বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​১৫ আগস্ট : ইতিহাসের এক শোকাবহ অধ্যায়

​১৫ আগস্ট : ইতিহাসের এক শোকাবহ অধ্যায়

বিজ্ঞাপন
১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর শোকাবহ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সপরিবারে নিহত হন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাজনৈতিক মত ও আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, তাঁর শাসনকাল নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা থাকতে পারে; কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্জন নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, গণআন্দোলন এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। মওলানা ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক নেতারা বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১ সালে সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামরিক নেতৃত্বে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ বহু বীর মুক্তিযোদ্ধার অবদানও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তবে স্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্বে বঙ্গবন্ধুই ছিলেন বাঙালির জাতীয় আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক নেতা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ গোটা জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিল। তাঁর ভাষণের ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ অংশটুকু বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর ঘরে ঘরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বানও যুদ্ধে বড় ভূমিকা রাখে।

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস সামরিক অভিযান শুরু হলে বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের অসীম আত্মত্যাগ এবং শেষ পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয় চূড়ান্ত হয়।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। তাঁর সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে ইতিহাসে বিতর্ক আছে এবং থাকবে। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের প্রাণহানি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ও রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে। বিদেশে অবস্থান করায় তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান।

দীর্ঘদিন ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়েছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমানে দিনটি আর সরকারিভাবে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে স্বীকৃত নয়। কিন্তু সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি হয় না, আবার স্বীকৃতি প্রত্যাহার করেও ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর শাসনামলের ভুল-ব্যর্থতার নির্মোহ মূল্যায়ন অবশ্যই হবে। একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের সব রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং লাখো মানুষের আত্মত্যাগও যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করতে হবে। কারণ স্বাধীনতা কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির অর্জন।

১৫ আগস্ট তাই আমাদের শুধু শোকের কথাই মনে করিয়ে দেয় না, একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাও দেয়-রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান হত্যা, প্রতিহিংসা কিংবা ইতিহাস মুছে ফেলার মধ্যে নেই। বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তার স্বাধীনতার ইতিহাস থাকবে; আর সেই ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Developed by SolveEz