ভদ্রমহিলা যখন কাউন্টারে মালামাল রাখছিল, সফিক লাইনের পরবর্তী কাস্টমার। তার মূল্য পরিশোধের পরই সফিক দ্রব্যাদির দাম দিয়ে বাসামুখী রওনা দেবে। ভদ্রমহিলার বাজারের ট্রলিটি বেশ বড়সড়। সেটার ভেতরের অংশ আবার বিরাট কালো চল্লিশ পাউন্ডের গারবেজ ব্যাগ দিয়ে মুড়ে রেখেছেন। সম্ভবত সব মালামাল ঢোকানোর পরে মুখটা বেঁধে দিয়ে জিনিসপত্র রোদ-বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করবেন। সফিক তার অন্তহীন দ্রব্যাদি কাউন্টারে রাখা দেখে বেশ বিরক্ত হচ্ছিল। ক্যাশিয়ারের একটি একটি করে স্ক্যান করতে একটু বেশি সময় তো লাগবেই, তাতে ওর অপেক্ষার সময় বেড়ে যাবে। ধৈর্য তো ধরাই লাগবে। আগের কাস্টমার আগে সার্ভ করাই নিয়ম। মাঝখান দিয়ে অন্য কাউকে পে করতে দিলে ক্যাশ রেজিস্ট্রারে প্যাঁচাল লাগবে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার মালামালগুলো দেখায় সেগুলোর বিবরণ দিতে পারে সফিক। উনিশ ডলার পাউন্ডের বিরাট ইলিশ মাছ, যার একটির দাম একশ বিশ ডলারের মতো। বাংলাদেশি টাকায় বারো হাজার টাকা। দশ পাউন্ডের মৃগেল মাছটি ষাট ডলার। গরুর মাংস দশ পাউন্ডের মতো। সত্তর ডলার। বড় মুরগি ছয়টা। একশ তিরিশ পাউন্ড। চিকেন লেগ কে জানে কত পাউন্ড। খাসির কিমা পনেরো ডলার পাউন্ড। প্রক্রিয়াজাত পরোটা পঁচিশ পিসের তিনটা। তিন-চার পদের তরকারি। এদেশে তরকারির দাম কখনো মাছ-মাংসের চেয়ে বেশি। আজ একটি মাঝারি সাইজের ফুলকপি সাত ডলার। যুদ্ধের অজুহাতে সব জিনিসের দাম ডাবল। বাংলাদেশের মানুষ, মিষ্টান্ন দ্রব্য তো থাকবেই। দু-তিন পদের মিষ্টি। এখানে বগুড়ার দইও পাওয়া যায়। সেটাও নেওয়া হযেছে। শ্বশুর-শাশুড়িকে এখানে আনতে দেন না খরচ বাড়বে অজুহাতে কিন্তু তার বয়স্ক মা-বাবার জন্য যত দামই হোক পান-সুপারি কিনতে ভোলেন না। হঠাৎ ভদ্রমহিলা সরাসরি পেছনে ফিরে সফিকের মুখোমুখি হতেই সে ভদ্রমহিলাকে চিনতে পারল। ওর ওয়াইফের সঙ্গে পার্কে দেখা হয়। ভালো ওয়েদারের দিন পড়লে সবাই আশপাশের পার্কে যায়। সেখানে মাঝেমধ্যে দুজনের দীর্ঘ আলাপ হয়। তাতে একজন আরেকজনের কাছ থেকে যত পারে ইনফরমেশন নেওয়ার চেষ্টা করে। ছাড় দেওয়াদেওয়ি নেই। যত জানা যায় তত এখানে ওখানে সাপ্লাই দেওয়ার মতো তথ্য থাকবে। ওর ওয়াইফকেও তথ্য দিতে হয় উৎসাহিত করার জন্য। ভদ্রমহিলার দুই ছেলে, এক মেয়ে। স্বামীর মা-বাবাকে ঝামেলা হবে বলে আনতে দেননি। দেশে থাকতে অনেক জ্বালিয়েছে। আত্মীয়স্বজন এলে চা-নাশতা দিতে দিতে ওর জান বের হয়ে যেত। সেই ক্ষোভ ওর সারা জীবন থাকবে মনে হচ্ছে।
কথায় কথায় সফিকের বউকে আরও জানিয়েছিল, ছেলে দুটো ও মেয়ের ওজন বাড়া নিয়ে পিডিয়াট্রিশিয়ানের ধাতানি আর ভালো লাগে না তার। ছেলে-মেয়েরা ভালো-মন্দ মায়ের হাতেই খাবে। পরে বড় হলে কী খাবে না খাবে তার ঠিক আছে! ওজন বেশি হওয়ায় কোনো খেলাধুলাতেই ভালো করতে পারে না। শারীরিক কসরতের ও আত্মরক্ষার দক্ষতার জন্য টায়েকুন্ডু ক্লাসে দিয়েছিল কিন্তু জাম্প দিয়ে কিক করার আগেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ওয়ার্মআপে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে এমন দ্রুত শ্বাস ফেলে, ইনস্ট্রাক্টর অ্যাম্বুলেন্স কল করতে চায়। শেষমেশ ওখান থেকে বের করে নিয়ে আসতে হলো।
ভদ্রমহিলা সারা দিন নানা পদের রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। একই সঙ্গে নিজের মা-বাবার সঙ্গে ছোটবেলার গল্প করেন। ভাইবোনদের বিরুদ্ধেও মাঝে মাঝে খুনসুটি করেন। দেশে সবার ভালো অবস্থা থাকা সত্ত্বেও তার কাছে ডলার চেয়ে উত্ত্যক্ত করে তারা। কীভাবে জেনে গেছে ভদ্রমহিলা মা-বাবার হোমকেয়ার খান। মাকে নিজে টেক কেয়ার করেন, বাবার জন্য আরেকজনকে নিয়েছেন। বাবার জন্য নেওয়া মহিলাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বেতনের অর্ধেক কেড়ে নেন। তার কথামতো ওই ডলার না দিলে টারমিনেট করার ভয় দেখান। দেশের ভাইবোনদের এসব অপকর্মে আসা ডলারের ভাগ দিতে হয়। মা-বাবা দুজনই শক্ত সামর্থ্য কিন্তু একশ এক অসুখ দেখিয়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন।
