প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১
•
অনলাইন সংস্করণ
সদ্যই ফেসবুকে কিছু বাংলা কবিতা দৃশ্যমান হয়েছে, যেগুলো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বন্দনা করে রচিত হয়েছিল। যারা কবিতাবলো প্রচার করছেন, তাদের ভাবখানা এমন, প্রথিতযশা বাঙালি কবিরা যেখানে পাকিস্তানের প্রধানতম নেতা জিন্নাহকে নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন, সেখানে আপনি কে হে তার সমালোচনা করেন। এই কবিতাশ্রয়ী পাকিপন্থীরা এটা বলে না যে সেই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল পূর্ববঙ্গের পাকিস্তান অধ্যায়ে। তখন সেই বাঙালি কবিরা ছিলেন পাকিস্তানের নাগরিক, আর দেশটির স্থপতি বলে তাকে নিবেদন করে কবিতা লেখা যেতেই পারে। কিন্তু যখন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেল, তখন বাংলাদেশি কোনো কবি জিন্নাহকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন কি না—আলোচনার বিষয় হতে পারে সেটা। কারণ প্রকৃত বাংলাদেশপন্থী কারও পক্ষে সেটা আর সম্ভবপরই নয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কারণে এই অঞ্চলে জিন্নাহ আর সমকালীন থাকতে পারেননি, হয়ে পড়েন কেবল ইতিহাসের বিষয়।
ইতিহাস আর রাজনীতি—দুটোই সরল গণিতের মতো গরলে ভরা। তাই বহরৈখিকভাবে দেখতে হবে সবকিছু। ভারতীয় উপমহাদেশ এত বেশি ক্রান্তির ভেতর দিয়ে গিয়েছে, যেখানে ঘটনা শুধু নয়, ব্যক্তিবর্গকেও পাওয়া যায় নানা বিপরীত অবস্থানে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনে যা অন্যদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। ১৯০৬ সালে ঢাকায় যখন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা পায়, তখন তিনি কংগ্রেসি। এর এক দশক পর তিনি সেই লীগের সভাপতি হন। তবে তখনো তিনি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ—পাশাপাশি দুটো দলেই ছিলেন। এর একটা বড় কারণ তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যপন্থী যারা, তাদের সঙ্গে ছিলেন। সেই জায়গা থেকে ১৯১৮ সালে জিন্নাহকে নিয়ে বই লেখেন কংগ্রেসের অন্যতম নেত্রী সরোজিনী নাইড়ু। যে বইয়ের নাম ‘মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ : অ্যান অ্যাম্বাসেডর অব ইউনিটি’। এর মানে বইটির শিরোনামেই জিন্নাহকে ঐক্যের দূত বলা হয়েছে। আর বইটি যে ইন্ডিয়ান ন্যাশন বিল্ডার্স বা ভারত জাতি গঠনের স্থপতিদের নিয়ে রচিত ধারাবাহিক কিছু বইয়ের একটি, সে কথাও লেখক এই বইয়ের শুরুর দিকেই জানিয়েছেন।
আলোচ্য বইখানিতে জিন্নাহর পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে তাকে উদ্ধৃত করেই সরোজিনী নাইড়ু লিখেছেন, ‘আমার আকাঙ্ক্ষা হলো মুসলিম গোপালকৃষ্ণ গোখলে হওয়া।’ উদারপন্থী হিন্দু নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলের মতো হতে চেয়েছিলেন জিন্নাহ। এখানে আরও একটু বলতে হয়, মহাত্মা গান্ধী ও মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক গুরু হিসেবে গোখলের নাম ইতিহাসস্বীকৃত।
