যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী চালচিত্র : যৌথ জীবনযাপন এখন এক দুঃস্বপ্নের নাম
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৯
•
অনলাইন সংস্করণ
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্স ঘোষিত হয়। তার আগে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ স্বাধীনতার লড়াই। সেখানে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন জর্জ ওয়াশিংটন। এরপর সংবিধান রচিত হয়। জন্ম নেয় প্রেসিডেন্সি। প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন জর্জ ওয়াশিংটন, প্রথম ১৩টি স্টেট নিয়ে। সে কারণে ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা (ইউএসএ)। এরপর আরও স্টেট যুক্ত হয়। বর্তমানে ৫০টি স্টেট নিয়ে ইউএসএ। তখন সর্বসম্মত আদর্শ হিসেবে যে নীতি গ্রহণ করা হয়, তার মর্মার্থ ছিল বিশ্বের সকল নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের আশ্রয়স্থল হবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ হবে সব বন্দি মানুষের মুক্ত আকাশ। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে নিষ্পেষিত মানুষের অভয়ারণ্য হবে এই দেশ। এ দেশের বিনির্মাণে দাস নামের অভিবাসীদের রক্ত, শ্রম, ঘাম এবং বহু মানুষের জীবনদানের কথা অর্জিত ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল।
বলা হয়ে থাকে, যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাবনার সীমা নেই। যে কারণে বলা হয়, স্কাই ইজ দ্য লিমিট। অভিবাসীদের জন্য সেই উদার আকাশ নেই। সে আকাশ নামতে নামতে জমিনে মিশেছে। এমন একটা সময় ছিল, যখন আফ্রিকা থেকে দাস কিনে আনা হতো এ দেশের সব বড় বড় স্থাপনা নির্মাণে। পেছনে চাবুক নিয়ে সাহেবরা পাহারা দিত, দাসরা যেন শ্রমে ফাঁকি দিতে না পারে। তখন এমন প্রকৌশলগত যান্ত্রিক উন্নয়ন ঘটেনি। প্রধানত নির্ভর করা হতো মানুষের শ্রমের ওপর। এখন নির্মাণ জগতে অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। এ ছাড়া বর্তমান একুশ শতকে আগের মতো আর বিদেশি শ্রমের কদর নেই। আগে ছিল ‘আনো, আনো’। এখন ‘খেদাও, তাড়াও’। ধরে ধরে বিমান বোঝাই করে ফেরত পাঠাও যার যার দেশে। খবরের কাগজ খুললেই অভিবাসীবিরোধী খবরের ছড়াছড়ি। অবৈধ তো বটেই, অনেক বৈধ অভিবাসীর মধ্যেও ভয়, আতঙ্ক-কখন কী হয়। কিছুদিন আগেও যে নিউইয়র্ক ছিল অভিবাসীদের জন্য অভয়ারণ্য, এখন নিউইয়র্কও আর নিরাপদ নয়। আইস (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) বারবার নিউইয়র্ক সিটির, বিশেষ করে কুইন্স ও ব্রুকলিন বরোর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও সমাবেশস্থলে হানা দিয়ে আনডকুমেন্টেড অভিবাসীদের ধরছে। এতে অভিবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
আজকের এ সম্পাদকীয়তে আর ওইসব সংবাদভিত্তিক কোনো কথা নয়। বর্তমান এ সম্পাদকীয়র বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের। অবশ্যই ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত। তবে ইউএসসিআইএসের ইস্যু করা কোনো নির্দেশনা, কোনো ঘোষণা কিংবা নতুন নিয়ম-কানুন বা পুরোনো নিয়ম-কানুনে পরিবর্তন বা সংযোজন সংক্রান্ত নয়। এটি বিশেষ একটি ইমিগ্র্যান্ট শ্রেণির হৃদয়স্পর্শী বিচ্ছেদ-বেদনার কথা। ঠিকানার বার্তা সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, তারই স্বনামে একটি হৃদয়ভাঙা মানবিক প্রতিবেদন : সব আছে। ডকুমেন্টেড। তবু ছোটবেলায় শোনা সেই গান, ‘এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি। মাঝখানে নদী ঐ বয়ে চলে যায়।’ গানের সেই নদী বাস্তবে সমুদ্র, মহাসমুদ্র হয়ে গেছে। কিছুতেই ও কূলের বাসিন্দারা আর এ পারে এসে প্রিয়জনের সঙ্গে মিলতে পারছে না। কেবলই দু’কূলের হাহাকার দীর্ঘশ্বাস হয়ে বাতাসে ভেসে ভেসে দু’কূলের দুই মনকে উদাস করে দেয়। এর অবসান কবে ঘটবে, কেউ জানে না। সাজানো ঘর আছে, বর নেই। সাজানো সংসার আছে, ঘরনি নেই। সে কারণেই শহীদুল ইসলামের প্রতিবেদনটির শিরোনামে সেই হাহাকার : ‘কবে আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব?’ প্রতিদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে ভিডিও কলে কথা হয়। পর্দার এ পাশে স্বামী, অন্য পাশে স্ত্রী। কথা বলতে বলতে কখনো রাত গভীর হয়। কখনো অভিমান জমে, কান্নায় বন্ধ হয়ে যায় ফোন। পরদিন একই অপেক্ষা, হয়তো দূতাবাস থেকে কোনো ই-মেইল আসবে। হয়তো তাদের সংসার অবশেষে একই ছাদের নিচে শুরু হবে। কিন্তু সেই ‘হয়তো’ দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
দীর্ঘ প্রতিবেদন। ছত্রে ছত্রে কেবলই দীর্ঘশ্বাস। হাহাকার। বুকভাঙা ক্রন্দন। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা স্থগিত। প্রিয়জনকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ। তাই রাত দীর্ঘ হয়, প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। ভিসা কবে ফের চালু হবে, কেউ জানে না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার মাঝখানেই কেউ চিরতরে হারিয়ে যাবে কি না, কেউ জানে না। কিন্তু আবেদনকারীদের হৃদয় ভাঙলেও কর্তৃপক্ষের মন গলে না। আমাদের প্রার্থনা, কর্তৃপক্ষের মন গলুক। বুকভাঙা মানুষদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটুক।