দেশে চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা বৈঠকগুলোতে গৃহীত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে সংকট মোকাবিলায় সরকারের নতুন রয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল সময়কালের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।
সরকারের সাম্প্রতিক নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, মূল্য সমন্বয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একদিকে জ্বালানি ব্যয় কমানো, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার লক্ষ্য-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কঠোর হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অফিসে শেয়ারড পরিবহন ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ রাখা, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখা, ব্যক্তিগত গাড়িতে এসির ব্যবহার কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল পরিহার করা। পাশাপাশি দেশব্যাপী তিন মাসের জন্য আলোকসজ্জা পরিহারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও কঠোর প্রয়োগ ব্যবস্থা, যাতে অপচয় কমানো যায়।
বিদ্যুৎ বিভাগ ইতোমধ্যে একটি সমন্বিত কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে কৃষি, শিল্প ও সার উৎপাদন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেচ কার্যক্রম সচল রাখা, কৃষি উৎপাদন বজায় রাখা এবং শিল্প খাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাশ্রয় কার্যক্রমের মধ্যেও এসব খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি জটিল ভারসাম্যের বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই সমন্বিত উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে এবং কোথায় শৃঙ্খলার ঘাটতি আছে, তা চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি দামের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব মূল্যায়ন, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং টেকসই মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব তৈরি।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে প্রস্তাবটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে পাঠানো হবে। জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পাইকারি পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে ভর্তুকি কমানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি একটি সংবেদনশীল বিষয়। এটি ধাপে ধাপে এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মোট উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ সহজীকরণ, নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিপুল হলেও নীতিগত জটিলতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই বাধা দূর করতে পারলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার করতেও নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনের খসড়া উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪ কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে দ্রুত আইনে রূপান্তরের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে, যা আইনি কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্ধ রাখা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা প্রদানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের এই নতুন কৌশল একটি বহুমাত্রিক পরিকল্পনার প্রতিফলন। এতে স্বল্পমেয়াদি সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপ, মধ্যমেয়াদি মূল্য সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সরকার কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।