বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা খবরে খবরে সয়লাব। রাজধানী ঘিরে সব দেশেই বহুবিধ খবর জন্ম নেয়। সে হিসেবে ঢাকাকে ঘিরে নানা রকমের খবর সৃষ্টি স্বাভাবিক। তবে ঢাকার বৈশিষ্ট্য ব্যতিক্রমী। ঢাকার সব খবরেই খুঁজতে গেলে দূষণের একটা গন্ধ মিলবে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদীদূষণ। বর্জ্যদূষণ তো আছেই। ইদানীং খবরের অঢেল প্রাচুর্যে খবরদূষণ লক্ষ করা যাবে। কত ধরনের যে খবর। কত রকম তার পরিবেশনা। কত অতিরঞ্জন, কোথাও ধান ভানতে শিবের গীতের মতো মনের মাধুরী মিশিয়ে পরিবেশন, যেখানে আসল খবর খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য। তার মধ্যে আছে রাজনীতি, অর্থনীতি, বিনোদন, সমালোচনা, সংসদে তর্ক-বিতর্ক। সব মিলিয়ে নিলে সেসবেও একটা দূষণ পাওয়া যাবে।
তবে আজকের সম্পাদকীয়তে উপরে উল্লেখিত কোনো দূষণ নিয়ে কথা নয়। আজ অন্য এক ভিন্ন খাতের দূষণ নিয়ে কথা হবে। সে দূষণের নাম মানবদূষণ। না, এ মানুষের মনের কোনো দূষণ নয়। মানবসমুদ্রও একধরনের দূষণ সৃষ্টি করে। ১০ জনের বসতঘরে যদি ৫০ জন বসত করে, তবে যে দূষণ সৃষ্টি হয়, তাকে নিশ্চয় মানবদূষণ বলা যায়। ঢাকার মানুষের যে চাপ, সারা বিশ্বের অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে মানুষের সে চাপ দেখা যায় না। দূষণের দিক থেকেও রাজধানী ঢাকা শীর্ষে। এ জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকেও পিছিয়ে থাকতে হয়। বিদেশি ক্রেতা বা বিনিয়োগকারীরা ঢাকায় অবস্থান করে আরাম বোধ করেন না। উল্টো উৎপাদনকারীদেরকেই বিদেশে গিয়ে, লবিং করে অর্ডার আনতে হয়। এতে খরচ এবং সময় দুটোই বেশি ব্যয় হয়ে যায়।
তাই আজকের যে সংকট, আগামী দিনে আরও কত গুণ যে বৃদ্ধি পাবে, কল্পনা করতেও আতঙ্কিত হয়ে উঠতে হয়। ঢাকায় এখন এক কোটির মতো মানুষ বাস করে। রাজধানী শহরের অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো এলাকায় যত মানুষ বাস করে, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি মানুষ বিভিন্ন বস্তিতে বাস করে। অনেক মানুষ ঢাকায় রয়েছে, যাদের বলা হয় ভাসমান। অর্থাৎ এদের নির্দিষ্ট কোনো আশ্রয় নেই। নেই কোনো নির্দিষ্ট কাজ। যেখানে রাত, সেখানেই কাত। কিছু পেলে খায়, না পেলে অনাহারে বাস। এর পরও প্রতিদিন শত শত মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী স্রোতে মিশে ঢাকায় মানুষের ভিড় বাড়াচ্ছে। সব রকম দূষণে অবদান রাখছে।
১ কোটি জনসংখ্যার চাপে এখনই ঢাকার হাঁসফাঁস অবস্থা। এই অবস্থার মধ্যেই পত্রিকান্তরে জানা গেল, গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো আগামী ২৪ বছরে অর্থাৎ ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
ঠিকানার ১৫ জুলাই সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠার একেবারে তলানিতে ছোট্ট করে প্রকাশিত একটি সংবাদ, শিরোনাম : ‘২০৫০ সালে ৫ কোটি ছাড়িয়ে যাবে ঢাকার জনসংখ্যা’। সংবাদটি ছোট করে পরিবেশিত হলেও তাৎপর্যে মোটেও ছোট নয়। রাজধানী ঢাকা যেন কোটি কোটি হৃদয়ের এক জীবন্ত জনসমুদ্র-প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে এই কথা দিয়ে। তার পরই বলা হয়েছে, এই জনসমুদ্রে প্রতিবছর ৫ লাখ করে মানুষ যুক্ত হচ্ছে এবং এই হারে ঢাকার জনসমুদ্র স্ফীত হতে থাকে। তবে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৫ কোটির অধিক, যা একটি আধুনিক রাজধানী শহরের জন্য এক অতিমানবীয় সংখ্যা। গ্রাম থেকে শহরমুখী এই জনস্রোত ঢাকার জন্য যে সংকট সৃষ্টি করছে, তার অভিঘাতে দেশের অর্থনীতিকেই প্রতিনিয়ত দুর্বল করে তুলছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের হিসাবে জনসমুদ্রের এই চাপ কর্ম ও পরিবহন খাতকে প্রায় অকেজো করে তুলছে।
রাজধানীর যানজটে প্রতিদিন কয়েক শত কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। রাজধানীতে যানজটে আটকা পড়ে মানুষকে ৪/৫ ঘণ্টা পর গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। শম্ভুক গতির পরিবহনসহ মানবসমুদ্র এসব কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কারণ বলে মনে করা হয়। যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ছে শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে।
দেশের নগর পরিকল্পনাবিদেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অচিরেই যদি রাজধানীর এই দুঃসহ পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না যায়, তবে রাজধানী শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। বিদেশিরা ঢাকা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন-ব্যবস্থায় এমন নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যে অর্থনীতি ভয়ংকর সংকটে পতিত হবে, যা থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলবে বলে মনে হয় না।