জেবা শপিং কার্ট ঠেলে বোতল-রিডেম্পশন সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে ধাতব ক্যানের ঠোকাঠুকি আর যন্ত্রের একটানা গুঞ্জন ভেসে আসে। সারি সারি বড় বড় রিভার্স ভেন্ডিং মেশিন দাঁড়িয়ে আছে। সামনে কয়েকজন মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে একজনের পর একজন খালি বোতল আর ক্যান ঢুকিয়ে যাচ্ছে। জেবা ধীরে ধীরে ব্যাগ খুলে প্রথমে একটি প্লাস্টিকের বোতল বের করে।
বোতলের বারকোডটি উপরের দিকে রেখে মেশিনের গোল মুখে ঢুকিয়ে দেয়। মুহূর্তেই মেশিনের ভেতরের রাবারের চাকাগুলো বোতলটিকে টেনে নেয়।
ঘররর... ভুঁউঁ... খট্!
একটি লাল লেজারের আলো বোতলের গায়ের বারকোড স্ক্যান করে। তারপর ভেতর থেকে ক্ষীণ যান্ত্রিক শব্দ শোনা যায়।
বিপ!
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, ‘অ্যাকসেপ্ট, পাঁচ সেন্ট।’
এরপর বোতলটি ভেতরে গিয়ে চাপা পড়ে।
ক্র্যাঁচ... চড়চড়... ঠক্!
প্লাস্টিকটি চ্যাপ্টা হয়ে মেশিনের ভেতরের বড় সংগ্রহপাত্রে পড়ে। জেবা এবার একটি অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান ঢোকায়।
ঘরর... বিপ!... কড়ড়ড়... ক্রাঞ্চ!
মুহূর্তের মধ্যেই ক্যানটি চূর্ণ হয়ে যায়। পাতলা ধাতু ভেঙে যাওয়ার সেই কর্কশ শব্দে মনে হয় যেন কেউ শক্ত হাতে টিনের পাত মুচড়ে ফেলল। কিন্তু এই বিকট শব্দও এই মুহূর্তে জেবার কানে সহনীয় শ্রুতি তোলে, যা তাকে ক্রমে উত্তেজিত করে তোলে।
এভাবে একটির পর একটি বোতল, তারপর ক্যান ঢোকাতে থাকে। প্রতিবারই একই দৃশ্য-মেশিন টেনে নেয়, স্ক্যান করে, গ্রহণের সংকেত দেয়, তারপর ভেতরে চ্যাপ্টা করে ফেলে। স্ক্রিনের সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে-
পাঁচ সেন্ট, দশ, পঁচিশ, ওয়ান ডলার, থ্রি, ফোর-ক্রমে টেন ডলার ফাইভ সেন্ট।
মেশিনের ধ্বনির সঙ্গে জেবার হৃদয়ের ধ্বনি একাকার হয়ে যায়। সব বোতল-ক্যান শেষ হলে জেবা স্ক্রিনের নিচের ‘প্রিন্ট রিসিট’ বোতামে চাপ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মেশিনের ভেতর থেকে ছোট্ট প্রিন্টার কাগজ বের করতে শুরু করে।
ঘরর... ঝিঁইই... ছিঁড়িক!
