বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

​বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ

​বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বোঝা বড়ই কঠিন। রাজনীতির পথ বড়ই আঁকা-বাঁকা। সরল রেখায় রাজনীতি চলে না। তাই সরল অঙ্কের মতো রাজনীতি মনে হলেও তার ফল মেলানো বড়ই জটিল কাজ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, যার মাধ্যমে অবসান ঘটে দলটির টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনের। হাসিনা সরকারের পতনের পর মনে করা হয়েছিল, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। জনগণের নিরাপত্তাও সুরক্ষিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালনা করতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হওয়ায় তারা সে পথে হাঁটেনি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে গণতন্ত্রের পরিবর্তে নতুন এক তন্ত্র মবোক্র্যাসি চালু হলো বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে। পূর্বে ছিল গণপিটুনি। মাঝেমধ্যে সে কথা শোনা যেত। সেটা না ছিল সংগঠিত, না ছিল রাজনৈতিক। মবোক্র্যাসিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রেশার গ্রুপ। এর ফলে মবোক্র্যাসি উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

নির্বাচিত সরকার আসার পর মবোক্র্যাসি অনেকটাই কমে গেছে। তবে গণতন্ত্র এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনীতিও আগের চেহারায় নেই। বাংলাদেশ বাংলাদেশিদের কাছেই এখন এক অচেনা দেশে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশ থেকে ফিরে আসা যার সঙ্গেই কথা হয়েছে, সবার মুখেই এক কথা—বাংলাদেশ যেন আর সেই চেনা দেশ নেই। রাজনীতি, অর্থনীতিতে যত না বদল ঘটেছে, তার চেয়ে অধিক বদল ঘটে গেছে সামাজিকতা ও সংস্কৃতিতে। রাস্তাঘাটে বেশুমার মানুষ চলছে, কেউ পায়ে হেঁটে, আবার কেউ নানা ধরনের পরিবহনে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, সবাই ভালোই আছে। হাসছে, খেলছে, নিত্য জরুরি কাজে ব্যস্ত রয়েছে—এই তো স্বাভাবিক জীবন। সুখী সুখী ভাব। ছাপোষা সংসার-জীবন। না ধনী, না গরিব—এমন একটা দেশের মানুষের জন্য এর বেশি আর কী চাই?

এর মধ্যেও বুঝতে পারা যায়, সব থেকেও কী যেন নাই। সবার ভেতরেই কেমন যেন একটা ভয়, একটা শঙ্কা। কখন যেন কী ঘটে যায়। যারা রাষ্ট্র চালান, যারা বিরোধিতা করেন, যারা মিলিটারি বা পাবলিক আমলা, সকলের মুখেই এক কথা—ষড়যন্ত্র চলছে। দেশের বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে। সরকার, বিরোধী সকল দলের মুখেই ষড়যন্ত্রের কথা। ইউনূস আমল থেকে আরেকটি নতুন কথা যুক্ত হয়েছে, ‘ডিপ স্টেট’। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না—তার নাম ডিপ স্টেট। যারা এর বেনিফিশিয়ারি, তারাও ডিপ স্টেটের ভেদ ভাঙে না। সাধারণ মানুষের তাই সব সময় ভয়ের মধ্যে বসবাস। সাধারণ মানুষকে ভয়ের মধ্যে রেখেই সবার সব কাজ। রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি করেন মানুষকে ভয়ের মধ্যে রেখে। আমলারা আমলাগিরি করেন মানুষকে ভয়ের মধ্যে রেখে। ঘুষখোরেরা ঘুষ খায় মানুষকে ভীতির মধ্যে রেখে। এমনকি যারা খুন করে, তারাও মানুষের এই ভীতিকে কাজে লাগিয়েই তা করে। মানুষ সর্বক্ষণ ভয়ের মধ্যে থাকলে সাহস হারিয়ে ফেলে। না মরেও মরার মতো থাকে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে না। ভালো কাজেও সাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে না। এসব দূর করতে হলে প্রথমে রাজনীতির গতিপথ ঠিক করতে হবে। রাজনীতি বিপথে চললে সবকিছুই বিপথে চলে। মানুষ বিপথগামী হয়। গণতন্ত্রের কাঠামো ভঙ্গুর হয়। রাজনীতিবিদেরা গণবান্ধব না হয়ে পীড়নের শক্তিতে পরিণত হয়। পুলিশ তার দায়িত্ব ভুলে যায়। সামরিক বাহিনীও এমন সময় বহিঃশত্রুর মোকাবিলা না করে লোভের বৃত্তে আটকা পড়ে যায়। দেশ তখন আর মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারে না।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ৫৫ বছরে একটা স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের রাজনীতির গতিপথ জনমুখী হবে না, তা কখনোই প্রত্যাশিত ছিল না। ঘুষ, দুর্নীতি, সহিংসতা কমবেশি সব দেশেই থাকে। তা সত্ত্বেও যদি আইনের শাসন থাকে, সামাজিক ন্যায়বিচার থাকে, গণতন্ত্র ও সুশাসন থাকে, তবে মানুষকে ভীতির মধ্যে বসবাস করতে হয় না। রাজনীতিও অতীতমুখী থাকতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা সব সময় অতীতমুখী রাজনীতিই করে গেলাম। ও করেছে, আমিও করছি। ভাবতে চাই না, ও করেছে বলেই আমি আজ ক্ষমতায় এবং আমিও একই কাজ করছি বলে আগামীকাল আমিও থাকব না। জোর করে থাকতে চাই বলে নির্বাচনে ভয় পাই। নির্বাচন নিয়ে নয়-ছয় করতে চাই।

আমরা কি তবে এতটুকুও স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারিনি, ‘না গরিব না ধনী’। আমরা এমন একটা দেশ, যাকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। ৩০ লাখ মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দান করেছেন। শত শত মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। দখলদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতায় কত জনপদ উজাড় হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের পরও নিজ দেশের শাসকদের অন্যায় অপশাসনের বিরুদ্ধে বারবার লড়তে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। তার পরও কেন এমনটা দেশের রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের অবস্থা। আজও কেন মানুষকে নিজেদের কথা বলতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেতে হয়। রাজনৈতিক সহিংসতায় বেশুমার প্রাণ দিতে হয়। মানুষ তো পেতে চেয়েছিল মুক্তি, চেয়েছিল স্বাধীনতা।

মুক্ত স্বাধীন দেশের মানুষের তো কথা ছিল গলা ছেড়ে গাইবার : ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে/ নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে।’ তা কি পেরেছি? তা কি পারছি?? ভবিষ্যতেও কি পারব???

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz