আমেরিকার সাবওয়ে বা ট্রেন ভ্রমণ সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে, নিউইয়র্কের সাবওয়ে নেটওয়ার্ক এই শহরের প্রাণসঞ্চার ধমনি। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে এই পরিবহন-ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। বিভিন্ন রুটে ট্রেন শহরের এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর ম্যানহাটন হলো সেই বিশাল যোগাযোগ-ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র, যেখান থেকে নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন এলাকায় সহজে যাতায়াত করা যায়। এ ছাড়া লং আইল্যান্ড রেল রোড (এলআইআরআর), মেট্রো-নর্থ ও অ্যামট্রাকের মাধ্যমে আশপাশের শহর ও অঙ্গরাজ্যেও ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। পুরো ব্যবস্থাটি খুবই দ্রুত, সুশৃঙ্খল এবং সময়নিষ্ঠ। ট্রেন জার্নি সত্যি অসাধারণ।
আমি লং আইল্যান্ডে বসবাস করি। আমাদের এলাকায় সরাসরি কোনো সাবওয়ে নেই। তাই বাস, লিফট কিংবা উবারে করে নিকটবর্তী সাবওয়ে স্টেশনে যেতে হয়। তবে বাস যোগাযোগ-ব্যবস্থা বেশ উন্নত এবং সহজলভ্য। একদিন পরিবার নিয়ে কনি আইল্যান্ড যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। কারণ অনেক দিন ধরেই আমার ছেলে কনি আইল্যান্ড যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছিল। তাই এক ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কীভাবে যেতে চাও?’
সে হাসিমুখে বলল, ‘বাস আর ট্রেন।’
আমি মজা করে বললাম, ‘উবারে যাবে না?’
সে মাথা নেড়ে বলল, ‘না, বাস আর ট্রেন জার্নি আমার খুব ভালো লাগে।’
তার উত্তর শুনে আমারও ভালো লাগল। কারণ ভ্রমণের আসল আনন্দ তো পথচলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
নির্ধারিত দিনে আমরা তিনজন সকালে রওনা হলাম। বাসার পাশ থেকেই কিউ-৪৬ বাস ছাড়ে। সকাল সকাল বাসা থেকে বের হলাম, কারণ কনি আইল্যান্ড অনেক দূরে। বাসে বসে জানালার বাইরে মৃদু রোদ, ব্যস্ত শহরের জেগে ওঠা, রাস্তার গাড়ির সারি, দুই পাশের সারি সারি সবুজ গাছপালা আর মানুষের চলাচল দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।
বাসে করে কিউ গার্ডেন নেমে সাবওয়ে স্টেশনে প্রবেশ করলাম। এরপর আমরা এফ ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনের ভেতর যেন নিউইয়র্ক শহরের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। কেউ কাজে যাচ্ছে, কেউ বই পড়ছে, কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, আবার কেউ কেউ চুপচাপ বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে নিজের জগতে ডুবে আছে।
কয়েকটি স্টেশন অতিক্রম করার পর দুজন যুবক আমাদের বগিতে প্রবেশ করল। তারা গান বাজিয়ে চমৎকার নাচ ও কসরত করতে শুরু করল। যাত্রীরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী বকশিশ দিল। আমার ছেলে মুগ্ধ হয়ে তাদের পরিবেশনা দেখল এবং সেও কিছু টাকা বকশিশ দিল। নিউইয়র্কের ট্রেনে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। এখানে যেন পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি ও মানুষের এক জীবন্ত মিলনমেলা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে।
আস্তে আস্তে আমরা বিভিন্ন স্টেশন অতিক্রম করে কনি আইল্যান্ডের দিকে অগ্রসর হতে থাকলাম। নিউইয়র্ক সাবওয়ে-ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘আপটাউন’ ও ‘ডাউনটাউন’ সঠিকভাবে বোঝা। দিকনির্দেশনা সম্পর্কে সচেতন না হলে সহজেই ভুল ট্রেনে উঠে বিপরীত দিকে চলে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। প্রথম দিকে বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হলেও কয়েক দিন ব্যবহারের মধ্যেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়।