এক টুকরো রসিদ বেরিয়ে আসে।
জেবার পাশের মেশিনে একজন কম বয়সী মেয়েও রিডেম্পশন মেশিনে বোতল ঢোকাচ্ছে। কালো, ছিপছিপে গড়নের মেয়েটির পরনে ছোট্ট স্টাইলিশ আঁটসাঁট পোশাক। বড় বড় রঙিন নখ। হাতে কয়েকটি চিকন ব্রেসলেট। আঙুলে ছোট ছোট আংটি। বাহু ও কাঁধে নানা রঙের নকশা করা ট্যাটু। চোখে গাঢ় মেকআপ, লম্বা কৃত্রিম আইল্যাশ চোখের দৃষ্টিকে আরও তীক্ষè করে তুলেছে। ভ্রু নিখুঁতভাবে আঁকা, ঠোঁটে হালকা রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো আধুনিক কায়দায় সাজানো, মাঝে মাঝে কাঁধ ছুঁয়ে ছড়িয়ে সাজে যোগ করেছে বাড়তি আকর্ষণ। সাজপোশাক দেখলে বোঝার উপায় নেই, সে একজন সাধারণ শ্রমিকের কাজ করে।
আসলে আমেরিকায় যে মানুষটি উচ্চ পদে চাকরি করে, সেও যেমন সুন্দর করে সাজে; যে মানুষটি দোকানে কাজ করে, এমনকি যে মানুষটি ক্লিনিংয়ের কাজ করে, সেও নিজের মতো করে সাজে। কাজের ধরন দিয়ে এদেশে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। যে হাতে কলম ধরে, সেই হাতই প্রয়োজনে মপও ধরে। সে নিজ চোখে দেখেছে, বড় স্টোরের ম্যানেজারও কখনো কখনো মপ হাতে মেঝে পরিষ্কার করেন। তাতে তাঁর সম্মান কমে না; বরং দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায়। মেয়েটিও দৃঢ়চিত্তে সটান দাঁড়িয়ে তার কাজ করে যাচ্ছে। একের পর এক বোতল ঢুকিয়ে যাচ্ছে রিডেম্পশন মেশিনে। এটাও তো একধরনের ব্যবসা। এভাবে ভাবলেও তো হয়। কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিকের বোতল আর অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান তৈরি করে বাজারে ছাড়ে। বিভিন্ন কোম্পানি সেগুলো কিনে নিজেদের পণ্য ভরে বিক্রি করে। ক্রেতারা সেই পণ্য ব্যবহার করে বোতল, ক্যান ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। এখানেই এই উৎপাদন শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়েটি সেই বোতল, ক্যান কুড়িয়ে এনে রিডেম্পশন মেশিনে জমা দিয়ে আবার পূর্ণ নির্মাণের জন্য উপযোগী করে তোলে। এই উৎপাদন-প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রাখতে মেয়েটির ভূমিকাও অত্যন্ত মূল্যবান। কাজেই মেয়েটি বুঝি নিজের সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই সটান দাঁড়িয়ে কাজ করছে।
জেবাও তেমনি একই মনোভাব নিয়ে নিঃসংকোচে রসিদ নিয়ে কাউন্টারে যায়। কর্মচারী রসিদটি স্ক্যান করে নগদ ডলার জেবার হাতে তুলে দেয়। পাঁচ সেন্টের একটা টুকরো হিসাব জেবার মুখে একটা লক্ষমূল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে। আত্মতুষ্টির ছোট্ট প্রাপ্তি মুহূর্তটাকে উদ্ভাসিত করে, তাকে যেন এক নিমেষেই সচল করে তোলে। পাঁচ সেন্টের ছোট ছোট সুখগুলো এই মুহূর্তে তার ছোট ছোট প্রাপ্তি বুঝি।
পার্কে হাঁটার ছলে ডাস্টবিন থেকে খালি বোতল আর খালি অ্যালুমিনিয়ামের ক্যানগুলো কুড়িয়ে জমা করে প্রতিদিন জেবা। জমা করে শপিং কার্টে প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর। জমতে জমতে অনেকগুলো একসঙ্গে হলে তারপর নিয়ে যায় রিডেম্পশন মেশিনে।
আজ সারা দিন বোতল কুড়াতে কুড়াতে, পাঁচ সেন্টের হিসাব মেলাতে মেলাতে শেষে বয়সের হিসাবটাই ভুলে গিয়েছিল সে একরকম। সারা পার্ক চক্কর দিতে দিতে হঠাৎ মাথাটাই সামান্য ঘুরে যায়। চোখের সামনে এক মুহূর্তে ঝাপসা হয়ে ওঠে। সে দেরি না করে মুহূর্তেই শপিং কার্টের হ্যান্ডেল ধরে পার্কের একটা খালি বেঞ্চে সটান বসে পড়ে। সঙ্গে ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে বোতল বের করে ঢকঢক করে পানি খায়। বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকে। কষ্ট হয়।
এই মধ্যবয়সে এভাবে বোতল কুড়াতে কুড়াতে মাঝেমধ্যে শরীর ছেড়ে দেয়, কিন্তু নিজের ভেতর থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারে না সে। এই বোতল কুড়ানো তো তার সারা বছরের জন্য নয়।