সময়ের পরিক্রমায় একদিকে কংগ্রেস গোখলের উদারপন্থা থেকে সরে হিন্দুত্ববাদের দিকে এগোতে থাকে, অন্যদিকে জিন্নাহও সেই পথ ছেড়ে মুসলিমপন্থার রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তারপর গঙ্গা-সিন্ধু-নর্মদা-কাবেরী-যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। কায়েদে আযম হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন জিন্নাহ। পরিচিতি পান দেশটির বাবায়ে কওম বা জাতির পিতা হিসেবে। কিন্তু ভাষা প্রশ্নে বাঙালির প্রতি বিরূপ এক অবস্থান নেন তিনি। তাই পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে নিজের অবিসংবাদিত অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। পাকিস্তানে বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম অধ্যায়ের মাঝেই তিনি অবশ্য প্রয়াত হন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তাই তিনি দায়মুক্তি পান। কিন্তু একই বিষয়ের আন্দোলনের দুটি অধ্যায়ের সম্পর্ক রয়েই যায়। যেমন আটচল্লিশ থেকে বায়ান্ন—বাঙালির ভাষা আন্দোলনের পুরোটা পর্বই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বীকৃত।
হালে একটা পক্ষ আবার দাবি করে থাকে, পাকিস্তানের ধারাবাহিকতায় হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু একাত্তরে যে মুক্তিযুদ্ধ করতে হয়েছে, অগণিত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, নারীদের নিপীড়ন সইতে হয়েছে—সেটা এড়িয়ে যান তারা। পশ্চিম পাকিস্তান যে পূর্ব পাকিস্তানকে একধরনের উপনিবেশ বিবেচনা করত, সেই ইতিহাস তারা বলেন না। একাত্তরে পাকি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালির রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেন না। তারা বলেন না পাকিস্তানের গণতন্ত্রহীনতার কথা, বলেন না সামরিক শাসকদের কথাও। অতীত নয়, যা হালেও দেখা যাচ্ছে : যেখানে জননির্বাচিত নেতা ইমরান খানকে কারাবন্দী রেখে ছদ্ম গণতন্ত্রের আড়ালে সমরতন্ত্রই চলছে পাকিস্তানে। তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নও তোলা হচ্ছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। সেই ১৯৪৮ সালেও জিন্নাহর চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা; যা প্রয়াণের পরিণতির দিকে গিয়েছিল, সেটা তার ভাগ্যলিপি, নাকি কোনো ষড়যন্ত্র ছিল, সে বিষয়ে কোনো সুরাহা কিন্তু আজও মেলেনি।
বাংলাদেশে পাকিস্তান-প্রীতি যাদের, তারা কিন্তু এসব দিক কখনোই সামনে আনেন না। তাদেরই একটি অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় জিন্নাহ বন্দনার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষটা ভালো হয়নি। ছাত্রদল এর বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়। বামপন্থী ছাত্রনেতারা জিন্নাহর ছবিখানি দেয়াল থেকে তুলে ফেলে দেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র শিবিরপন্থীরা যথারীতি বিষয়টি ভালো চোখে দেখেনি। জিন্নাহ-প্রীতির আগে তাদের একটু পেছন ফিরে দেখা উচিত। ব্রিটিশ ভারতের জামায়াত তাকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখত। তখন তারা পাকিস্তান আন্দোলনেরও বিরুদ্ধেই ছিল। সেই আন্দোলনের একজন কর্মী ছিলেন তখনকার ছাত্রনেতা শেখ মুজিব। পরে যিনি হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। পান ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাব। তারপর তার নামেই হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে তিনিই আখ্যায়িত হন ‘জাতির জনক’ হিসেবে। এভাবে বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক যেমন হয় পাকিস্তান, তেমনি জিন্নাহও। তাই একালের ঢাকায় জিন্নাহ-প্রীতি, পাকিস্তান-প্রীতিরই সমান্তরাল। এ জাতীয় প্রীতিতে যে রাজনীতি আছে, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই রাজনীতিটা স্বাধীন বাংলাদেশে খুব বেশি টেকসই হবে না, সেটা ডাকসু-কাণ্ডেই প্রমাণিত সত্য। আর সত্যের বিজয় যে অবধারিত, সেটা তো বাণী চিরন্তন হয়ে আছে দেশে দেশে।