দীর্ঘ যাত্রার পর অবশেষে আমরা কনি আইল্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। স্টেশন থেকে বের হয়েই প্রাণবন্ত পরিবেশ চোখে পড়ল। দূরে সমুদ্রের গর্জন, মানুষের কোলাহল আর আনন্দময় আবহ পুরো এলাকাকে উৎসবমুখর করে তুলেছিল। কনি আইল্যান্ডে রয়েছে লুনা পার্ক, নিউইয়র্ক অ্যাকুরিয়াম, বিস্তৃত সমুদ্রসৈকতসহ নানা আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান। সমুদ্রের ঢেউ, ঠান্ডা বাতাস আর মানুষের আনন্দময় উপস্থিতি পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিল।
আমরা প্রথমে অ্যাকুরিয়ামে গেলাম। সেখানে নানা রঙের মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী এবং তাদের বিচিত্র জীবনযাপন দেখে ছেলেটি ভীষণ আনন্দ পেল। অ্যাকুরিয়াম থেকে বের হয়ে জানতে পারলাম, মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই ‘সি লায়ন শো’ শুরু হবে। তাই দ্রুত সেখানে গিয়ে আসন গ্রহণ করলাম। সি লায়নগুলোর বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল, প্রশিক্ষকদের সঙ্গে তাদের সমন্বয় এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস পুরো পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিল। সত্যি এটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, যা আগে কখনো দেখিনি। এরপর সমুদ্রসৈকতের দিকে এগিয়ে গেলাম। আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউ একের পর এক তীরে এসে আছড়ে পড়ছিল। শীতল সমুদ্রবাতাস মুখে এসে লাগছিল। কেউ সাঁতার কাটছে, কেউ বালুর ওপর খেলছে, কেউবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে। আমরাও কিছু সময় সমুদ্রে নেমে আনন্দ করলাম।
সবশেষে আমরা লুনা পার্কে গেলাম। সেখানে ছিল নানা ধরনের রাইড ও বিনোদন-ব্যবস্থা। আমরা কয়েকটি রাইডে চড়লাম। পুরো পরিবেশ ছিল খুবই পরিচ্ছন্ন, নিয়মতান্ত্রিক ও সুশৃঙ্খল। দীর্ঘ সারিতেও সবাই ধৈর্যের সঙ্গে নিজের পালার অপেক্ষা করছিল।
এলাকার বিভিন্ন খাবারের দোকানেও ছিল মানুষের ভিড়। পছন্দমতো খাবার কিনে খেলাম, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। সারা দিন ঘোরাঘুরি, আনন্দ আর নতুন অভিজ্ঞতায় সময় কখন যে কেটে গেল, টেরই পেলাম না। সুন্দর মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য অনেক ছবিও তুললাম। সন্ধ্যার দিকে সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করলাম। ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশ লালচে আভায় রঙিন হয়ে উঠছিল। সাগরের ঢেউ, মৃদু বাতাস, অস্তগামী সূর্যের রঙিন আলো মিলে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছিল। সব মিলিয়ে ভ্রমণকে এক অনন্য পূর্ণতা এনে দিল।
এরপর ফেরার পালা। আগেই মোবাইলে ট্রেনের সময়সূচি দেখে রেখেছিলাম। নির্ধারিত সময়ে ট্রেনে উঠে ম্যানহাটন হয়ে আবার ট্রেন পরিবর্তন করে কিউ গার্ডেন পৌঁছালাম। সেখান থেকে বাসে করে বাসায় ফিরে এলাম।
দূরের ভ্রমণ হলেও পুরো যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত আনন্দময়, শিক্ষণীয় এবং স্মরণীয়। পরিবার নিয়ে কাটানো এমন মুহূর্তগুলো জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকে। শত ব্যস্ততার মাঝেও এই স্মৃতিগুলো হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়। সুযোগ পেলে আবার কোনো এক গ্রীষ্মে কনি আইল্যান্ড যাব। এখানে সব বয়সের মানুষের জন্য রয়েছে আনন্দ, বিনোদন এবং স্মৃতি গড়ার অফুরন্ত সুযোগ। আপনারাও সময় পেলে একদিন ঘুরে আসতে পারেন। হয়তো আপনাদের মনেও অমলিন স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে কনি আইল্যান্ডের সেই নোনাজল, কোমল বাতাস, ঢেউয়ের সুরেলা শব্দ, লুনা পার্কের উচ্ছ্বাস আর নিউইয়র্ক অ্যাকুরিয়ামের বিস্ময়।
লেখক : কবি ও সাবেক ব্যাংকার।