জেবা কুইন্সের একটা স্পেশাল স্কুলের ক্যাফেটারিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট টিচার। বছরে যে কবার স্কুল বন্ধ থাকে, তখন বেতনও বন্ধ। অগত্যা উপার্জনের ঘাটতি মেটাতে তার প্রয়োজন হয় অন্য আয়ের, আর এই বোতল কুড়ানোর সহজ আয়ের পথ সে নিজেই তৈরি করেছে।
আমেরিকায় আয়ের কোনো কাজকে ছোট করে দেখার সংস্কৃতি নেই। আসলে এখানে মানুষ তার পরিশ্রম, দক্ষতা ও সততার মাধ্যমে যেকোনো কাজ করে নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও প্রয়োজন হলে রেস্টুরেন্টে খণ্ডকালীন কাজ করে, বাসন পরিষ্কার করে, বাথরুম মপ করে-তাতে এই সমাজে কেউ কানাঘুষা করে না। কারণ এখানে শ্রমের মর্যাদা আছে।
আমেরিকা অভিবাসীদের দেশ। বিশ্বের নানা প্রান্তÑলাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়া থেকে আসা কোটি কোটি মানুষ এই দেশের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে সুযোগের এক বিশাল ক্ষেত্র।
প্রথম দিকের ইউরোপীয় অভিবাসীরাই শিল্প, ব্যবসা ও নানা অর্থনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছিলেন। সেই স্বপ্নের আকর্ষণেই আজও বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ আমেরিকার পথে পা বাড়ায়। এখানে মানুষ নিজের প্রতিভা, শ্রম ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে চাকরি, ব্যবসা, শিল্প, সাহিত্যÑযেকোনো ক্ষেত্রেই নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে। যেকোনো কাজ দিয়েই প্রথমে জীবন শুরু করে, তারপর সুবিধামতো তা পরিবর্তন করে। এটা এদেশের সংস্কৃতি।
জেবাও তাদের একজন। কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড স্যান্ডার্স জীবনের ৬৫ বছর বয়সের পর তার ব্যবসাকে নতুনভাবে শুরু করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে অনেক প্রবীণ মানুষও নেতৃত্ব, সেবা ও সৃজনশীল কাজে সক্রিয় থাকেন। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্ব সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন, এখানে বার্ধক্য কোনো বাধা নয়।
জেবা বিশ্বাস করে, স্বপ্ন দেখার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও সাহস থাকলে জীবনের যেকোনো পর্যায় থেকে নতুন পথ শুরু করা সম্ভব। বয়স শুধু একটি সংখ্যা; মন যদি তরুণ থাকে, তাহলে মানুষ যেকোনো বয়সে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে।
আজকে বোতল কুড়াতে কুড়াতে হঠাৎ জেবার চোখ আটকে যায় পার্কের ওপাশের ছোট্ট দোকানটার দিকে। ভীষণভাবে চমকে ওঠে সে। সেখানে বসে আছেন পুলিশ ভাবি-সঙ্গে পুলিশ ভাইও। দুজনই ছোটখাটো কিছু জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে আছেন, অল্প কিছু কাস্টমারের আশায়।
জেবা তো জানত ওরা জ্যাকসন হাইটসে ব্যবসা করে। আজকে এই পার্কে! অনেকটা অবাক হয় সে। জেবা যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না। দিশাহীনভাবে ছুটে যায় দোকানের দিকে। নাহ্! ভুল দেখছে না সে। এ তো সেই পুলিশ ভাবিই! এত বছরের পরিচয়, পাশাপাশি অ্যাপার্টমেন্টে দীর্ঘদিন বসবাস-প্রতিদিনের দেখা, কথা, সুখ-দুঃখের কত স্মৃতি। তাকে চিনতে ভুল হওয়ার প্রশ্নই নেই। কিন্তু আজ এই জায়গায়, এই অবস্থায় তাকে দেখে জেবার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
ওদের দেখে প্রথমেই নাতি নাবিদের কথা মনে পড়ে। এক বছর জেবা নাতিকে দেখে না। সেই আঁতুড়ঘর থেকে নয় মাস বয়সী নাবিদকে জেবাই কোলে-পিঠে করে মানুষ করেছে। নাবিদের ফোকলা দাঁতের হাসি এই মুহূর্তে বুকের ভেতরটায় প্রচণ্ড তোলপাড় করে তোলে।
জেবা পাগলের মতো ছুটে যায় পুলিশ ভাবির কাছে। কাছে গিয়েই প্রথম যে কথাটি তার মুখ থেকে বের হয়,
-আমার নাতিটা কেমন আছে? আমার নাবিদ? দেখা হয় তাদের সঙ্গে?
পুলিশ ভাবি চমকে উঠে দাঁড়ায়।
-আপনি জেবা আপা না?
-হ্যাঁ, আমি জেবা। নাবিদের দাদি। আপনাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতাম।
-আহা! কত দিন পর দেখা! আপনি এখন কোথায় থাকেন, আপা? ছেলের বাসায় আসেন না? ছেলের সঙ্গে দেখা হয় না? কল করে না? চলেন কেমনে আপনি?
