সম্প্রতি নিউইয়র্কের জনপ্রিয় এবং জনমত গঠনে একজন প্রভাবক মেয়র জোহরান মামদানি এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মানুষকে মর্যাদাবান করে তোলার কথা বলেছেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকার বলতে ঠিকানার প্রায় দুই পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশ পেয়েছে সাক্ষাৎকারটি। সাক্ষাৎকারটি ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত হয়। ঠিকানার ২২ জুলাই সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় মেয়র মামদানি এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিক লুলু গার্সিয়া-নাভোরার ছবিসহ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে।
মেয়র মামদানি মানুষের জীবন বদলানোর রাজনীতির প্রত্যাশা করেছেন। তাই তার রাজনীতির মূল ফোকাসটাও মানুষের ওপর। রাজনীতির কেন্দ্রে মানুষকে স্থাপন করতে চেয়েছেন। মানুষই যে সবার বড়, সবার উপরে, সবকিছুর কেন্দ্রে-এটাই তার বিশ্বাসের মূলে। সে জন্য তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ভেতরে প্রবেশ না করেই তার চিন্তা, দর্শন, তার ভবিষ্যৎ রাজনীতি, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে কিছু কথা বলা যায়; যা তিনি তার সাক্ষাৎকারের ভূমিকাতেই ব্যক্ত করেছেন।
আসলে সৃষ্টির মূলেই তো আছে মানুষ। আর মানুষ সৃষ্টির পর সেই অন্ধকার যুগ থেকে আজকের একুশ শতকের যত সৃষ্টি, আবিষ্কার, উদ্ভাবন, বিজ্ঞানের অলৌকিক সব অগ্রগতি, চাঁদে যাত্রা, মঙ্গলগ্রহে যাত্রার আয়োজন-সবকিছুই মানুষের মেধার ফসল। এ জন্যই মানুষের জয়গান ঘোষিত হয়েছে। মধ্যযুগে ৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পতনের মধ্য দিয়ে এই যুগের সূচনা। কবি বড়ু চণ্ডীদাস মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই।’ বড়ু চণ্ডীদাস মানে সেই মহাকবি চণ্ডীদাস। মানব শ্রেষ্ঠত্বের এত বড় মানবিক বাণী আর হয় না। সমগ্র বিশ্ব যখন হিংসায় উন্মত্ত, সে সময় এই বাণীর মধ্য দিয়ে মানব ধর্ম ও মানব প্রেমকে সবকিছুর উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে মৌলিক সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে।
সেই পরম্পরায় কত শতাব্দী পর চণ্ডীদাসের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র মামদানির আত্ম প্রত্যয়ে সেই মহান বাণীই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতিতে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিশ্বাস করেন। তার কথায় এ বাণী স্পষ্ট, মানুষই কর্তা আর সবকিছু কর্ম। তাই তো তিনি নির্ভাবনায় বলতে পেরেছেন, ‘শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা নয়, মানুষের জীবন বদলানোর রাজনীতি চাই।’ তার কথার মর্মার্থ হচ্ছে, ‘মানুষের জীবন বদলাতে পারলে সবকিছু বদলানো সম্ভব।’ আর এই বদল মানুষের রাজনীতির মধ্য দিয়েই সম্ভব। মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে পারলে সবকিছু পাল্টে যাবে।
বর্তমান জনপ্রিয়তা তার আকাশচুম্বী। নিউইয়র্ক নিক্সের এনবিএ চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে শহরজুড়ে উচ্ছ্বাস সৃষ্টি, বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে নিউইয়র্কে জন-উন্মাদনা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা দেখার আয়োজন, বিভিন্ন সমাবেশে উপস্থিত তার জনপ্রিয়তাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। তিনি ট্রাম্প সম্পর্কে তার মন্তব্যও তুলে ধরেছেন সাক্ষাৎকারে। তার সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং চরম ডানপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলতে গিয়ে কোনো দ্বিধা না রেখে স্পষ্ট করেই বলেছেন, আমেরিকায় যে এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অবক্ষয় শুরু হয়েছে, এ তারই অংশ। অন্যদিকে গাজা যুদ্ধ নিয়ে বলতে গিয়ে এটাকে যুক্তরাষ্ট্রের দেউলিয়াত্বের উদাহরণ বলেছেন। মানুষ তাদের চোখ দিয়ে দেখছে এক, রাজনীতিবিদেরা বলছেন অন্য কথা। এতে রাজনীতিকদের প্রতি জনতার আস্থাই নষ্ট হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, তার স্থান এখন হেগে। কেননা আন্তর্জাতিক আদালত তাকে যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধে অভিযুক্ত করেছেন।
মেয়র মামদানি তার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন সম্পর্কে খোলামেলা বলেন, সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা কর্মসূচির সূচনা করা হয়েছে। ভাড়া স্থিতিশীল অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া বৃদ্ধি বন্ধ করা হয়েছে। বিনা ভাড়ায় বাসসেবা এখনো পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নিÑএ কথাও মেয়র মামদানি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি সবাইকে নিউইয়র্কে স্বাগত জানিয়ে সাক্ষাৎকার শেষ করার আগে বলেছেন, নিউইয়র্ককে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষ ভালোবাসার অনুভূতি নিয়ে বাস করবে।
এই যে মানুষকে সবকিছুরই উপরে স্থান দিয়ে ভাবনা, এই ভাবনাই তো জনতার নেতার ভাবনা হবে। তার মনের গোপন কোণে সর্বক্ষণ গুনগুন করবে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’