বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৮
•
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতিকে ঘিরে বাংলাদেশে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে দাবি করছেন, বাংলাদেশের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নীতিগত পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে বাণিজ্যিক আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে তা ৩৫ শতাংশ, এরপর ২০ শতাংশ এবং সর্বশেষ একটি বাণিজ্য চুক্তিতে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। তবে ওই শুল্ক কাঠামোর আইনি ভিত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আপত্তি ওঠে এবং আদালতের রায়ের পর চুক্তিতে নির্ধারিত হার কার্যকর হয়নি।
এরপর যুক্তরাষ্ট্র ১৫০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে। সেই মেয়াদ শেষ হয় ২৪ জুলাই ২০২৬। এরপর কার্যকর হওয়া নতুন কাঠামো অনুযায়ী ৮৬টি দেশের জন্য ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হার রাখা হয়েছে ১০ শতাংশ।
ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীর একটি সূত্র জানায়, এই নতুন শুল্ক কাঠামো জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ রয়েছে, এমন সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে আসা পণ্যের ঝুঁকি মোকাবিলার অংশ হিসেবে প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদনের অভিযোগ নেই। তবে বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, তাদের কয়েকটির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, যেসব দেশ এ ধরনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ বা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের মধ্যে ১৭টি দেশকে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ শুল্ক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশও সেই তালিকায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির কারণ হচ্ছে তৈরি পোশাক খাতের বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে আগে থেকেই সব দেশের জন্য ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। ফলে যদি বাণিজ্য চুক্তির ১৯ শতাংশ কার্যকর হতো, তাহলে বাংলাদেশের মোট শুল্ক দাঁড়াত ৩৪ শতাংশ (১৫% + ১৯%)। কিন্তু বর্তমান ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ায় বাংলাদেশের মোট কার্যকর শুল্ক দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশ (১৫% + ১০%)।
এ কারণে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে “নতুন করে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। বরং আদালতের রায়ের কারণে পূর্বে আলোচিত ১৯ শতাংশ শুল্ক কার্যকর না হওয়ায় নতুন কাঠামোর আওতায় ১০ শতাংশ হারই এখন প্রযোজ্য হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ওপর ১২.৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ওই দেশগুলোর তৈরি পোশাকের মোট শুল্ক দাঁড়ায় ২৭.৫ শতাংশ (১৫% + ১২.৫%)। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট কার্যকর শুল্ক ২৫ শতাংশ হওয়ায় দেশটি প্রতিযোগীদের তুলনায় ২.৫ শতাংশ পয়েন্ট শুল্ক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য একটি বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বিবেচনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কাপড় ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হলে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক থেকে অব্যাহতি মিলতে পারে। যদিও এ সুবিধা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে কার্যকর হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ফলেই বাংলাদেশ সর্বনিম্ন শুল্ক হার এবং সম্ভাব্য বিশেষ সুবিধার অবস্থানে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুল্ক নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিবর্তে সরকারি ঘোষণা ও আনুষ্ঠানিক নথির ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ, বিদ্যমান কাঠামো অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর কার্যকর অতিরিক্ত শুল্কের হার ১০ শতাংশ হলেও, মোট কার্যকর শুল্ক এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনামূলক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনও তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।