বাঙালিয়ানার যত রকম কৌতূহলী প্রশ্ন আছে, পুলিশ ভাবি যেন একসঙ্গে সব করে ফেলতে চান। জেবার জীবনটা যেন মুহূর্তের মধ্যে জেনে নিতে চান।
জেবা এবার নিজেকে সামলে নেয়।
-জি ভাবি, ভালো আছি। আমার নাবিদের সঙ্গে আপনাদের দেখা হয় না?
-হয়, হয়! তবে খুব কম। নাবিদের মা তো কারও সঙ্গে মেশে না। আসা-যাওয়ার পথে দেখা হয় হঠাৎ।
-শরীফা ভাবি কেমন আছে?
-আছে আগের মতোই রং-তামাশা নিয়ে। সুখী মানুষ।
বলেই পুলিশ ভাবির পান-খাওয়া দাঁতের ফাঁকে একধরনের বিদ্রƒপাত্মক হাসি ফুটে ওঠে।
জেবা এবার জিজ্ঞেস করে,
-এখনো আপনারা বুড়ো-বুড়ি ব্যবসা-বাণিজ্য করেন?
-কপালে আনছি, আপা। ওনারে কত বলি, চলেন শেষ জীবনটায় দেশে ফিরে যাই। কিন্তু উনি মাইয়া ছাড়া থাকতে পারেন না। আমাগোর তো বাংলাদেশে দেখার কেউ নাই। তাই এভাবেই কাটাই দিই। ওনারও তো বয়স হইছে। একলা আর ছাড়ি না। আমেরিকায় নিয়ম আছে, তাই বাইরে ওনার সাথে থাকিÑএই আরকি।
জেবা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় ওদের সঙ্গে। ঘরে ফিরে এসে স্মৃতির দহন ভেতরটা তোলপাড় করে চলে।
জেবার স্বামী মারা গেছে, তার সন্তান সোহাগের যখন দশ বছর বয়স। বাংলাদেশে সে একটা প্রাইমারি স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস হিসেবে দুই দশক পার করে শেষে ছেলের সংসারে গ্রিন কার্ড নিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করে। শেষে সিটিজেনশিপও পেয়ে যায়। কিন্তু পাঁচটি বছর ছেলের সংসারে তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে এই প্রবাসজীবনেও একা, আলাদা থাকতে বাধ্য করে।
আসলে সে নিজেই এই মধ্যবয়সে একা, স্বাধীন জীবন-যাপন বেছে নিয়েছে। এখন তার নিজের জীবন, নিজের সময়, নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ এখনো তার নিজের হাতেই আছে। এই সামান্য অনুভূতিটুকুই তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি তোলে।
এখানে হঠাৎ কেউ এসে ধমকের সুরে বলবে না, ‘মা, এখনো বসে আছেন? রান্নাঘরের কাজগুলো সন্ধ্যার আগেই শেষ করে ফেলুন। রাতে চুলা ধরালে ঘর গরম হয়ে যায়। আপনার ছেলে এসে আবার চিৎকার করবে। আমি কাজে যাচ্ছি, ফিরতে মধ্যরাত হবে।’
কত দিন এই কথাগুলো শুনতে শুনতে নিজের ইচ্ছেগুলোকে চাপা দিয়েছিল জেবা। সংসারের দায়িত্বের নামে, সম্পর্কের বন্ধনের নামে সে নিজের অস্তিত্বটুকু যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল। আজ ছেলের সংসারের অদৃশ্য শাসনের শিকল থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছে সে।
অভাব আছে, কষ্ট আছে, জীবনের কঠিন বাস্তবতা আছে-তবু নিজের মতো করে বাঁচার যে স্বাদ, সেই স্বাদই তার কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিশেষ করে, কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে সে চিরটাকাল নারাজ। এখন তার পরিশ্রমের ধকল থাকলেও কোনো রূপ অন্যায়ের দহন তাকে পোড়ায় না।
সে স্কুলে চাকরি করে, আবার বিভিন্ন জায়গা থেকে বোতল কুড়িয়ে জমা করে। সেখান থেকেও সামান্য আয় দিয়ে তার কেটে যায় জীবন।
