প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:২৬
•
অনলাইন সংস্করণ
নিউইয়র্কে মাত্র কয়েক দিনের সফর। মাত্র ৯৬ ঘণ্টা। কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার নিউইয়র্কে পৌঁছানো প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের বিতর্কে ভাষণ দেবেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ।
বাংলাদেশের ঐতিহ্য অনুসরণ করে তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার। সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতাদের স্বাগত নাশতায় স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে অংশ নেন তিনি। এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই দিনে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনায় তার অংশ নেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর বুধবারও ব্যস্ত দিন। আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা। এরপর বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলা নিয়ে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন ও ন্যায়সংগত রূপান্তরবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
একই দিন বাংলাদেশের উদ্যোগে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ুবিষয়ক আলোচনাগুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে।
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। এদিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বিশ্বনেতাদের সামনে বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ভাষণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক যাত্রা, জাতীয় অগ্রাধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে সরকারের অবস্থান উঠে আসবে বলে জানানো হয়েছে।
একই দিনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সূচনা বক্তব্য দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি নিয়ে বাংলাদেশের আয়োজিত অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সূচি রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দিনভর ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশ ও সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর দিনের কর্মসূচি শুরু হয়।
এরপর জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, হাইতির প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের স্বাগত প্রাতরাশে : দিনের শুরুতে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৭টায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত স্বাগত প্রাতরাশে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে আসা বিশ্বনেতা ও তাঁদের সঙ্গীদের সম্মানে এ প্রাতরাশের আয়োজন করা হয়।
সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগদান : স্বাগত প্রাতরাশের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন গত ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও সাধারণ বিতর্ক শুরু হয় ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক : জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে পৃথক সাইডলাইন বৈঠক করেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ. হুসেইন মোহামেদ লতিফ।
বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশ দুটির বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করা, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে সহযোগিতার বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করেন নেতারা।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠক : বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গেও সাইডলাইন বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আরও জোরদার এবং ভবিষ্যতে অংশীদারত্বের নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় হয়।
হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা : জাতিসংঘ সদর দপ্তরে হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিস-আইমের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বাংলাদেশ ও হাইতির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণে সহযোগিতা আরও জোরদার এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও বৈঠকে গুরুত্ব পায়।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বারহাম সালিহর সঙ্গে আলোচনা : নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থল হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ সৃষ্টি এবং এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও সমন্বিত ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে তাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই।
রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপরও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এরদোগানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : নিউইয়র্কে তুর্কি হাউসে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার ও বহুমাত্রিক করার বিষয়ে দুই নেতা মতবিনিময় করেন।
অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন দুই নেতা।
সংক্ষিপ্ত সফর, ব্যস্ত কর্মসূচি : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এবারের নিউইয়র্ক সফর তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর কর্মসূচি অত্যন্ত ব্যস্ত। একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।