বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

এই পথ যদি না শেষ হয়

এই পথ যদি না শেষ হয়

বিজ্ঞাপন
আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কোর্সের শেষ সেমিস্টারের শেষ ক্লাসটি করে চোখে-মুখে ক্লান্তির হাসি ফুটে ওঠে নাদিয়ার। একে একে চার-চারটি বছর এভাবেই পার করেছে ও। আর মাসখানেকের মধ্যে রেজাল্ট। তারপর কনভোকেশন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে (এলএসই) ফাইনাল ইয়ারে পড়ে নাদিয়া। তার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল এলএসইতে পড়াশোনা করার। এর পেছনে তার মায়ের অবদান কোনো দিনও ভুলবার নয়। স্বল্পভাষী বাবা বরাবরই চুপচাপ। শুধু মৃদু হেসে উৎসাহ দেন। সব বুদ্ধি, পরামর্শ মায়ের। এই যে চার-চারটে বছর কোনো দিকে না তাকিয়ে, কোনো আনন্দ-উৎসবে তেমন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করে সে যে কেমন করে চলেছে, তা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন। আর জানেন মা। প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্ত মা উৎসাহ দিয়ে চলেছেন। আর সে জন্যই আজ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত সে। আজ উইনজোরে এসেছে নাদিয়া। এখানে তার বাবার খালাতো ভাই থাকেন। মা, বাবা আর ছোট্ট ভাইটি এসেছে দেশ থেকে। লন্ডন আর প‍্যারিস বেডাবে। এরপর যাবে সুইজারল্যান্ডের পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট শহর লুসার্নে। সেখানে তার মামা থাকেন। অনেক দিন ধরে যেতে বলছেন তিনি। যাওয়া হয়নি। এবার সবার ইচ্ছে পুষিয়ে নেওয়া যাবে। পরদিন টিকিট কাটা ইউরোস্টারে। নাদিয়াই কেটে রেখেছে মাসখানেক আগে। তখন বেশ সস্তায় পাওয়া গেছে টিকিট। এখন প্রচণ্ড দাম। আগামীকালই রওনা দেবে ওরা। ইউনিভার্সিটি সপ্তাহ চারেক বন্ধ থাকার সুযোগে ওরা ঘুরে বেড়াবে লন্ডন আর প‍্যারিস এবং লুসার্ন। সবশেষে যাবে জার্মানিতে। সেখানকার প্রাচীন ছোট্ট শহর ফরসাইমে বাবার আরেক খালাতো ভাই থাকেন। সেখানে কয়েক দিন বেড়াবে। সব মা আর নাদিয়ার প্ল্যান। আগে প‍্যারিস। তারপর লুসার্ন। এরপর ফরসাইম। সবশেষে লন্ডন। লটারি করে ঠিক করেছে ওরা। সবার মন এখন অনাবিল এক আনন্দে ভাসছে। অবশেষে তাদের ইউরোপ ভিজিট আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে।
২.
আংকেলের বাসা থেকে সময়মতোই বের হলো ওরা। গন্তব্য লন্ডন সেইন্ট প‍্যানক্রাস ইন্টারন্যাশনাল স্টেশন (London St. Pancras International station)। স্টেশনটির বিশাল আয়তন আর জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখে হতবাক ওরা সবাই। পৃথিবীর যেকোনো নামকরা এয়ারপোর্টের চাইতে কোনো অংশে কম যায় না। ট্রেন ছাড়তে তখনো ঘণ্টা দুয়েক বাকি। এ সুযোগে পায়ে হেঁটে স্টেশনটির যতটুকু সম্ভব ঘুরে দেখে নিল ওরা। টিকিটের এক জায়গায় চেক-ইন এবং গেট নাম্বার লেখা আছে। সে অনুযায়ী নির্ধারিত গেটের দিকে এগোল ওরা। বিশাল লাইন। কিছুদূর গিয়ে লাইনটি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এবার ইমিগ্রেশনের পালা। ওরা যেই ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি হলো, তিনি ফ্রেঞ্চ পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা। পাসপোর্ট আর বাহকের চেহারা মিলিয়ে দেখে অল্প সময়ের মধ্যে ৯০ দিনের এন্ট্রি ভিসার সিল দিয়ে দিলেন তিনি। এবার সবার সঙ্গে সঙ্গে সামনের এস্কেলেটরের দিকে এগিয়ে গেল ওরা।
৩.
