
রবিনরাফানের আসল নাম ওবায়দুর রহমান। বাড়ি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। তিনি ২১ আগস্ট বিকেলে জ্যাকসন হাইটসে ঠিকানা অফিসে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মূলত তার স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় ও শখের বশে কনটেন্ট ক্রিয়েট করা শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার স্ত্রী একজন বিউটিশিয়ান। তিনি মেকআপ ভিডিও করেন। এ কারণে তার অনেক ভিউ হয়। সেই ভিউ দেখে আমিও কনটেন্ট তৈরির অনুপ্রেরণা পাই। এরপর কয়েক বছর আগে কনটেন্ট তৈরি করি। সেই থেকে পথচলা। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। আমি পজিটিভ ভিডিও করি বলে আমার অনেক ভিউ এবং অনেক ফলোয়ার। এখন আমি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার ডলার আয় করি।
তিনি বলেন, আমি কেবল কনটেন্ট ক্রিয়েটই করি না, চেষ্টা করি তা অন্যকেও শেখাতে। টেক ও এআই রিলেটেড কনটেন্ট আমি তৈরি করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকে আমার কনটেন্ট দেখে। তারা আমার ক্লাসেও অনেকেই জয়েন করেছে। এ পর্যন্ত আমি অসংখ্য মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ক্লাসে জয়েন করার জন্য ৬০০ টাকা করে ফি নেওয়া হয়। যারা ক্লাস করেন, তাদের অনেকেই উপকৃত হয়েছেন।
তিনি বলেন, আমার আসল নাম ওবায়দুর রহমান। জন্ম নিয়েছি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার শোলাকিয়ায়। কিশোরগঞ্জেই এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করি। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ২০০৪ সালে ঢাকায় আসি এবং এসিসিএ পার্ট-২ সম্পন্ন করি। এর পর থেকেই ডিজিটাল মার্কেটিং, ভিডিও এডিটিং ও গ্রাফিক্স ডিজাইনকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করি এবং ফ্রিল্যান্সিং জগতে যুক্ত হই। ২০১৯ সালে কনটেন্ট ক্রিয়েশনে মনোযোগী হই এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় টেক বিষয়ক শর্ট কনটেন্ট দিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই মিলিয়ন ফলোয়ার পেয়ে যাই।
ওবায়দুর বলেন, আমার সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি হলো টিকটকে Best Long Form Content Creator 2024 পুরস্কার পাওয়া। এ ছাড়া সেরা কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আরও বেশ কিছু অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে BABISAS Award 2022- Best Content Creator, 24th BABISAS Award 2023-24- Best Content Creator, 26th TRAB Awards 2025- Best Content Creator, 34th TRUB award 2024- Best Content Creator, BIFA Awards 2025-Best Content Creator, BoiSodai Best Seller Author Award 2025, Dhallywood Film & Music Awards 2025 USA (Best Content Creator), Borshadupur’s 2025 best seller books award. AI Masterclass for Content Creator এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৫ হাজারেরও বেশি ক্রিয়েটরকে লাইভ প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বাংলাদেশের প্রথম কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে দেশের সবচেয়ে ভলান্টারি প্যারামিলিটারি ফোর্স বাংলাদেশ আনসার অ্যান্ড ভিডিপিকে কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, আমি সময় পেলে বইও লিখি। ইতিমধ্যে আমার একাধিক বই প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বই ‘ভবিষ্যতের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ থেকে সাফল্য’ বেস্ট সেলার। প্রকাশিত হয় বর্ষাদুপুর পাবলিকেশন থেকে অমর একুশে বইমেলা ২০২৫-এ। দ্বিতীয় বই ‘ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট ও সফল ক্যারিয়ার’, এটিও বেস্ট সেলার। প্রকাশিত হয় বর্ষাদুপুর পাবলিকেশন থেকে অমর একুশে বইমেলা ২০২৫-এ। তৃতীয় বই ‘এআই কন্টেন্ট প্রম্পট থেকেই ইনকাম’, প্রকাশিত হয় বর্ষাদুপুর পাবলিকেশন থেকে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই এবং প্রকাশের ২০ দিনের মধ্যেই প্রথম মুদ্রণ সোল্ড। দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যে।
তিনি বলেন, আমার স্ত্রীও একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তার নাম শারমীন আক্তার। তিনি মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে ভালো করছেন। আমাদের এক ছেলে, নাম মুহাম্মদ সায়ফান রাফান। সে স্টুডেন্ট এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আমরা সবাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব।
তিনি আরও বলেন, এআই এখন আর কেবল বড় বড় কোম্পানির সম্পদ নয়। কনটেন্ট নির্মাতা, শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার সবাই এর সুবিধা নিতে পারে। এটি সময় বাঁচায়, সৃজনশীলতাকে প্রসারিত করে এবং নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। যারা এখন থেকেই শিখতে শুরু করবে, তারা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর কনটেন্টের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে নতুন আলোড়ন। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে আমার তৈরি ভিডিওগুলো প্রযুক্তি, এআই ও ভিজ্যুয়াল এফেক্টের অসাধারণ সংমিশ্রণ, যা ইতিমধ্যেই লাখো দর্শকের মন জয় করেছে। আমার ‘এআই মাস্টারক্লাস’ সিরিজে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার কনটেন্ট নির্মাতা। প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীরা শিখেছেন প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইমেজ টু ভিডিও, টেক্সট টু ভিডিও, ইমেজ টু অ্যানিমে ও মিউজিক কম্পোজিশনের মতো আধুনিক এআই টুল ব্যবহারের কৌশল।
রবিনরাফান বলেন, যেকোনো কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে ভিত্তিটা শক্ত হওয়া উচিত। ভিত্তি শক্ত না হলে সৃজনশীলতা প্রকাশিত হয় না। সৃজনশীলতাকে প্রকাশের জন্য আমাদের একদম বেসিক থেকে শুরু করা উচিত। যারা মনে করছে, আমি আসব, আর যা ইচ্ছা ভিডিও দেব, তাহলে আসলে কনটেন্ট তৈরি হয়তো কিছুদিন ভালো করা যেতে পারে; একটা সময় ঝরে পড়বে। তাই পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। আমি সব সময় ছোট ভিডিওর প্রতি আগ্রহী ছিলাম। তাই ছোট ভিডিও বানানো শুরু করি। প্রথমে চেষ্টা করেছিলাম ইউটিউব, ফেসবুকে দেওয়ার। কিন্তু ওরা বড় ভিডিও চাচ্ছিল। বড় ভিডিও সময়সাপেক্ষ এবং আমার মনে হয়, মানুষের এত সময় নেই যে তারা বড় ভিডিও দেখবে। টিকটক আসার পর আমার ছোট ভিডিওগুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মানুষ পছন্দ করা শুরু করে। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে টিকটকে চার মিলিয়ন ফলোয়ার পেয়ে যাই। তারপর ফেসবুকও রিলস বা শর্ট ভিডিও শুরু করল। সেখানেও এখন ভালো ফলোয়ার হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক এআই টুলস রয়েছে। আপনি কম দামি ফোন দিয়ে ভিডিও করলেও সেটা সেই টুলসের মাধ্যমে কোয়ালিটি বাড়াতে পারবেন। ক্যানভাতে এমন কিছু অপশন রয়েছে। গ্রামের অনেক লোক, যাদের তৈরি করা ভিডিও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তাদের ভিডিও ভাইরাল হয়। কারণ, কনটেন্ট প্রেজেন্টেশন ভালো। কম দামি ফোন ইস্যু নয়, ইস্যু হলো ভালো কনটেন্ট হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন মিনিটের একটা ভিডিও দিলে সেটা যে পরিমাণ রিচ হচ্ছে, সেই পরিমাণ আয় হচ্ছে না। ছোট ভিডিও ৫০ বা ৬০ সেকেন্ডের, সেটার রিচ অতটা না হলেও আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি। এর কারণ হলো দর্শক যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার কনটেন্ট দেখবেন বা এটার সঙ্গে এনগেজড থাকবেন, সেটার ওপর নির্ভর করে ফেসবুক আপনাকে পেমেন্ট করবে। ফেসবুকের নতুন নিয়ম অনুযায়ী আয় করতে চাইলে অন্তত ৫০ সেকেন্ডের ভিডিও আপলোড করতে হবে। পুরো ভিডিওটা মানুষ দেখলে আয় বাড়বে। পুরোটা মানুষ না দেখলে অনেক ভিউ হলেও আয় কম হবে। ফেসবুক রিলসের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৯০ সেকেন্ডের ভিডিও দেওয়া ভালো। ফেসবুক চায় বেশি বেশি পোস্ট করুন। যেমন সন্ধ্যা ৭-৮টা, রাত ১১টার পর পোস্ট না দেওয়াই ভালো। সকাল ৭-৮টার মধ্যে, দুপুর ১২ থেকে বেলা ২টার মধ্যে। রাতের কনটেন্ট রাতেই দেওয়া ভালো। এভাবে সময়টা ঠিক করলে দর্শকেরা পোস্টের সঙ্গে নিজেদের আগ্রহ খুঁজে পাবেন। দর্শকদের চাহিদা বুঝতে হবে। একই ভিডিও সব জায়গায় আপলোড করতে হবে। কপিরাইট সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের জন্য এটা ভালো। না হলে টিকটকে আপনার ভিডিও আপলোড দিলে কপিরাইট দেবে ফেসবুক।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য তার পরামর্শ হলো পরিশ্রমী হতে হবে। নিজেদের সৃজনশীলতা দেখাতে হবে। মানুষ ব্যবসা কিংবা চাকরির পাশাপাশি আরেকটা আয়ের মাধ্যম করতে পারেন। অলস হয়ে গেলে কোনো মূল্য থাকবে না। বেকার হয়ে বসে থেকে অন্যকে দোষারোপ করা যাবে না। নিজেকে অ্যাকটিভ হতে হবে। প্রতিনিয়ত নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে। না হলে আগামী দিনে টিকে থাকা যাবে না।