বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

চাপে চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা বাংলাদেশ

চাপে চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
চাপে চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থা বাংলাদেশের। বাইরের চাপ, ভেতরের চাপ। চাপ নেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু জানা নেই, তবে এখন পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। এখনো স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আরএফএল পাইপের একটা বিজ্ঞাপনে দেখেছিলাম, নাট্যাভিনেতা সাব্বির আরএফএল পাইপ নিয়ে বলছেন, ‘আমি আর কত চাপ নেব।’ একাত্তর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সে রকম চিৎকার শোনা যাচ্ছে না। তবে চাপের কমতি নেই।

বাংলাদেশের ওপর চাপ মানে বাংলাদেশের পরিচালনার দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, আসলে তাদের ওপর। দেশ বলতে নির্বাক একটি ভূখণ্ড, একটি মানচিত্র, একটি জাতীয় পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত। মানুষ সুর করে জাতীয় সংগীত গায় বটে, আসলে তো সবই নির্বাক, জড়। তবে এসব নির্বাক হলেও একটি দেশের এসব এমনই মৌলিক, যা জাতিসত্তার মধ্যে এমন শক্তি জোগায়, এমন বোধের জন্ম দেয়, একটি জাতি অপরাজেয় হয়ে ওঠে। শিরদাঁড়া এমন সোজা এবং কঠিন করে দেয়, সে জাতি আর কারও বশ্যতা স্বীকার করতে চায় না। কোনো ঝড়-ঝাপটায় নুয়ে পড়ে না।

একটি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এ শক্তি ষোলো আনা থাকলেও আমাদের মতো দেশের রাষ্ট্রপরিচালক, মানে সরকারের সেই শক্তি সমভাবে থাকে না। সে কারণেই বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখে সরকার ভেঙে পড়ে। নতজানু হতে দেখা যায়। বাংলাদেশ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আমরা সবাই জানি, এর জন্য কী রকম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। পরাজিতরা জান কবুল করে লড়েছে। আমাদের জীবন, মাল-সম্ভ্রম লুট করে নিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস যেমনটা সাক্ষ্য দেয়, হানাদার, দখলদার বাহিনী কখনো স্বাধীনতা অর্জনের চেতনায় জানমাল কবুল করা একটি জাতিকে পরাজিত করতে পারে না। আমাদের ক্ষেত্রেও পারেনি। আমরা বিজয়ী হয়েছি বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সে তেজ অটুট থাকলেও, যারা যখন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতার মসনদে বসুক, তারা সেই প্রতিশ্রুতির প্রমাণ রাখতে পারেননি। ক্ষমতার লোভের বৃত্তে আটকে তারা প্রতিশ্রুতি ভুলে যান। জনস্বার্থ, দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হন। দেশের অভ্যন্তরে অনেক দেশবিরোধী শক্তির সঙ্গে আপস করে ফেলেন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। আবার একই লক্ষ্যে বাইরের শক্তিমানদের সঙ্গেও আপস করে চলেন।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা লোভের চেয়ে আর কোনো বড় লোভ আছে বলে মনে হয় না। তাই যারাই ক্ষমতায় যান, তারাই ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য সব ভুলে মরিয়া হয়ে ওঠেন। ক্ষমতানিষ্ঠায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যখন কোনো সরকার জনতার শক্তির ওপর আস্থা হারিয়ে বিভিন্ন সংস্থা বা বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখনই তাদের পতন লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তখনই বহিঃশক্তি এবং দেশের অভ্যন্তরের সুযোগসন্ধানী বিভিন্ন দল-উপদল নিজেদের স্বার্থ পূরণ করতে নানা রকম চাপ প্রয়োগ করে সরকারের ওপর। জনবিচ্ছিন্ন সরকারও তখন সেই সব শক্তির চাপের কাছে পরাজয় মেনে তাদের জনস্বার্থবিরোধী অনেক দাবির কাছেই আত্মসমর্পণ করে নিজেদের গদি রক্ষা করার চেষ্টা করে। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা আম-ছালা সবই হারায়। কেননা জনগণ সঙ্গে না থাকলে কেউ সঙ্গে থাকে না। নেতৃত্ব যখন দেশের জনগণকে বিশ্বাস করে এবং সকল স্বার্থের উপরে জনস্বার্থকে স্থান দেয়, তখন জনগণও সেই নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সেই নেতৃত্বের সকল নির্দেশনা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে। নেতা এবং জনতার এই বন্ধনে তখন অনেক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যেমন সহজ হয়, তেমনি অনেক বড় বড় শক্তির সঙ্গেও পাঞ্জা লড়ে বিজয়ী হওয়া যায়। তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত ১৯৭১-এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। নেতৃত্বের প্রতি নিরঙ্কুশ আস্থা রেখে এমন পাথরের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল যে অন্যতম চৌকস পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজয় মানতে বাধ্য করেছিল। ৯৩ হাজার চৌকস সৈন্য নিয়েও পাকিস্তানের পরাজয়ের দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন জেনারেল নিয়াজী।

কিন্তু কোন অদৃশ্য কারণে আজ নেতৃত্বে ক্ষমতার লোভ পেয়ে বসল, তা মনে হয় ব্যাখ্যাতীত। তবে পত্র-পত্রিকার পাতা খুললে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কান পাতলে, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ বুলালে দেখা যায়, বিভিন্ন তরফে বিভিন্নভাবে সরকারের ওপর চাপ আসছে এবং সে চাপ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না বলে তার কাছে সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন সংকটে বাংলাদেশের গণ-আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেছে ছাত্র থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আবার অনেক সময় সরকারের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে বিস্ফোরিত হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্বের প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের প্রতি মানুষ আস্থা রেখেছে। নেতারাও সেই আস্থার সম্মান রেখেছেন। কিন্তু যারা মানুষকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছেন, ’৭১ থেকে আজ অবধি নেতারা জনতাকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সব নেতাই কমবেশি তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তাদের জনগণকে দূরে সরিয়ে দিয়ে অন্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে দেখা গেছে এবং প্রায় প্রত্যেক আন্দোলনের নেতারাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের পতন ত্বরান্বিত করেছেন। এবং সেই পতন সবার জন্যই হয়েছে চরম নির্মমতা এবং বর্বরতার মধ্য দিয়ে।
জনগণ ব্যতীত অন্য আর যেকোনো শক্তির ওপর ভর করে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের ওপর সেই শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ বুঝে নিতে সরকারের ওপর, সব সময় দেখা গেছে এমন চাপ দিতে, তাদের সেই চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই জনতার ওপর ভরসা করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে চললে নেতৃত্ব এবং জনগণ কাউকেই কোনো অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয় না।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz