোগ তুলে দাবি করেছে, প্রতিষ্ঠানটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার ঘুষ দিয়েছে। এখন ওই রোসাটমের কাছেও ধরনা দিচ্ছে? বিএনপি সরকার ব্রিকস এবং এসসিওতে যোগ দিতে চায়। এ দুটো সংগঠনই আমেরিকার চক্ষুশূল। আবার পতিত আওয়ামী লীগ রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখে মার্কিন ডিপ স্টেটের উঠানে ঘুরতে শুরু করেছে।
হাল বাস্তবতায় বাংলাদেশে ক্ষমতায় যাওয়া, ক্ষমতায় থাকা এমনকি কাউকে ক্ষমতা থেকে ফেলে দেওয়ায় ডিপ স্টেটের বিকল্প নেই- এই বুঝে স্থির হয়েছে আওয়ামী লীগ। নেতাকর্মীদের প্রতি শেখ হাসিনার নির্দেশনাও তা-ই। এদিকে মার্কিন ডিপ স্টেটের রেজিম চেঞ্জ ষড়যন্ত্রের জাল এবার পাকিস্তান ও ভারতে। মানে, দক্ষিণ এশিয়ার একের পর এক দেশকে টার্গেট করা হচ্ছে। শুরুটা শ্রীলঙ্কা দিয়ে করলেও পরে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালেও ঘটিয়েছে। এর পরই পাকিস্তানে সরকার পাল্টানোর আরেক প্লট। তা ঘুরছে ভারতেও। দেশটিতে ককরোচ জনতা পার্টির তাণ্ডব তেমন এগোচ্ছে না। তবে তাড়নায় ফেলেছে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে। এর মাঝেও তার সরকার বাংলাদেশকে পুশ ইনসহ নানা যন্ত্রণায় ব্যতিব্যস্ত রাখার কাজে কমতি করছে না। তার ওপর ঘটিয়ে বসেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-কাণ্ড। এর সুযোগ নিতে চাইছে পাকিস্তান।
প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হওয়া সত্ত্বেও ডা. জাহেদুর ভারতে যান সাধারণ পাসপোর্ট নিয়ে। এমনকি যাওয়ার আগে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদনও করেনি। দিল্লিতে নামার পর বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনকে বাংলাদেশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা চিঠি দেখিয়ে সার্ক ভিসা চান। এখানেই মূল বিপত্তি। তার ওপর ডা. জাহেদুর রহমানের বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থার কাছে আগে থেকেই তথ্য আছে। তিনি কট্টর ভারতবিরোধী এবং তার ইউটিউব চ্যানেল ভারতে নিষিদ্ধ। আবার মাত্র কদিন আগে তিনি ড. ইউনূস আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে অবনতি হয়, তা কাটানোর কথাও শোনান। জাহেদুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় যখন পাকিস্তানপন্থী কিংবা ভারতবিদ্বেষী মহল চরম মাত্রায় উসকানিতে মগ্ন, তখন দিল্লিতে ঘটল ঘটনাটি। বেনজীরের পর দুবাইতে আর কে আটক হতে যাচ্ছেন-এ নিয়েও বাজারে চলছে নানা কথা।