গত কয়েক বছরে বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশের মাটিতে ফিরেছেন বাংলাদেশি অনেক নারী। এসব নারীর বেশির ভাগই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। তারা অবৈধ উপায়ে প্রশিক্ষণের জাল সনদ তৈরি করে বিদেশে পাড়ি জমান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশে ফেরত আসা নারীদের প্রায় ৯৫ ভাগই সরকারের নির্দেশিত রোডম্যাপ ছাড়া অবৈধ পথ অনুসরণ করে বিদেশে গেছেন। নেননি প্রশিক্ষণ, বানান জাল সার্টিফিকেট। এতে করে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। সম্মুখীন হতে হচ্ছে নানা রকম বিড়ম্বনার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ সরকার বিদেশে কর্মসংস্থানে আগ্রহী নারী কর্মীদের ট্রেনিং ও সার্টিফিকেট সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক কিছু নির্দেশিকা জারি করেছে। সরকারপ্রদত্ত প্রশিক্ষণসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই মাসব্যাপী গৃহপরিচারিকা প্রশিক্ষণ। মূলত বিদেশযাত্রার সব জটিলতা এড়াতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, কতিপয় অসৎ রিক্রুটিং এজেন্সি বাধ্যতামূলক এই ট্রেনিং সার্টিফিকেটটি জাল করার মাধ্যমে কার্যসিদ্ধির অসাধু প্রচেষ্টা করে থাকে। এসব জাল ডকুমেন্ট প্রথাগত পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স বিএমইটিতে জমা হয়ে থাকে। পদ্ধতিটি ম্যানুয়াল হওয়ায় বিএমইটি কর্তৃক সঠিকতা যাচাই করার সুযোগ থাকে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিদেশগামী নারী কর্মীরা বেশির ভাগ সময়ই এর ভুক্তভোগী হয়ে থাকেন এবং প্রবাসে অনিশ্চিত জীবন যাপন করেন।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর এসব গর্হিত কার্যক্রম বন্ধ করতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি, নারী কর্মীদের জন্য অনলাইন ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স চালু করেছে। প্রথাগত ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিতে দুর্নীতির সুযোগ থাকলেও অনলাইন ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতি সম্পূর্ণ ডিজিটাল হওয়ায় এতে দুর্নীতির সুযোগ নেই। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি গণনার ডিজিটাল যন্ত্র থাকায় সবাইকেই সশরীরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এতে অসাধুতা অবলম্বনের সুযোগ কমেছে। সরকার কর্তৃক এমন অভাবনীয় উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং কার্যকরীও বটে- মনে করছেন অভিজ্ঞরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের অসাধু কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে সরকারের এই উদ্যোগকে নানাভাবে প্ররোচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দেশের বাইরে বিপদে পড়ছেন নারীরা।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভ কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, এখন আর কোনো নারীর দুই মাসের প্রশিক্ষণ ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। তারা যদি অন্য কোনো পথ অনুসরণ করে বিদেশ যায়, তাহলে অবশ্যই হেনস্তার শিকার হতে হবে। আমরা আবারো অনুরোধ জানাব, যেসব নারী বিদেশ যেতে আগ্রহী তাদেরকে অবশ্যই বিএমইটির অধীনে যেসব জায়গায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারপর যেন বিদেশ যায়। এতে করে তার সুরক্ষা ও যাবতীয় বিষয়ে অবশ্যই সরকারের নজর থাকবে। আর যদি সে গোপনীয়ভাবে যায়, তাহলে নাগরিক হিসেবে তার দায়ভার বহন করা সরকারের জন্য অবশ্যই কঠিন হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ-কোরিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী লুৎফর রহমান বলেন, যারা বিদেশ যেতে আগ্রহী, নারী-পুরুষ সবার জন্যই প্রশিক্ষণ আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে নারীদের প্রশিক্ষণ আরও বেশি জরুরি। নারীরা যদি প্রশিক্ষণ ছাড়া নিজেকে ডেভেলপমেন্ট না করে বিদেশের মাটিতে পা রাখে, তাহলে তাকে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। সে বিদেশে গিয়ে কী করবে, কোন জব করবে, কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে সেই আলোকে বাংলাদেশে থাকতে তাকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। তাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে ওই কাজ সম্পর্কে। এ জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। সে যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে যায়, তাহলে তার জন্য অবশ্যই মর্যাদাসহ ভালো কাজের সুযোগ-সুবিধা অনেকের চেয়ে বেশি থাকবে। অন্যথায় তার জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করছে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা রঞ্জনা বলেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে দক্ষ করা ছাড়া বিদেশে যাওয়া নারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। আমরা আমরা চাই আমাদের মেয়েরা কাজ নিয়ে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। রেমিট্যান্স আয়ে পুরুষের পাশাপাশি তাদেরও ভূমিকা থাকুক। কিন্তু এর বিনিময়ে কোনোভাবেই নারীর অমর্যাদা আমাদের কাম্য নয়।