বাসা ভাড়া-শেয়ারের একটা রুম। দুটি বিছানা, একজন কর্মজীবী নারীর সঙ্গে। স্কুলের আয় আর পাঁচ সেন্টের কয়েন হয়তো খুব সামান্য, কিন্তু সেই সামান্য হিসাবের ভেতরেই আজ জেবা খুঁজে পেয়েছে এক অমূল্য সুখ-নিজের জীবনের ওপর নিজের অধিকার।
পঞ্চাশোর্ধ্ব জীবনে আমেরিকায় পা রেখেছিল জেবাÑছেলের সংসারে নতুন আশ্রয়ের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু এলমহার্স্টের এক বহুতল ভবনের ছয়তলার ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টেই যেন কেটে গেল তার জীবনের দীর্ঘ কারাবাস।
দেখতে দেখতে টানা পাঁচটি বছর পার হয়ে গেছে। জানালার ওপাশে ছিল বিশাল এক পৃথিবী, অথচ তার নিজের পৃথিবী সীমাবদ্ধ ছিল কয়েকটি ঘর, চারটি দেয়াল আর একরাশ নীরবতার মধ্যে। বাইরে একা যাওয়ার অনুমতি ছিল না তার। ছেলের বউয়ের ছিল কড়া নজর।
একদিন জেবা শুনেছিল, ছেলের বউ ফিসফিস করে ছেলে সোহাগকে বলছে, ‘মাকে একা একা পার্কে যেতে দেওয়ার কী দরকার? দেখো না, কত রকমের বাঙালি মহিলা সেখানে বসে থাকে। কে কখন কী বুদ্ধি দেবে, বলা যায়? যদি কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে? কিংবা কোনো খালি বাসা দেখে কাউকে নিয়ে আসে? আমরা তো সারা দিন কাজে থাকি। তখন মা কি একা সব সামলাতে পারবে?’
সেই কথাগুলো শুনে জেবা আর কোনো দিন বাইরে যাওয়ার কথা মুখে আনেনি। নিজের ইচ্ছেগুলো একে একে গুছিয়ে রেখেছিল বুকের গভীরে। কিন্তু জেবা নিজেকে যতই গুটিয়ে রাখতে চায়, ততই যেন বাইরের পৃথিবী তার দরজায় এসে কড়া নাড়ে। ডি-ফাইভের পুলিশ ভাবি, যার স্বামী ছিলেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর, মেয়ের সংসারে গ্রিন কার্ড হোল্ডার হয়ে আমেরিকায় এসেছেন। তিনি মাঝেমধ্যেই হঠাৎ এসে দরজার কলিং বেল বাজান। জেবা কখনো কখনো চমকে ওঠে। মনে হয়, নিজের ছোট্ট ঘরের ভেতরটুকুও কি তবে আর তার নিজের নেই? তবু দরজা খুলে হাসিমুখে দাঁড়াতে হয়।
পুলিশ ভাবি বিষণ্ন মন নিয়ে নিজের ভেতরটা উগরে দেয় জেবার কাছে, একরকম আর্তচিৎকার যেন, ‘এই যে বুড়ো মানুষটাকে কয়েকটা টুপি-লুঙ্গি দিয়ে জ্যাকসন হাইটসে পসরা দিয়ে বসিয়ে দিল ডলার কামানোর জন্য, মাইয়ার মনে কি কোনো দরদ নাই?’
হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুলিশ ভাবি।
জেবা আর কী সান্ত্বনা দেবে! নিজের জীবনও তো শৃঙ্খলিত কারাগারে। মা কাঁদছে আমেরিকার যাপিত জীবনের কঠিন চক্রে নিজের ঔরসজাত সন্তানের প্রদত্ত অবদমনের কষ্টে। যেভাবে একদিন প্রসব-যন্ত্রণায় ছটফট করেছিলেন। এ বুঝি অশ্রু নয়, নিজের গণ্ড বেয়ে ঝরছে নিজেরই জঠরের দূষিত রক্ত। জেবা কী সান্ত্বনা দেবে? কোন ভাষায় সান্ত্বনা দেবে তাকে?
পুলিশ ভাবি আবারও বলে, ‘আমাদের দুজনকে দিয়ে হোমকেয়ারের পয়সা পায়, সেই টাকা জমিয়ে নিজের পোলাপানের জন্য বাড়ি কিনে। আমরা যে তার বাবা-মা, সেটা মনেও রাখে না। বাংলাদেশে ফেরত যাবার চাই, তাও দেয় না, আটকে রাখে। আমাদের তো এই মাইয়া ছাড়া আর কোনো পোলাপানও নাই। বাংলাদেশে কে দেখবে আমাদের?’
