নানা রঙিন পোস্টার আর ব্যানারে ছেয়ে গেছে ব্রুকলিন, কুইন্সের হিলসাইড, ম্যানহাটন, ব্রঙ্কস এবং ওজোন পার্কের বাঙালি বসতি আর বাণিজ্যিক এলাকাগুলো। হেতু আর কিছু নয়, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্কের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে না ভাবার কোনো কারণ নেই, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা নয়। কোনো দিক থেকে কোনো কমতি নেই। পথে-ঘাটে, রেস্তোরাঁয় যেখানেই দুই বাঙালি একসাথে সেখানেই অন্য যত আলোচনাই হোক, তার মধ্যে একটা অংশ জুড়ে সোসাইটির নির্বাচন নিয়ে কথা হবেই।
সোসাইটি একটি করমুক্ত সংগঠন। কর্মকর্তা যারা নির্বাচিত হন, তাদের সময়, শ্রম, মেধা সবই স্বেচ্ছাশ্রম এবং সেবামূলক। সোসাইটিকে মনে করা হয়, সব সংগঠনের শিরোমণি সংগঠন। আমব্রেলা সংগঠন। প্রবাসী বাঙালিদের মাথার উপর থাকে। রোদ হোক, বৃষ্টি হোক—সবকিছু থেকে রক্ষা করে। রক্ষা করার কথা। কতটুকু করতে পেরেছে, সে প্রশ্নের উত্তর সকলেরই জানা আছে। এ সংখ্যার সম্পাদকীয়ের বিষয়বস্তু অবশ্যই এটা নয়। কথা হচ্ছে, এ রকম একটি সংগঠনের কর্মকর্তা, সদস্য, যেখানে কারোরই বেতন নেই, ভাতা নেই; অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই; ওই সংগঠনের কর্মকর্তা-সদস্যপদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য এত অর্থব্যয়, এত সময় ও শ্রম ব্যয় কেন করা হয়। সেটা মনে হয় আজও কারও কাছে স্পষ্ট নয়।
প্রতিটি নির্বাচনেই এ প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়। উত্তর অমীমাংসিতই থাকে। উত্তর মিলুক, না মিলুক, নির্বাচনের ব্যয় এবং জৌলুশ উত্তরোত্তর দুটিই বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার নির্বাচনে দুটি পূর্ণ প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আতাউর রহমান সেলিম এবং মোহাম্মদ আলী বা সেলিম-আলী পরিষদ এবং আজমল হোসেন ও ফিরোজ আহমেদ বা কুনু-ফিরোজ পরিষদ। ট্র্যাডিশনালি এ রকম দুটি প্যানেলই সোসাইটির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকে। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং সদস্যসহ একুশ পদে দুই প্যানেলে মোট ৪২ জন প্রার্থী সাধারণভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। এর বাইরেও কখনো কখনো ২/১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভাগ্যে জয় কমই জোটে। কমবেশ জয়ী হন দুই প্যানেল থেকে।
২০২৬ সালের নির্বাচনেও সেলিম-আলী এবং কুনু-ফিরোজ প্যানেল থেকে ২১+২১ মোট ৪২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাশাপাশি সাধারণ সম্পাদক পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী—রাব্বী সৈয়দ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে অতীতে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, রাব্বী সৈয়দের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সবটাই যেন প্রতিবাদ। সম্প্রতি নির্বাচন নিয়ে আয়োজিত একটি টকশোতে তিনি স্পষ্ট এবং কোনো রকম আড়াল-আবডাল না রেখে বলেছেন, ‘কেবল প্রতিবাদ জানাতেই তিনি এই নির্বাচনে নেমেছেন।’
অন্য দুই প্যানেলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পদের প্রার্থীরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নিয়ে যা বলেছেন, তার মধ্যে কোনো চমক বা নতুন অ্যাজেন্ডা তুলে ধরতে পেরেছেন বলে শ্রোতারা মনে করতে পারেননি। তাদের বক্তব্যে গতানুগতার বাইরে নতুনত্ব কিছু পাওয়া গেছে, এমনটা টকশোতে উপস্থিত সুধী সমাবেশ মনে করেন না বলে জানা যায়।
রাব্বী সৈয়দের প্রতিবাদ কিসের? তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সোসাইটিতে একটি অনৈতিকতার ধারাবাহিকতা চলে আসছে। তার বিরুদ্ধে সকলের মিলিতভাবে কণ্ঠ তুলে প্রতিবাদ জানানোর সময় হয়েছে। সোসাইটির মতো যে সংগঠন প্রবাসে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে, তেমন একটি সংগঠনের নির্বাচনী প্রক্রিয়াই চলছে অনৈতিকতার ওপর। রাব্বী সৈয়দের মতো কেউ হয়তো সাধারণ সম্পাদকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রার্থী হয়ে সোসাইটির চলমান এই অসুন্দর, অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হননি। তবে এই অনৈতিকতার বিরুদ্ধে কমবেশি কথা উঠেছে সব নির্বাচনের আগে। অভিযোগটি হচ্ছে, যেখানে সোসাইটির সদস্য হওয়ার জন্য নিজেদের পকেটের অর্থে সদস্য হওয়ার কথা, সেখানে প্রার্থীরা নিজেদের পকেটের পয়সা ব্যয় করে সদস্য করেন। তাও ৫/১০ জনের নয়। হাজার সদস্য ভোটার বানান প্রার্থীরা নিজেদের পয়সায়। শোনা যায়, এবার একটি প্যানেল ১৪ হাজার ভোটার করেছে নিজেদের অর্থে, আরেকটি প্যানেল করেছে ১২ হাজার ভোটার। এর ফলে নির্বাচনের ফলাফল সবাই মোটামুটি আগেই অনুমান করে নিতে পারেন। এখন পর্যন্ত ব্যতিক্রমহীনভাবে যারা নিজেদের পকেটের অর্থ দিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ভোট করেন, নির্বাচনে তারাই জিতে যান।
বিষয়টি ন্যায়ের মাপকাঠিতে খুব ভালো ব্যবস্থা বলে মেনে নেওয়া যায় না। অনেকে মনে করেন, সোসাইটি যদি মানুষকে কার্যকর বা কল্যাণকর কিছু দিতে পারত, তবে সবাই নিজের অর্থ দিয়েই সদস্য হতেন। বয়স্ক মা-বাবার জন্যও সন্তানেরা নিজেদের অর্থে সদস্য করাতেন। একই সঙ্গে মনোনয়ন ফির পরিমাণও খুব বেশি বলে মনে করেন অনেকে। তাদের যুক্তি—একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের মনোনয়ন ফি এত বেশি হওয়া ঠিক নয়। এতে নির্বাচনে অনেক সৃষ্টিশীল মানুষের ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্যরে কারণে অংশ নিতে পারেননি।
ব্যাপারটি খুব সহজেই মীমাংসাযোগ্য বলে মনে হয়। একটি পরিবারের প্রধান খুব বেশি হলে ১০ জন সদস্যের জন্য অর্থ জমা দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে ৫ হলেই যুক্তিসংগত হয়। আবার যদি নিজেদের পকেটের অর্থ দিয়ে সদস্য করার রেওয়াজ রাখতেই হয়, তাহলে সাধারণ সভায় বিষয়টি তুলে পাস করিয়ে নিয়ে গঠনতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করে কিছুটা হলেও হালাল করে নেওয়া যায়।
আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করা খুব জরুরি বলে মনে করছি। সোসাইটি কয়েকটি এলাকায় বাংলা স্কুল পরিচালনা করে। খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। নতুন প্রজন্মকে নিজেদের মাতৃভাষার সঙ্গে বেঁধে রাখার উত্তম প্রয়াস। তার চেয়েও বেশি জরুরি মনে হয়, যারা অধিক বয়সে এ দেশে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে আসেন, তাদের জন্য প্রথম ২/১ সপ্তাহ থাকা-খাওয়ার যাদের কোনো ব্যবস্থা নেই, তাদের জন্য এবং গ্রোসারি কিংবা হোটেল রেস্টুরেন্টে কাজ করার মতো একটু ইংরেজি শেখানোর ব্যবস্থা নিলে আরও ভালো হয়। সংশ্লিষ্টরা কি বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন একবার।
এ কথা বলেই এ সম্পাদকীয়ের সমাপ্তি চাই, প্রবাসজীবনে সব সময় যে একটা ‘কী যেন নেই, কী যেন নেই’, মনের মধ্যে একটা হাহাকার, একটু সময়ের জন্য হলেও আমাদের এ রকম সমাবেশ, আনন্দ, হইচই, বিভিন্ন সংগঠনের জন্ম দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিনোদনের আয়োজন সবার প্রয়োজন। কিন্তু এসব করতে গিয়ে যেন আমরা নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্য, রেষারেষি, হিংসা-বিদ্বেষে জড়িয়ে না পড়ি, সে দিকটাতে সতর্ক থাকাও খুব জরুরি। আমরা যা কিছুই করি, তার লক্ষ্য যেন হয় আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা, আমাদের কল্যাণ, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জন। এ নির্বাচনেও যেন আমরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেটা অর্জন করতে পারি।