মহাচীন সফরে মহাসাফল্য তারেক রহমানের। তবে তিস্তা মহাপ্রকল্প নিয়ে সুখবর নেই। আলোর মুখ দেখছেন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের। মহাচীনের মহাপ্রত্যাশা এখনও রহস্যের আঁধারে। প্রায় ৭ বছর ধরে চলছে মহাপ্রস্তুতি। ধারণা ছিল তারেক রহমান সরকার চূড়ান্ত করবেন। ২০২৬-এর জুন সফর এনে দেবে ফলাফল। কিন্তু না, সফরসঙ্গী হননি পানিসম্পদমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট সচিবও নেই সফরকারীদের তালিকায়। অর্থাৎ তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি কার্যপত্রে গুরুত্ব পায়নি। অথচ সবার ধারণা- মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত প্রায়।
রংপুর দখলে ভারতীয় ভীতি
পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে
উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর রংপুরে উত্তেজনা বাড়ছে। গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে রামমূর্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে উত্তেজনা। ৮১ ফুট সুউচ্চ মূর্তি শুধু নয়। রামবিগ্রহ ও ৪১টি মূর্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এসেছে। এতে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে সাধারণ ও উগ্রবাদী মুসলমানরা। অন্যদিকে উগ্র সনাতনী ও ইনকনপন্থীরাও সোচ্চার। নিজেদের ইচ্ছেমাফিক ধর্মীয় স্থাপনা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। অবস্থাদৃষ্টে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগো লাগো পরিস্থিতি।
দেশে যেকোনো স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন কর্তৃপক্ষীয় অনুমোদন। রামমূর্তি বা ধর্মীয় স্থাপনার নির্মাণ অনুমোদন নেই। এছাড়া সাম্প্রদায়িক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের সম্ভাবনা প্রবল। এজন্যে সরকার রামমূর্তি নির্মাণ স্থগিত করেছে। ২১ কোটি টাকা অর্থের জোগান নিয়েও বিতর্ক উঠেছে। মূল উদ্যোক্তা কখনও হিন্দু, কখনও মুসলিম। কখনও বাংলাদেশি। কখনও আবার ভারতীয়। কখনও ব্যবসায়ী, কখনও কারাগারের আসামি। রামমূর্তির উদ্বোধনে স্থানীয় এমপি, মেয়র, ইউএনও নেই। ভারতীয় হাইকমিশনের উপপ্রধান মূলত প্রধান অতিথি।
বাংলাদেশ সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ দিয়েছে দুঃসংবাদ। রংপুর দখলে ভারতের সুদূরপ্রসারী চাল এটি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে হিন্দুরক্ষায় নিতে পারে উদ্যোগ। ভারতের সম্মিলিত বাহিনী আকস্মিকভাবে ঢুকে পড়তে পারে। একাধিক সামাজিক মাধ্যম ও নিউজ পোর্টালও দিয়েছে আভাষ। উগ্র সনাতনী নেতারাও বাংলাদেশে বসে হুমকি দিচ্ছে। অ্যাডভোকেট চৈতালী চৌধুরী বলেছেন, ‘সনাতনী প্রদেশ’ বানাবেন। আরেক নেতা বলেছেন, পলাশবাড়ি থেকে মুসলিমরা সরে যান। আমরা এদেশের নাগরিক, যত খুশি মন্দির-মূর্তি বানাব।
হাসিনার হাতেও ছিল চীনের তিস্তা প্রকল্প
ভারত যেভাবে তা ঠেকিয়েছিল
বিতর্কিত স্থানটি শিলিগুড়ি চিকেন নেক-এর নিকটবর্তী। ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর সূচিমুখটি নিয়ে ভারত বিশেষভাবে চিন্তিত। পাশাপাশি সন্নিকটেই চীন প্রস্তাবিত ‘তিস্তা মেগাপ্রজেক্ট। পূর্বোক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ২০২১-এর ১৭ আগস্ট পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ফাইল পাঠায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রস্তাবপত্র যায় ‘একনেক’-এ। রহস্যজনকভাবে তথ্যটি চলে যায় দিল্লিতে। পরদিনই ঢাকায় হাজির পররাষ্ট্রসচিব মি. শ্রিংলা। প্লেন চার্টার করে ঢাকায় হাজির হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখোমুখি দাঁড়ান। চীন প্রস্তাবিত ‘মেগাপ্রকল্প’ আটকে দেন। উল্লেখ্য, পূর্বে তিনি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার ছিলেন।
পরে ভারত একটি বিকল্প প্রস্তাবনা পাঠায়। কিন্তু সেটি বাস্তবসম্মত ছিল না। নানা জটিলতায় তিস্তা পানি চুক্তিও আর স্বাক্ষরিত হয়নি। ফলে শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তরবঙ্গ কখনও খরায়, কখনও বন্যায়।
তিস্তা প্রকল্পে তিন মন্ত্রীর আশ্বাস
বিশ্বাস পাচ্ছে না রংপুরবাসী