পুলিশ ভাবি অনবরত কেঁদেই চলে এভাবে। তবে এই বিল্ডিংয়ের রাজকপালী বি-ফাইভের শিল্পী ভাবী। তিনজনে একসঙ্গে বসলেই গলা ছেড়ে গান বাঁধে শিল্পী ভাবি শরীফা বেগম :
নিশিরাত বাঁকা চাঁদ-
তাঁর মনে তো কোনো বিষাদ নেই। কপালগুণে পেয়েছে ছেলের বউ। সারা দিন কাজে থাকে ছেলে আর ছেলের বউ, আর শাশুড়িকে গা-ভর্তি গয়নায় সাজিয়ে পাঠিয়ে দেয় বাঙালি প্রতিবেশীর ঘরে। যেন মাকে নয়, বাঙালি কমিউনিটিতে নিজের আভিজাত্যকে জানান দিতে তাদের এক অভিনব কৌশল।
শরীফা বেগম একেক দিন একেক রঙের ড্রেস পরে, গায়ে গয়না জড়িয়ে যখন-তখন কলিং বেল টিপে এই অ্যাপার্টমেন্টসের বাঙালি ঘরে।
একদিন তিন পরিবারের এই তিন বৃদ্ধা একত্রিত হয় জেবার ঘরে। শরীফা বেগম উপযাচক হয়ে সুখের গল্প টানে মৃদু টানা স্বরে, ‘এই যে দেখেন, গতকাল আবার এই সোনার বালা নিয়া আসিছে। পোলা বলে, “মা, সারা জীবন কষ্ট করিছেন, আমায় মানুষ করিছেন, আমেরিকা পাঠিয়েছেন, এখন ভোগ করেন।” দেহেন-দিকিনি! কপালে বউ ভালো পড়ছে, বুঝছেন।’ বলতে বলতে বালা-সমেত হাত দুটো বাড়িয়ে ধরেন সামনে।
-আহা! আহা! ভালো কথা শুনেও পরান জুড়িয়ে যায়।
পুলিশ ভাবি চোখ মুছতে মুছতে সমর্থন জানায় শরীফা বেগমের উচ্ছ্বাসকে।
একদিন এমনই এক ভরদুপুরে জেবার অ্যাপার্টমেন্টে জোরসে আড্ডা চলছিল। শরীফা ভাবি গানে সুর তোলে। জেবা আর পুলিশ ভাবি মন দিয়ে শোনে। ঠিক তখনই জেবার ছেলের বউ সোহানা যমদূতের মতো যেন এসে আচমকা হাজির। সোহানার চোখের ভাষা দেখে মুহূর্তে গান থেমে যায়। সুর বন্ধ হয়ে যায়। একে একে সবাই নীরবে বিদায় নেয়।
গান থেমে যায়। সুর থেমে যায়। তিন বৃদ্ধা মিলে একটুখানি স্বস্তির উচ্ছ্বাসও নিমেষেই থেমে যায়, কিন্তু থামে না জেবার পুত্রবধূ সোহানা। সে ফণা তোলা সাপের মতো শাশুড়ির মুখোমুখি দাঁড়ায়। অন্তরের ঝাঁজ বুঝি তার গলা দিয়ে তীব্র গতিতে বের হয়, ‘কম বয়সে স্বামী মারা গেছে, সারা জীবন যা করেছেন, করেন। এখন বয়স হয়েছে, একটু থামেন। আপনাকে না বারণ করেছি আমার বাসায় কাউকে না ঢোকাতে, কেন করেছেন?’
এরপর ঝড়ের গতিতে বেডরুমে ঢুকে ছেলে নাবিদের ঘুমন্ত শরীরটাকে এক হেঁচকা টানে কাছে নিয়ে অকারণে ডায়াপার চেক করতে করতে সোহানার গলার ঝাঁজ এবার চরমে ওঠে, আরও বিস্ফোরণ ঘটায়, ‘মা, নাবিদের ডায়াপার চেঞ্জ করেননি। ওর তো গুটা হয়ে যাবে। এত বেখেয়ালি কেন আপনি?’
