শেখ হাসিনার ফেরার ঢেকুরের ফের ★ অন্দরমহলে নানা রাজনীতি ★ সরকারে অস্থিরতা ★ পুলকে আওয়ামী লীগের হিতাকাঙ্খীরা
ঢাকায় দ্বিতীয় বিজয়ের স্বপ্নে বিভোর দিল্লি
ঠিকানা রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১১:৫১
•
অনলাইন সংস্করণ
এআই জেনারেটেড ছবি।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন তোলপাড়। পলাতকের ফেরার অসম্ভব রেকর্ড গড়ার ঢেকুর তুলে রাজনীতি জমিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত-বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আলোচনা জমানো প্রশ্নে এখন
পর্যন্ত সফল তিনি। দেশে ঢল, বন্যা, জলাবদ্ধতার এ দুর্বিপাকের মাঝেও তার ফেরা নিয়ে এন্তার আলোচনা। তার হিতাকাক্সক্ষীরা এটাই চেয়েছিলেন। পালাতে গিয়ে দৌড়ানোর রেসে ফার্স্ট আউট হওয়াদের জন্য তা এত সহজ না হলেও দেশে একটা কেওয়াজ বাধাতে কামিয়াবি হওয়ার আশা তাদের। এখন পর্যন্ত নগদ লাভÑআলাপটা জমানো গেছে। আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পথ, কৌশল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি দেশে ফিরতে চাইলে তাকে বহন না করতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। নানা দিক বিবেচনায় রেখে বিমানে না হলে স্থলবন্দর দিয়ে নেতাদের নিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা শেখ হাসিনার। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান।
দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে জেনেও তিনি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। ভারতে প্রায় দুই বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর আগামী ডিসেম্বরে তার ফেরার ঘোষণা ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন আলোচনার খোরাক দিয়েছে। বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা দিলীপ ঘোষ বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তার নিজের দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। দেশের আদালতে তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। তবে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পর পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলোও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে। ভারতীয় বাংলা সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে দেখা যায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় হিসেবে নয়, বরং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন একদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, অন্যদিকে তার ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, সেটিও নতুন মাত্রা পেতে পারে। ভারতের একাধিক সংবাদমাধ্যম শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ফেরার আওয়াজ দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকেও কিছুটা ঘাবড়াতে পেরেছেন। এই ঘোষণার আগে ও পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম কয়েক দিনের ব্যবধানে একই বিষয়ে তিনটি ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। ৮ জুলাই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আইনগত সুযোগের কথা বলেন। ১১ জুলাই একটি অনুষ্ঠানে তিনি রাজনৈতিক ভাষায় শেখ হাসিনাকে ‘কালকেই দেশে চাই’ বলে মন্তব্য করেন। আবার ১২ জুলাই বলেন, শেখ হাসিনার সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই; প্রত্যর্পণ বা অন্য প্রক্রিয়ায় ফিরলেও তাকে গ্রেপ্তার হয়েই কারাগারে যেতে হবে। একই বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান প্রসিকিউটরের পরপর তিন ধরনের অবস্থান জনপরিসরে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, বিচারিক বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলির বক্তব্যে ধারাবাহিকতা ও আইনি স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তার কাছে কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্ট ছিল। পরবর্তীকালে সরকার সেই পাসপোর্ট বাতিল করেছে। ফলে বর্তমানে তার কাছে বৈধ ভ্রমণ দলিল আছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে দেশে ফিরতে শেখ হাসিনার ট্রাভেল পাস প্রয়োজন হবে। আর ট্রাভেল পাস দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের হাতে। সরকার ট্রাভেল পাস দিলে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন; না দিলে সেটিই হবে বাস্তবিক বাধা। আইনের বাইরে বিষয়টি রাজনৈতিক। রাজনীতিতে দৌড়ানি বরাবরই একটি বিষয়। ভিন্নতা হলো দৌড়ের চোটে দেশান্তরি হয়ে যাওয়া। যাদের হাতে দৌড়ানি খেলেন, তাদেরকে ‘টোকাই, বস্তির ছেলে, রাজমিস্ত্রির ছেলে, কালাপাঠা’ নাম দিলে তাদের মর্যাদার একবিন্দু হানি হয় না, হানি হয় যারা দৌড়ানিটা খেল তাদের। এর চেয়ে শাহের দৌড়ানি, মার্কোসের দৌড়ানি, রাজাপাক্ষের দৌড়ানি অনেক মর্যাদার। তারা দম্ভভরে বলেনি, ‘কুত্তার দৌড়ানি খেয়ে পালিয়েছেন। তারা জানেন এবং মানেন, দুঃশাসনে বিক্ষুব্ধ অতিষ্ঠ জনগণ তাদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে। তারা কৃষক শ্রমিক রাজমিস্ত্রি কাঠমিস্ত্রি ভিখারি ভবঘুরে যে-কারও সন্তান। তাদের রং কালো। তারা বস্তিতে, গাছের নিচে, এমনকি রেললাইনের ধারেও বাস করেছে।
দৌড়ানি খেলে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পেছন ফিরে দেখা, দৌড়টা কারা খাওয়াচ্ছে। কারণ, তার ওপর নির্ভর করছে, টিকিটের ধরন, রিটার্ন না ওয়ান-ওয়ে! শেখ হাসিনার জিম্মাদার এখন ভারত। তার ফেরা না-ফেরা এখন আর তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। সেই সঙ্গে অতীতের অনেকগুলো ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সারা জীবনের অর্জন হচ্ছে, অবিরাম মিথ্যা বলা। তাই তার কথা কেউ আর বিশ্বাস করে না।
এদিকে শেখ হাসিনার ফিরে আসার আওয়াজের আড়ালে অনেক প্রশ্ন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির মুখে কেন শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে? যিনি আইনের চোখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এর পরও আওয়াজ দিয়ে তিনি সরকারকে চাপে ফেলতে পারছেন। দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার চেষ্টাও কিছুটা সফল। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে ডিসেম্বর মাসের কথা কেন বললেন, বিজয়ের মাস বলে? শেখ হাসিনা ফিরে এলে আসামি হিসেবে স্বভাবতই তার গন্তব্য হবে জেলখানা। তারপর কী? তার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে কি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নতুন করে রাজনীতিতে ফিরে আসবে? এ রকম আরও বেশ কিছু প্রশ্নও ঘুরছে। শেখ হাসিনার এ আওয়াজের পেছনে ভেতরগত কিছু তথ্যও রয়েছে।