মধ্য জুনে তিনজন মন্ত্রী যান তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পে। পানিসম্পদ মন্ত্রী এ্যানী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ আজাদ। এছাড়া দুর্যোগ প্রতিরোধ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। স্থানীয় জনগণ ব্যাপকভাবে মন্ত্রীবৃন্দকে অভিহন্দন করে। লালমনিরহাটের জনপ্রতিনিধি দুলু পূর্বে তিস্তা আন্দোলন করেছেন। ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়’ স্লোগানকে মুখরিত করেন।
ক্ষমতাসীন হয়ে এবারও আলোড়ন তুলতে চেয়েছেন মন্ত্রীরা। কিন্তু জনগণ আশ্বাস পেলেও ততটা বিশ্বাস পায়নি। কারণ, অতিদ্রুত সমাধানের নিশ্চয়তা দেননি। বলেছেন, চীন না হলেও সরকার নিজেই করবে। ১০ হাজার কোটি টাকার জোগান দিতে হবে। এজন্য ৭-৮ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। কিন্তু তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবেই। আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উল্লেখ্য, চীন সফরে মন্ত্রীত্রয়কে নেননি তারেক রহমান। সচেতন মহল বিষয়টিকে তীর্যক দৃষ্টিতে দেখছেন। অধিকাংশের মতে, সরকার নতুন কৌশল খুঁজছে। ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রকল্প এটি। নাকের ডগায় চীনের উপস্থিতি মানছে না ভারত। এজন্য বাংলাদেশে নানারকম অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জঙ্গি মিছিল। সীমান্তে সীমান্তে ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা। উগ্র মুসলিম ও সনাতনীদের সাম্প্রদায়িক উসকানি। রংপুর দখলে বিজেপি নেতা, বিশ্লেষকদের ঘোষণা।
বৃহত্তর রংপুরের উন্নয়ন ‘ইউনূস
সরকারে আটকে আছে
পরিস্থিতি সামলে নিতে সময় নিচ্ছে তারেক সরকার। বিশ্লেষকদের মতে, রংপুরের উন্নয়ন ‘ইউনূস সরকারে আটকে আছে’। তিস্তা প্রকল্প, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালুকরণ। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিকীকরণ। নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার চীনা হাসপাতাল। বৃহত্তর রংপুরে বৃহত্তর কোনো প্রকল্পই দৃশ্যমান হয়নি। ভারতের অদৃশ্য হাতছানিতে উন্নয়ন স্থবিরতা বলে জানা গেছে।
বাজেটে তিস্তা প্রকল্পের বরাদ্দ নেই
বাস্তবায়নে চীনের নামটিও সুস্পষ্ট নেই
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন সফরে তারেক রহমান। তিস্তা প্রকল্প এলাকা সফর করেছেন তিন প্রভাবশালী মন্ত্রী। পরপরই তিস্তা অববাহিকায় বিশাল দুর্ঘটনা। ভারত তাদের ‘গজলডোবা’ ব্যারাজের ২০টি গেট খুলে দিয়েছে। ফলে বিশাল পাহাড়ি ঢল ও পানির চাপ। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে টইটুম্বুর পরিস্থিতি। ৪৪টি জলকপাট বা গেট ভেঙে পড়ার অবস্থা। অবশেষে একযোগে সব ক’টি বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে। তাতে ২৪ ঘণ্টায় তিস্তার পানি ৩০-৪০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ডালিয়া ও দোয়ানি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই।
নদী পাড়ের হাজার হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। আমন ধানের বীজতলা, বাদাম হুমকির মুখে। বিভিন্ন শাক-সবজির ক্ষেত, জনজীবন বিপন্ন। শুরু হয়েছে দু’পাড়েই নদীভাঙন। বুকভাঙা কান্না নিয়ে উত্তরবঙ্গ উচ্চকিত। কিন্তু তিস্তা সমস্যার সমাধান সুদূর পরাহত।
শুধু ভারত নয়, আমেরিকাও চীনা প্রকল্পের বিরুদ্ধে। চীনযাত্রার আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত অস্থির হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ূন কবিরকে প্রতিবাদ জানান। তিস্তা মহাপ্রকল্পে চীনের একক ভূমিকার নিন্দা জানান। বরং সরকারকে নিজ অর্থায়নের প্রস্তাব করেন। যাতে অন্যান্য দক্ষ দেশও প্রকল্পে যুক্ত হতে পারে।
ভারতীয় হাইকমিশনার মি. ত্রিবেদীও বসে থাকেননি। সচিব পর্যায়ে একাধিক বৈঠক করেন। পরামর্শ দেন, যাতে চীনের আধিপত্য না থাকে। সেক্ষেত্রে পদ্মা সেতু নির্মাণে শেখ হাসিনা স্টাইল মেলে ধরেন। ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাংক’ বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতুটি হয়েছে। সেভাবে তিস্তা প্রকল্প হলে ভারত বাঁধা দেবে না।
তারেক রহমানের সরকার এ নিয়ে তড়িঘড়ি করছে না। যথেষ্ট নিরাপত্তা পেলে চীনকে কথা দেবে। যাতে বিরোধিতা করলে ভারতকে ঠেকানো যায়। অর্থনৈতিক সমাধান পেলে তবেই মেগাপ্রজেক্ট। গত বাজেটে তিস্তা বিষয়ে স্পষ্ট বরাদ্দ নেই। মহাচীন যে কাজটি পাচ্ছে- সেটিও সুস্পষ্ট নয়।