জেবার ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যায়। সেদিনই মনে মনে স্থির সিদ্ধান্ত নেয়Ñএই অভিশপ্ত পুরীতে আর নয়। একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমিস্ট্রেস হয়ে সে এতগুলো বছর বুক টান করে মাথা উঁচিয়ে চলেছে। কেন নিজের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকবে? যে নারী দীর্ঘ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে বুক টান করে, নিজের যোগ্যতা ও সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটিয়েছে, সে কি আজ ছেলের সংসারে একজন অবাঞ্ছিত মানুষের মতো দিন পার করবে? শেষ বয়সে এসে নিজের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে বেঁচে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব।
জেবা ছেলে সোহাগের মুখোমুখি দাঁড়ায়, ‘আমি এখানে থাকতে চাই না, আমাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা কর।’
-মা, পাগলামি করো না।
ধমকে ওঠে সোহাগ।
তারপর নিবু নিবু গলায় স্পষ্ট উচ্চারণ করে, ‘সোহানার জন্যই তোমার-আমার আমেরিকা আসার সৌভাগ্য হয়েছে। কথাটা ভুলে যেয়ো না। তুমি সোহানার কথাটা একটু মেনে চললেই পারো।’
জেবার ভেতরটা ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যায়। ভাষা পায় না উত্তর দেওয়ার।
এরপর একদিন হঠাৎ করেই সোহানার আচরণে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। কণ্ঠে আগের সেই কঠোরতা নেই, বরং একধরনের মোলায়েম সুর।
‘মা, আজ সিটি থেকে একজন নার্স আসবে আপনাকে দেখতে।’
জেবা অবাক হয়ে তাকাল।
‘নার্স আসবে কেন আমাকে দেখতে? আমার কী হয়েছে? আমি তো ভালো আছি!’
সোহানা একটু থেমে বলল, ‘আসলে মা, এই যে, আমরা দুজনে চাকরি করে কুলিয়ে উঠতে পারছি না। আপনারও তো একটা বিশাল খরচ আছে। খাওয়া-পরা, ওষুধ-চিকিৎসা। এইগুলা তো আপনি করতে পারছেন না। তাই আপনার জন্য একটা হোমকেয়ারের ব্যবস্থা করছি। ইদানীং সবাই করছে। আমি নিজেই আপনার কেয়ারগিভার হব। ঘণ্টায় বাইশ ডলার করে মাসে প্রায় চার হাজার ডলার পাওয়া যাবে। আর আমি তো কেসে চাকরি করিÑবাইরের কাজেও কোনো অসুবিধা হবে না।’
জেবা বাকহীন, অপলকে তাকিয়ে থাকে কয়েকটা মুহূর্ত সোহাগ আর সোহানার মুখের দিকে। দুজনেই জেবার বিছানার পাশে আয়েশি ভঙ্গিতে বসা এবং অদ্ভুত এক কোমলতা তাদের কণ্ঠেও। সোহানা বলতে থাকে, ‘সিটি থেকে নার্স যখন আসবে, তখন একটু এমনভাবে থাকবেন যেন আপনি একদম দুর্বল। যেন বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। বলবেন হাতে ব্যথা, পায়ে ব্যথা, দাঁড়াতে পারেন না।’
জেবা কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের শান্ত ভাব বদলে গেল।
‘ছি, বউমা! ছি!’
এই একটি শব্দের মধ্যেই যেন জমে থাকা বছরের পর বছর অপমানের প্রতিধ্বনি পুরোটাই প্রকাশ করে দিল।
জেবা সেই নারী, যে জীবনে কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়নি। শিক্ষকতার দীর্ঘ জীবনে সমাজে বুক টান করে মাথা উঁচিয়ে বেঁচে থেকেছে। আজ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে বেঁচে থাকাটাই আগুনের মতো জ্বলে উঠল জেবা।
‘সোহাগ, তোকে আমার সন্তান ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। মানুষ যখন লোভের কাছে বিবেক হারায়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, একটি সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তোর যখন দশ বছর বয়স, তখন তোর বাবা মারা গেছেন। তোর খাওয়া-পরা আমি একাই সামলিয়েছি। আমার খাওয়া-পরার জন্য তোকে আর ভাবতে হবে না। অন্যায় করে, চুরি করে বেঁচে থাকাটাকে আমি ঘৃণার চোখে দেখি। এখনো আমার পা শক্ত আছে। আমি আমার জীবন চালিয়ে নিতে পারব।’
জেবা থামল না। বলতেই থাকে, ‘যে দেশে মানুষ অন্যায়কে স্বাভাবিক করে নেয়, সেখানে প্রচণ্ডভাবে দুর্নীতি জন্ম নেয়, আর সেই দুর্নীতির বিষ একদিন ঘর থেকে শুরু হয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু রাষ্ট্রপ্রধানের দোষ দিয়ে পার পাওয়া যায় না রে বেটা। একটু চিন্তা করে দেখ তো, বাংলাদেশে ছিয়াত্তর বছর বয়সী নারী রাষ্ট্রপ্রধানের অন্তর্বাস উঠিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে দুর্নীতি উন্মোচনের যে প্রক্রিয়া, তা কিন্তু সৃষ্টি হয়েছে ক্ষুদ্র ঘর থেকেই। এক দুর্নীতি ঠেকাতে আরেক দুর্নীতি এসে সমাজটাকে গ্রাস করে। দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করতে গিয়ে চব্বিশের গণ-আন্দোলনে হাজার মায়ের বুক খালি হয়েছে।’
জেবা দৃঢ় কণ্ঠে বলতেই থাকে, ‘আমেরিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন নীতির পেছনেও তোদের মতো মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুর্নীতির ভূমিকা আছে। মেডিকেইড আত্মসাৎ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ-এসবকে তোরা তুচ্ছ ভাবিস। কিন্তু আগুনের একটি ছোট্ট ফুলকিও একসময় দাবানলে পরিণত হয়ে বনভূমি ছারখার করে দেয়। তেমনি ছোট অন্যায় জমতে জমতে একদিন পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপরই তার ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। তাই এখনো সময় আছেÑসাবধান হও।’
কথাগুলো বলেই জেবা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধীর পায়ে ঘরে গিয়ে বিছানার পাশ থেকে স্যুটকেস টেনে, ওয়ার্ডরোব থেকে কিছু কাপড়চোপড় ও ছোট কিছু জিনিস নিয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার কণ্ঠের দৃঢ়তা আর কথার প্রতিধ্বনি যেন ঘরের ভেতরে এক বজ্রপাত ঘটিয়ে সবকিছু ঝলসে দিল। সোহাগ আর সোহানা দুজনেই থ।
জেবার চোখে তখন অশ্রু নয়, ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
‘আমি তোমাদের ঘরে মায়ের পরিচয়ে এসেছিলাম, কোনো পণ্য হয়ে নয়। আমার বয়স হয়েছে, কিন্তু আমার আত্মসম্মান এখনো বেঁচে আছে। আমাকে দিয়ে কোনো মিথ্যা প্রমাণ করিয়ে সুবিধা নেওয়া যাবে না।’
সোহাগ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু জেবা হাত তুলে থামিয়ে দিল।
‘আমি আর এইভাবে থাকব না। আমি কারও বোঝা নই। আমি নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেব। এই দেশে মানুষ একা থেকেও বাঁচে, নিজের অধিকার নিয়ে বাঁচে।’
পেছন থেকে সোহাগের বিনীত কণ্ঠের আহাজারিও উপেক্ষা করল অনায়াসে, ‘মা, তুমি চলে গেলে আমাদের বাচ্চাটাকে কে দেখবে? সোহানা চাকরিটা করবে কেমনে?’
-বাচ্চার বয়স মাত্র দেড় বছর। সোহানার উচিত আড়াই বছর পর্যন্ত বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো, কাছে থাকা। তোমরা খরচ কমাও। দুই বেডরুমের বাসা ছেড়ে এক বেডরুমের বাসা নাও।
শেষে বলে ওঠে, ‘তোমাদের চিন্তা তোমরা করো। আমার চিন্তা আমি করি। আমাকে ছুটি দাও তোমরা।’
এবার সোহানাও বেফাঁস একটা কথায় বুঝি ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিল। সোহানা পেছন থেকে দাঁত চিবিয়ে উচ্চারণ করল, ‘মা, একবার যদি এই ঘর ছেড়ে বের হয়ে যান, তাহলে জীবনেও এই ঘরে আর ঢুকতে পারবেন না। যদি কখনো ফিরে আসেন, তবে হয় আপনি থাকবেন, নয়তো আমি থাকব।’
তারপর সোহাগের দিকে মুখ ফিরিয়ে জানান দিল শক্ত কণ্ঠে, ‘আমার কথাটা সত্যি হলো এবার। বারবার বলছিলাম, বাঙালির সঙ্গে মিশতে দিয়ো না, দিয়ো না। হলো এবার। দেখলে, কেমন বুদ্ধি দিয়ে ঘর থেকে বের করে নিল?’
জেবা কানে তোলেনি কোনো কথা। যে ঘরটাকে এত দিন নিজের আশ্রয় ভেবেছিল, সেদিন সেই ঘরই তার কাছে হয়ে উঠেছিল অদৃশ্য এক কারাগার। সেই কারাগারে বন্দি জীবন-যাপন করা যায়, কিন্তু অন্যায়-অসত্য জীবনের কাছে আত্মসমর্পণ করে বেঁচে থাকাটা জেবার কাছে মৃত্যুসম।
তাই দৃঢ়চিত্তে সে মুক্তির পথে পা রাখল একটি শুদ্ধ ও স্বচ্ছ জীবনের প্রত্যাশায়।