এস্কেলেটরে করে ওপরে উঠে এল সবাই। সবার মধ্যে ভীষণ তাড়া। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দেবে। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতেই ইউরোস্টারের দিকে তাকাল নাদিয়া। এবং অবাক বিস্ময়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়েই রইল। এটা ট্রেন নাকি ঝকঝকে নতুন প্লেন! ধারণার বাইরে এর সৌন্দর্য। এভাবে চলতে চলতেই একসময় ওদের কম্পার্টমেন্ট পেয়ে গেল ওরা। ট্রেনটি দোতলা। নিচে লাগেজের জায়গা না হওয়ায় দোতলায় ওসব রেখে নিচে এসে নির্দিষ্ট সিটে বসে পড়ল নাদিয়া আর তার ছোট ভাই। মা-বাবা আগেই সিট নম্বর মিলিয়ে বসে পড়েছেন। ইউরোস্টার ছুটে চলেছে লন্ডন শহরের বুক চিরে। কিছুক্ষণ পর সাব-আর্ব শুরু হলো। দুই ভাইবোনের দু’চোখে অপরিসীম আগ্রহ। দু’চোখ ভরে সবকিছু দেখে নিচ্ছে। ঘণ্টাখানেক পর তাদের কম্পার্টমেন্টের ভেতরটা দেখতে শুরু করল নাদিয়া। একনজরে প্রায় সব যাত্রী দেখা শেষে তাদের পেছনের সিটে চোখ পড়তেই প্রায় চিৎকার করে উঠল নাদিয়া। আবরার, তুমি?
৪.
চমকে উঠেছে আবরারও। ঢাকার নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটির হাতে গোনা সুন্দরী ও স্মার্ট সহপাঠীদের মধ্যে একজন নাদিয়া। বেশ কয়েক বছর পর তার সঙ্গে দেখা এই লন্ডনে, ইউরোস্টারে! আবরারই উঠে এল। মা-বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল নাদিয়া। তারপর দুজনে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আলাপ শুরু করল। কথায় কথায় আবরার জানাল, সে প‍্যারিসের একটি ফ‍্যাশন ডিজাইন ইন্সটিটিউট থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। সেখানেই একজন নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনারের অ্যাপ্রেনটিস হিসেবে কাজ করছে। তবে ফাইনালি বাংলাদেশেই কাজ করার ইচ্ছা তার। নাদিয়াও তার কথা জানাল। বলল, কনভেনশনের পর তারও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার প্ল্যান।
৫.
প্যারিসে নাদিয়াদের হোটেল শহর থেকে একটু দূরে। মূল শহরে হোটেল ভাড়া নাগালের বাইরে। তাই তিন দিনের জন্য এ হোটেলটিকেই বেছে নিয়েছে ওরা। এক রুমেই দুটি ডাবল বেড রয়েছে। একটাতে মা-বাবা। অন্যটিতে ফাহিম আর ও। হোটেলটি ছোট হলেও বেশ সুন্দর, গোছানো। লবিতে ওয়েটিং প্লেসে বিশাল কয়েকটি পেইন্টিং টাঙানো রয়েছে। অত‍্যন্ত রুচিশীল পেইন্টিং। ঢোকার পথেই মোনালিসার বিশাল একটি রেপ্লিকা। হোটেলের অধিবাসীদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিমুহূর্তে যে তারা এখন প‍্যারিসে অবস্থান করছেন। হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেছে। রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার খাওয়ার সময় পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে সবার। উবার ফুডের অর্ডার দিল নাদিয়া। আধঘণ্টার মধ্যে ডিনার ডেলিভারি দিল ওরা। পেটভরে তৃপ্তি নিয়ে খেল তারা। পরদিন সকালে রুমেই নাশতা সেরে নিল ওরা। একটু পরেই প্যারিসের অন্যতম আকর্ষণ ল্যুভ মিউজিয়ামের (Louvre Museum) উদ্দেশে রওনা দেবে তারা। হোটেলে বসেই অনলাইনে মিউজিয়ামের টিকিট কেটে নিল নাদিয়া। তারপর chat GPT-তে শেষবারের মতো ল‍্যুভ মিউজিয়াম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত রাইট-আপে চোখ বুলিয়ে নিল :
  • ল্যুভ মিউজিয়াম বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও বৃহৎ জাদুঘর। এর ইতিহাস প্রায় ৮০০ বছরেরও বেশি পুরোনো।
  • ১১৯০ সালে ফ্রান্সের রাজা ফিলিপ দ্বিতীয় প‍্যারিসকে রক্ষা করার জন্য এখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করেন।
  • পরবর্তী সময়ে দুর্গটি ধীরে ধীরে রাজপ্রাসাদে রূপান্তরিত হয় এবং বহু ফরাসি রাজা এখানে বসবাস করেন।
  • ১৭৯৩ সালে, ফরাসি বিপ্লবের সময়, ল্যুভ সাধারণ মানুষের জন্য জাদুঘর হিসেবে খুলে দেওয়া হয়।
  • পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতার অসংখ্য শিল্পকর্ম এখানে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়।
  • বর্তমানে এখানে প্রায় ৩৮,০০০ প্রদর্শনযোগ‍্য শিল্পকর্ম রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা।
  • ল‍্যুভের কাচের পিরামিড প্রবেশদ্বার ১৯৮৯ সালে উদ্বোধন করা হয়।
৬.