তার স্বামী বেচারা সবুজ ট্যাক্সি চালান। দুই বেলা বাসায় এসে খাওয়াদাওয়া করেন। সুবোধ জামাইয়ের মতো শ্বশুর-শাশুড়ির খোঁজখবর নেন। বউ প্রায়ই এদের জন্য নানা ডাক্তার থেরাপি লাগিয়ে রাখে। ড্রপ ও পিকআপ করার গুরুদায়িত্ব নেন। এতে নিজের আয় কমে গেলেও স্ত্রীর মন রক্ষা হয়। খেতে বসলে বউয়ের রাঁধা পাঁচ-ছয় পদের তরকারি চেটেপুটে খান। সারাক্ষণ বউ ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও ওর রান্নার হেভি ভক্ত তিনি। ডাক্তার কোলেস্টেরল ডায়াবেটিসের হুমকি দিয়ে রেখেছে, তাতে তার কিছু যায় আসে না। আর্টারি বন্ধ হয়ে গেলে কত লোককে রিং পরে দিব্যি বেঁচে থাকতে দেখেছেন তিনি। এদেশে অ্যাম্বুলেন্স তাড়াতাড়ি চলে আসে। এরপর রিং পরে হাসপাতাল থেকে বীরদর্পে বেরিয়ে এসেছে এ রকম কত লোককে ভাড়ার বিনিময়ে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। এই অতিরিক্ত ভোজনে তার আসল ক্ষতি রাতের বেলা বউ যখন কাছে আসে। এদেশে রাস্তাঘাটে, বিশেষ করে সামার টাইমে জড়াজড়ি দেখে অনেক সময় ইচ্ছা জেগে ওঠায় বাসায় চলে এসেছেন। তার শ্বশুর-শাশুড়ির কোনো কাজ নেই। দিনে পাঁচবার ঘুমোতে যায়। ফাঁক পেলে রন্ধনরত বউকে টেনেহিঁচড়ে বিছানায় নিয়ে অল্প সময়েই কুপোকাত। ভুঁড়ি অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য গ্রহণে বিরাট আকার ধারণ করেছে। কর্তব্যরত অবস্থায় সঠিক শ্বাস-প্রশ্বাসও নিতে পারেন না। কোনো রকমে কাজ সেরে আবার ট্যাক্সি নিয়ে কাজে বেরিয়ে যান। এক-দুই সপ্তাহ আবার এসব এমবেরাসিং কাজে জড়ান না। দেশে তার বাবার প্রচুর সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হওয়ার পর একটা বড় অংশ জুটেছে তার। বিক্রি করে এদেশে নিয়ে এলে মিলিয়ন ডলারের বাড়ি ক্যাশে কিনতে পারতেন। তা করবেন না। অনেক রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। তিনিও তার স্ত্রীর মতো ভাইবোনদের জন্য অ্যাপ্লাই করে রেখেছেন। এরাও নানা কারণ দেখিয়ে তার কাছ থেকে ডলার খসিয়ে নেয়। মা-বাবার চিকিৎসার কথা উঠিয়ে প্রায়ই তারা ঢাকায় বড় হাসপাতালে নিয়ে যায়। থাকা-খাওয়া-চিকিৎসা বাবদ লাখ টাকার কাছাকাছি বিল আসে। ওদের দাবি, বড় ভাই হিসেবে তুমি দেশে থাকলে এসব তোমাকেই করতে হতো। আমরা আমাদের কাজকর্ম ফেলে দায়িত্বগুলো পালন করছি, তুমি ডলার পাঠিয়েই খালাস। মা-বাবাকে ভাবির ভয়ে ওদেশেও নিয়ে যাচ্ছ না। আসলে এগুলোর জবাব দিয়ে ঝামেলা বাড়াতে চান না তিনি। তাই স্ত্রীকে ডজ দিয়ে তার অজান্তে ডলারগুলো পাঠিয়ে দেন।
সফিক এবার সত্যিই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। ভদ্রমহিলা বা ক্যাশিয়ারকে কিছু একটা বলতে চায়। লক্ষ করে, ভদ্রমহিলার সব আইটেম স্ক্যান করে ফেলেছে। এবার পেমেন্টের পালা। সফিকের অনুমান ছয়-সাতশ ডলারের বিল গুনতে হবে। একশ ডলারের কড়কড়ে নোট অথবা ডেবিট ক্রেডিট কার্ড বেরিয়ে আসবে। সফিকের কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে ভদ্রমহিলা দ্রুত অনেকটা ছোঁ মেরে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে নীল ও সাদা রঙের একটি কার্ড বের করে রেজিস্টারের টার্মিনালের নির্ধারিত স্থান ঘুরিয়ে নিয়ে এলেন। পিন নাম্বার টিপে দিলে অ্যাপ্রুভ হয়ে রিসিপ্ট বেরিয়ে এল। ভোজনটিকিটের ক্ষমতায় পকেট থেকে না খসিয়ে ট্রলি-ভরা মালামাল নিয়ে বীরদর্পে বেরিয়ে গেলেন।