উন্নত রাষ্ট্র গড়তে দরকার প্রকল্প নয়, সক্ষমতার রূপরেখা
নাশরাত আর্শিয়ানা চৌধুরী
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৩
•
অনলাইন সংস্করণ
উন্নত রাষ্ট্র গড়তে দরকার প্রকল্প নয়, সক্ষমতার রূপরেখাবাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন আমাদের বহুদিনের। কিন্তু উন্নত রাষ্ট্র বলতে শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন বোঝায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন একজন নাগরিক ঘুষ ছাড়া সরকারি সেবা পান, একজন উদ্যোক্তা হয়রানি ছাড়া ব্যবসা করতে পারেন, একজন তরুণ যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, একজন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান এবং একজন বিনিয়োগকারী আইনের শাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারেন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, পোশাকশিল্প, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যাওয়া। এ পর্যায়ে শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার গুণগত পরিবর্তন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাত, ব্যবসার পরিবেশ, কর্মসংস্থান, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথমেই প্রয়োজন আইনের শাসন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সরকার বা ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও যাতে বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, নির্বাচন, দুর্নীতি দমন, নিরীক্ষা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পারে, সেই কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত, সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিমূলক এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বড় প্রকল্প ও সরকারি ক্রয়ে উন্মুক্ত তথ্য প্রকাশ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং ডিজিটাল ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। দুর্নীতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আধুনিক আদালত ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
উন্নত রাষ্ট্র গড়তে শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা অপরিহার্য। বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত ২০২৫ সালে ৭ শতাংশের নিচে, প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এত কম রাজস্ব দিয়ে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও সামাজিক নিরাপত্তা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা কঠিন। তাই ‘যার আয় বেশি, তার কর বেশি’ নীতিতে আধুনিক করব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আয়ের সঙ্গে সঙ্গে কর পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। চাকরিজীবীদের বেতন থেকে নির্দিষ্ট হারে আগাম কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কর দেবে। নগদে আয় করা ব্যক্তিরা বার্ষিক আয়ের হিসাব দিয়ে কর দেবেন। বছর শেষে হিসাব করে অতিরিক্ত কর দেওয়া হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। নির্ধারিত আয়ের নিচে থাকা ব্যক্তিদের কর দিতে হবে না; তবে সরকারি সুবিধা পেতে আয় না থাকলেও শূন্য আয় দেখিয়ে কর-নথি দাখিলের সুযোগ রাখা যেতে পারে।
তবে নতুন করব্যবস্থা হঠাৎ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। জনগণের সঙ্গে আলোচনা, গণশুনানি এবং ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে হবে—কেন কর দিতে হবে এবং এর বিনিময়ে কী নাগরিক সুবিধা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে শহর, জেলা ও বিভাগভিত্তিক স্থানীয় করব্যবস্থার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে। পণ্য ও সেবার ওপর নির্দিষ্ট বিক্রয়কর আরোপ করে সেই অর্থ স্থানীয় নাগরিক সুবিধা, সড়ক, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সেবায় ব্যয় করা যেতে পারে।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও জরুরি। মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে বিশ্বব্যাংকের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ও পরিশোধের সামর্থ্য কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে। বিদ্যমান ঋণখেলাপিদের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তালিকা করে আইন অনুযায়ী অর্থ আদায় করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পেশাদার ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ বা প্রয়োজনে বন্ধ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
শিক্ষাকে শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম না করে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও ডিজিটাল দক্ষতার ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায় থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোডিং, রোবটিক্স, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা শিক্ষা, আর্থিক জ্ঞান ও যোগাযোগ দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে মান বাড়ানো বেশি জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তুলে গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল করা প্রয়োজন, যাতে দেশের মেধাবীরা দেশে থেকেই উদ্ভাবন ও গবেষণার সুযোগ পান।
শিক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক শিক্ষা, নেতৃত্ব বিকাশ, আর্থিক শিক্ষা, ভ্রমণ, কারিগরি জ্ঞান, দেশ-বিদেশের শিক্ষা বিনিময় এবং বিদ্যালয়-পরবর্তী বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়াতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেধাবী ও উদ্ভাবনী শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। গ্রীষ্মকালীন চার থেকে ছয় সপ্তাহের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়া সম্ভব। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সফল ইন্টার্নদের পরবর্তী সময়ে চাকরির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে; তবে পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়োগ বাণিজ্য ও পক্ষপাত বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই বিপুল জনশক্তিকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করা না গেলে জনসংখ্যাগত সুবিধা বোঝায় পরিণত হতে পারে। গত এক দশকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও চাকরি সৃষ্টি হয়েছে ৮৭ লাখের মতো—এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একটি জাতীয় কর্মসংস্থান মিশন প্রয়োজন। প্রতিবছর কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কোন জেলায় কোন শিল্প গড়ে উঠবে, তরুণদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে—এসবের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষানবিশ, ইন্টার্নশিপ, দক্ষতা প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সংযোগ, নারীদের বিশেষ কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে পোশাকশিল্প-নির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদন ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হবে। ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া, ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্প, সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়; বরং ব্যবসা ও বিনিয়োগের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ দল গঠন করে বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের সুযোগ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা প্রয়োজন।
আমলাতন্ত্রকেও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। একজন নাগরিককে একটি সনদের জন্য দিনের পর দিন সরকারি অফিসে ঘুরতে হবে—এমন ব্যবস্থা উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে যায় না। ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল হিসাব’ ধরনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ভূমি, কর, সামাজিক নিরাপত্তা, লাইসেন্স, বিভিন্ন সনদ, নামজারি, মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদ, পেনশন, প্রবাসী কার্ড, পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সেবা একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। প্রতিটি আবেদনের জন্য আলাদা অনুসরণ নম্বর থাকবে এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে যাবে। নগর উন্নয়নেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ বাড়ায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, কুমিল্লা, বগুড়া, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জসহ বড় ও মাঝারি শহরগুলোকে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে হবে। আধুনিক গণপরিবহন, সাশ্রয়ী আবাসন, হাসপাতাল, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চল, পার্ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। ছোট শহরগুলোকেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় স্বাস্থ্যতথ্যভান্ডারের মাধ্যমে নাগরিকের চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ব্যয় কমবে। ধাপে ধাপে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যবিমা চালু করা যেতে পারে। দরিদ্রদের জন্য সরকারি সহায়তায় বিমা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং আয়ের ভিত্তিতে বিমার কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে। কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, একটি আধুনিক শিল্প হিসেবে দেখতে হবে। কৃষককে উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচনা করে উন্নত বীজ, সেচ, সার, কৃষিঋণ, কৃষিবিমা, সংরক্ষণাগার, হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়াতে হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ, এলএনজি, পারমাণবিক শক্তি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং জ্বালানি সংরক্ষণ—সবকিছুকে সমন্বিত করে জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রবাসীদেরও দেশের বিনিয়োগ ও উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। শুধু রেমিট্যান্স পাঠাবেন—এই ধারণা বদলাতে হবে। প্রবাসীদের জন্য ‘বাংলাদেশ ডায়াসপোরা বিনিয়োগ কর্মসূচি’ চালু করা যেতে পারে। ব্যবসা, শিল্প, নতুন উদ্যোগ, আবাসন, বন্ড ও অবকাঠামো প্রকল্পে সহজে বিনিয়োগের জন্য একক সেবা চালু করতে হবে। বিনিয়োগের মুনাফা ও মূলধন আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় প্রবাসী যে দেশে থাকেন, সেই দেশে ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে আস্থা বাড়বে। বিনিয়োগকারী মারা গেলে তার উত্তরাধিকারী বা মনোনীত ব্যক্তির কাছে অর্থ হস্তান্তরেও দীর্ঘসূত্রতা থাকা উচিত নয়।
দুর্নীতি কমাতে শুধু বক্তৃতা নয়, ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। নগদবিহীন সরকারি লেনদেন, ডিজিটাল ক্রয়, ই-কর, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড, স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স এবং তাৎক্ষণিক নিরীক্ষা একসঙ্গে কার্যকর করা গেলে দুর্নীতির সুযোগ কমানো সম্ভব। ভূমি রেকর্ড ডিজিটাল করার কাজ যেখানে অসম্পূর্ণ, তা দ্রুত শতভাগ সম্পন্ন করতে হবে।
বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—প্রকল্পটি কত অর্থ আয় বা সাশ্রয় করবে, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সাধারণ মানুষ কী সুবিধা পাবে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত এবং একই অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করলে বেশি ফল পাওয়া যাবে কি না। এতে রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা কমবে।
সবকিছুর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন-রূপরেখা। আগামী ১০ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রথম দুই বছরে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ব্যাংক ও কর সংস্কার, বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি সেবা ডিজিটালাইজেশন; তৃতীয় থেকে পঞ্চম বছরে শিল্প, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বিদেশি বিনিয়োগ; ষষ্ঠ থেকে অষ্টম বছরে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত শিক্ষা, আধুনিক গণপরিবহন, পরিকল্পিত নগর ও সামাজিক নিরাপত্তার আধুনিকীকরণ; আর নবম ও দশম বছরে উচ্চ উৎপাদনশীল অর্থনীতি, শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আধুনিক অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি ও উন্নত সরকারি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা যেন বদলে না যায়। একটি সরকার পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। পরবর্তী সরকার আগের সরকারের অসমাপ্ত প্রয়োজনীয় প্রকল্প শেষ করবে এবং সময় ও পরিস্থিতির আলোকে নতুন পরিকল্পনা যুক্ত করবে। উন্নয়ন কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়।
বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অন্য কোনো উন্নত দেশের হুবহু অনুকরণ করতে হবে না। তাদের আইনের শাসন, উদ্ভাবন, গবেষণা, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি, স্থানীয় সরকার ও জবাবদিহির ভালো দিকগুলো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর উন্নয়নে যাওয়া।
উন্নত বাংলাদেশ নির্মাণের প্রকৃত মাপকাঠি হবে মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের সেবার মান এবং নাগরিকের মর্যাদা। সেই লক্ষ্যেই উন্নয়নকে হতে হবে।