হোটেল থেকে বের হতে হতে বেলা ১১টা বেজে গেল। ল‍্যুভ মিউজিয়ামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা সাড়ে ১১টা বেজে গেল। মেইন গেট দিয়ে ঢুকতেই দূরে মিউজিয়ামের সুবিশাল অবয়ব চোখে ধরা দিল। পায়ে হেঁটে ওরা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। প্রচুর দর্শক সমাগম। সারা পৃথিবী থেকে এসেছে সবাই। বিভিন্ন অবয়ব, নানা বর্ণের, নানা আকারের। বিশাল মূল ভবন কিছুটা কাছে সরে এসেছে। হাতের ডানে পিরামিড আকারের গেট মূল ভবনে প্রবেশের জন্য। সম্পূর্ণ কাচের তৈরি। অসম্ভব সুন্দর। এবার শুরু হলো ছবি তোলার। মা-বাবাকে কাচের পিরামিডের সামনে রেখে কয়েকটি ছবি তুলল নাদিয়া। নিজের এবং ছোট ভাইয়েরও ছবি তুলতে ভুলল না। তারপর হাতের বামে এগিয়ে গেল দু-একজন দর্শকের কাছে জিজ্ঞেস করে। লক্ষ্য, ওখানকার আন্ডারগ্রাউন্ড রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ সেরে নেওয়া। কারণ মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট থেকে আগেই জেনেছে পুরো মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে চার-পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে। ততক্ষণে রেস্তোরাঁগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। নির্দিষ্ট বিল্ডিংয়ে পৌঁছে লিফট দিয়ে নিচে নেমে এল তারা। প্রচুর রেস্তোরাঁ সেখানে। অনেক রেস্তোরাঁয় কাচের শোকেসে কিছু খাবার সাজিয়ে রাখা। তবে বেশির ভাগ রেস্তোরাঁয় খাবারের ছবিসহ ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড। একটা রেস্তোরাঁয় খাবারের অর্ডার দিল তারা। কিন্তু সেখানে বসার কোনো জায়গা নেই। একটু খুঁজতেই বসার জায়গা পেয়ে গেল। আশপাশের সব রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে সবাই এ রকম অনেক বসার জায়গায় বসে খাচ্ছে। এখানকার খাবার বেশ সুস্বাদু। সবাই তৃপ্তি মিটিয়ে খেল। একটু পরপরই ওয়েস্টবিন রাখা। একটু পরপরই ক্লিনার এসে পলিথিনের ভরে যাওয়া ব‍্যাগ সরিয়ে নতুন ব‍্যাগ রেখে যাচ্ছে।
মিউজিয়ামে প্রবেশ করল ওরা রেস্তোরাঁ ভবনের কাছাকাছি গেট দিয়ে। তারপর চারদিকে তাকাতে তাকাতে এগোল সামনের দিকে। কোনটা রেখে কোনটা দেখবে! সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে গেলে কয়েক দিন লেগে যাবে। দেয়ালচিত্র, ওয়েল পেইন্টিং, স্ট‍্যাচু, আরও কত কি! প্রতিটি শিল্পকর্ম কোনো না কোনো ইতিহাসের কথা বলছে। দর্শকদের মাঝে একধরনের তৃষ্ণা লক্ষ করল নাদিয়া। অনেকেই কোনো কোনো শিল্পকর্মের সামনে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন এগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে নীরবে কথা বলার চেষ্টা করছে। অনুভব করছে কালের নীরব ইতিহাস উপলব্ধির।
৭.
দর্শক-পথ কোন সময় সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেছে। প্রবেশ করেছে নতুন কক্ষে। তার পাশাপাশি আরও কিছু কক্ষ। সেগুলো দেখা শেষ হলে আবার সিঁড়ি। এবার নিচের দিকে। এ রকম একটার পর একটা কক্ষ দেখা শেষ করছে ওরা অন‍্যান‍্য দর্শকের সঙ্গে। এরই মাঝে কীভাবে চার ঘণ্টা পার হয়ে গেছে টের পায়নি ওরা। তবে যারা বয়োবৃদ্ধ তারা টের পাচ্ছেন ঠিকই। কিছুদূর পরপর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য গোলাকার কাঠের ফ্রেম বসানো। সেখানে কিছুক্ষণ বসে তারা জিরিয়ে নিচ্ছেন। এবার নাদিয়া বিড়বিড় করে আপনমনে বলল, কোথায় গেল পেইন্টিংটি! দূর থেকেই বিশাল ভিড়টা চোখে পড়ল নাদিয়ার। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখা গেল একটা ছোট্ট পেইন্টিংকে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ হয়ে। পেইন্টিংটার সামনে অর্ধবৃত্ত আকারে ব্যারিকেড দেওয়া। তার সামনে দর্শকদের চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। যেন কেউ কোনো কথা বললেই পেইন্টিংটি নীরবতা ভেঙে ধমকে উঠবে। ধীরে ধীরে সেই অর্ধবৃত্তের একদম কাছাকাছি চলে এল ওরা। পেইন্টিংটি এবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—মোনালিসা! মোহাবিষ্টের মতো পেইন্টিংটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে নাদিয়া। ওর অন্তর কখন যে নীরবে মোনালিসার সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছে, তা নিজেও জানে না। আশপাশের মানুষ, মা-বাবা, আদরের ছোট্ট ভাইটি—সবাই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে ওর কাছ থেকে। সেখানে শুধু মোনালিসা আর নাদিয়া।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz