অভিনন্দন নতুন রাষ্ট্রপতি : একজন মির্জা ফখরুল-রাজপথ থেকে রাজভবনে
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৯
•
অনলাইন সংস্করণ
রাজপথের লড়াকু সৈনিক। বিশ্বাসে, আস্থায় বটবৃক্ষের মতো অনড়-অটল। লোভে নতজানু হন না, ভয়ে আরও সাহসী হয়ে ওঠেন। রাজনীতির কাঁটা বিছানো পথে রক্তাক্ত পায়েও আগুয়ান, বিশ্বস্ততায় একশ নম্বরে পাস। তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যিনি রাজপথ ছেড়ে, রাজনীতির সোনালি ফসল ফলিয়ে এখন রাজভবনে। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে, প্রায় ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশের নামে যার নাম ‘বঙ্গভবন’। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন ২০ আগস্ট। ২১ আগস্ট তিনি ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের কাছ থেকে বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ গ্রহণ করেন। ফলাফল ঘোষণার পর তাঁকে প্রথম লাল গোলাপ শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শপথ গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম দায়িত্ব পালন করেন মন্ত্রিসভার ৬ সদস্যের শপথ পাঠ করিয়ে। পরে তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি শহীদ স্মৃতিসৌধেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে ইতিমধ্যেই বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডসহ অনেক রাষ্ট্র। বিরোধী দলের নেতারাও তার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজনীতির প্রতিটি ধাপে পরীক্ষায় পাস করে করে আজ রাষ্ট্রের অভিভাবক। তিনি কখনো কিছু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্জন করতে পারেননি। সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনেও তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই জয়ী হতে হয়েছে। ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে একসময় তাঁরই দলীয় সহযাত্রী সময়ের ব্যবধানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে ২৫৫-৮৮ ভোটে পরাজিত করে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সজ্জন, পরিশীলিত এবং উচ্চ সাংস্কৃতিক রুচির মানুষ, একজন ‘জেন্টলম্যান রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের একজন সদস্য। সেখান থেকেই তাঁর সাংস্কৃতিক শিক্ষার শুরু। এরপর প্রথম পেশা শিক্ষকতা। সেখানে তাঁর সাংস্কৃতিক বোধের আরও উন্নয়ন এবং চরিত্র ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। রাজনীতির ময়দানে এসেও তিনি সেই সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলেননি। সবার কাছেই তিনি একজন ভদ্র, সজ্জন, গ্রহণযোগ্য রাজনীতিবিদ ছিলেন। সংকটকালে তিনি ধীরস্থির, শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা সত্যি সকল রাজনীতিবিদের জন্য অনুসরণীয়। যে সময় দলের চেয়ারপারসন কারান্তরালে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাসনে, সে সময় তিনি রাজনৈতিক স্থিরতা, মেধা, আস্থা, প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে দলকে সকল ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত থেকে রক্ষা করেছেন। বারবার দলভাঙনের আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছেন। তিনি আওয়ামী সরকারের গত তিন টার্মে ১১ বার কারারুদ্ধ হয়েছেন এবং সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর জেল খেটেছেন। কিন্তু মনোবল হারাননি। দলের নেতা-কর্মীকে উজ্জীবিত রেখেছেন। ঐক্যবদ্ধ রেখে সরকারি নিপীড়ন-নির্যাতন সয়েছেন। হতাশায় কখনো ভেঙে পড়েননি। মনোবল অটুট রেখে পরবর্তী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন। অবশেষে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সমর্থ হয়েছেন ছাত্র-জনতার মিলিত সংগ্রামে।
এখন দেখার বিষয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে নিজের ক্যারিশমা দেখিয়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের বা প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক গণ্য করা হয়। এত দিন তিনি বিএনপির মহাসচিব ছিলেন। সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন। এবার তিনি দল বা সরকারের অংশ নন। বরং আম-জনতার সঙ্গে তাদেরও অভিভাবক। অভিভাবকের দায়িত্ব দল ও সরকারের ঊর্ধ্বে থেকে সকলকে সমনজরে দেখা। জেন্টলম্যান থেকে কোমলে কঠোরে তাঁকে যেখানে যা জরুরি, সেই অবস্থান নিতে হবে। তিনি এখন যেমন সাধারণ জনতার অভিভাবক, তেমনি নিজ দলসহ সকল দল ও সরকারেরও অভিভাবক। এই দায়িত্ব পালনে তিনি কতটা সফল হন, আগামীর ইতিহাসে সেটাই লিপিবদ্ধ থাকবে। সফল হলে মানুষ তাকে চিরকাল শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে। নইলে মানুষের বিস্মৃত হতে মোটেও সময় লাগবে না।
এটাই তাঁর লাস্ট স্টপ রাজনীতিতে। এখানেই তাঁর সাফল্য-ব্যর্থতার শেষ পরীক্ষা। দেশবাসীর প্রার্থনা, অতীতে অর্জিত সকল অভিজ্ঞতা দিয়ে রাজনীতির এই শেষ পরীক্ষাতেও তিনি একশ নম্বর নিয়েই পাস করবেন। তিনি রাজনীতির মিরজাফর হবেন না, হবেন ‘মির্জা গালিব’।
ঠিকানা পরিবার, তার সকল পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভকামনা।