আমার শৈশব, বাল্যকাল ও যৌবনের একটি দীর্ঘ সময় কেটেছে এক নিবিড় অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান সবাই মিলেমিশে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন করেছি। ছোটবেলায় পূজা, ঈদ কিংবা বড়দিন কোনো উৎসবই যেন কোনো একটি সম্প্রদায়ের একার ছিল না; সব উৎসবই ছিল আমাদের সবার। একে অপরের আনন্দে স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেওয়া, দল বেঁধে বাড়িতে বাড়িতে যাওয়া এবং উৎসবের খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল আমাদের শৈশবের রঙিন দিনগুলো।
আমাদের ‘মাল্লা’ গ্রামটি এবং তার চতুর্দিকের সীমাহীন চৌহদ্দি ছিল যেন সম্প্রীতির এক টুকরো শ্যামল মানচিত্র। মাল্লার পশ্চিমে টাহরদিয়া গ্রাম পুরোটাই মুসলিম অধ্যুষিত। দক্ষিণে বিল পেরিয়ে পারাবর্তা ও হর্দি গ্রাম; সেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করতেন। পূর্ব দিকে কেটুন গ্রাম সম্পূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত। আর মাল্লা গ্রামে আমাদের বাড়ির পাশে ছিল মাত্র চারটি মুসলিম পরিবার।
আমাদের গ্রামের উত্তরে এগোলেই মঠবাড়ি হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বসতি। সেখানে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত একটি ক্যাথলিক গির্জা রয়েছে। মঠবাড়ির আরও উত্তরে উলুখোলা গ্রাম; সেখানেও হিন্দু ও খ্রিষ্টানরা পাশাপাশি বসবাস করতেন। তখনকার দিনে উলুখোলা বাজার ছিল প্রাণচঞ্চল ও অত্যন্ত জমজমাট। সপ্তাহের শনি-মঙ্গলবার এখানে নিয়মিত হাট বসত। তখন উলুখোলা হয়ে উঠত পুরোদস্তুর ব্যস্ত ব্যবসায়-কেন্দ্র।
এই উলুখোলা গ্রামে হিন্দুদের আখড়া দেখেছি। বালু নদের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত উলুখোলা বাজার। বালু নদ পার হয়ে আরও উত্তরে গেলে উদুর বাজার। দুর্গাপূজার সময় সেখানে আমরা যেতাম দশমীর ‘রথ’ দেখতে। সন্ধ্যার পর উদুর বাজারের বটগাছের নিচে, বালুর পাড় ঘেঁষে বসত বিশাল রথের মেলা। চারদিক থেকে অগণিত নৌকা মাইক বাজিয়ে এসে ভিড় করত সেখানে। নৌকার ওপর থাকত সুদৃশ্য দুর্গা প্রতিমা। এ সময় অগণিত মাইকে গানের আওয়াজ ও লোকজনের হই-হল্লার শব্দ মিলে সেখানে মহোৎসবের পরিবেশ সৃষ্টি করত। ছোটবেলায় জেঠা-কাকাদের তত্ত্বাবধানে আমরা শিশু-কিশোরেরা নৌকায় চড়ে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে যেতাম। সেই নৌ-যাত্রার আনন্দ আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে!
রথের মেলায় মিলত হরেক রকমের খেলনা, বাঁশি। সঙ্গে থাকত রসগোল্লা, বালুশা, গজা, অমৃতি, জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি এবং নানা রঙের যত সুস্বাদু খাবার। কোথাও ঘূর্ণায়মান ‘চড়ক-গাছ’ (চড়কি) ঘিরে হই-হুল্লোড়, শিশু-কিশোরদের ভিড়, আবার কোথাও জুয়ার আসর জমে উঠত। ফেরার সময় মাটির কোলা ভরে মিষ্টি নিয়ে আসতাম। সে সময় এসব ছিল আমার কৌতূহল ও আনন্দে ভরা অন্য এক জগৎ!
দলবেঁধে আমরা বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা দেখতে যেতাম। দর্শনার্থীদের ভিড়ে মণ্ডপগুলো থাকত জমজমাট। সেখানে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই নয়; মুসলিম, খ্রিষ্টান, নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই ছুটে যেতেন প্রতিমা দেখতে। ধর্মীয় পরিচয় তখন আনন্দের পথে কোনো দেয়াল হয়ে দাঁড়াত না। সবার মাঝেই বিরাজ করত আনন্দঘন উৎসবের আমেজ।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে আমরা আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে যেতাম। দই, মিষ্টি, ফলারসহ নানা খাবার দিয়ে আন্তরিকতা ও যত্নের সঙ্গে তারা আমাদের আপ্যায়ন করতেন।
শুধু আমাদের আশপাশেই নয়, আমরা অন্য এলাকাতেও যেতাম দুর্গাপূজার প্রতিমা দেখতে। এলাকায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হতো। রঙিন বাল্বের আলোয় মণ্ডপ ও প্রতিমাগুলো যেন অন্য এক জগৎ থেকে উঠে আসা দৃশ্যের মতো মনে হতো। এমনও দেখেছি, হিন্দু ভাইদের সঙ্গে খ্রিষ্টান, মুসলিম গ্রামবাসী আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে নাচানাচি করছে। তখন তাদের থামিয়ে দেওয়ার কথা কারও মনে আসত না। সবাই দেখে উপভোগ করত। উৎসবে অংশ নেওয়া সবার জন্যই ছিল উন্মুক্ত।
আমি যখন কলেজে পড়ি, তখন আমাদের গ্রামের দক্ষিণে বিলের পাড়ে হরদী বাজারে দুর্গা প্রতিমার বিসর্জন শুরু হয়। সেখানেও উদুরের মতো জমজমাট পরিবেশের সৃষ্টি হতো। দশমীর রাতে বাড়ি থেকে আমরা শুনতে পেতাম দেবী বিসর্জনযজ্ঞের হুল্লোড়ের দিগন্তবিস্তারী আওয়াজ। কয়েক বছর এভাবে চলার পর শুনলাম, সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। শুনেছিলাম হরদী বাজারে প্রতিমা বিসর্জন নিয়ে কোনো কোনো মহল আপত্তি তুলেছিল।
আমাদের গ্রামের পূর্ব দিকে কেটুন গ্রামে অবস্থিত আখড়ায় গিয়ে সারা রাত ‘একনামা’ শুনতাম। এই একনামাকে উপলক্ষ করে সেখানেও বসত মেলা। একনামায় অংশ নিতে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন দল আসত। মনে পড়ে, সে সময় সুদূর বরিশাল থেকে ‘সত্যনারায়ণ’ নামক দল এসেছিল।
মঠবাড়ি গির্জার দক্ষিণে একটি বিশাল বটগাছ ছিল। সেখানেও হিন্দুদের প্রতিমা দেখেছি। পহেলা বৈশাখে সেখানে বসত বৈশাখী মেলা। হিন্দুরা পূজা-অর্চনা করতেন, আর বটগাছের নিচে দেখা যেত প্রসাদের পসরা। মেলায় কাঁঠালপাতা দিয়ে বাটি বানিয়ে দোকানিরা তাতে মিষ্টি পরিবেশন করতেন। এলাকার প্রভাবশালী নেতা মনোরঞ্জন স্যারের বাড়িতেও আমরা দুর্গা প্রতিমা দেখতে যেতাম।
এভাবেই আমরা আমাদের শৈশব ও বাল্যকালের দিনগুলো উপভোগ করেছি। কি পূজা, কি শবে বরাত, ঈদ, বড়দিন—সবার বাড়িতে নাড়ু, সেমাই পিঠাপুলির আয়োজন করা হতো। সকলেই উপভোগ করত উৎসবের আনন্দ। আমাদের মধ্যে উৎসবের নাম এবং ধর্মীয় আচার আলাদা ছিল, কিন্তু আনন্দের মর্মার্থ ও ভাষা ছিল এক।
আজ প্রবাসে বসে সোনালি অতীতের সেই মধুময় স্মৃতি রোমন্থন করি। মরমি বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের বয়ান সুর তুলে গাই, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!’
সত্যিই, দিন বদলেছে। আমাদের এলাকায় এখন আর আগের মতো সেই উৎসবের আয়োজন নেই! সবকিছুই যেন সময়ের স্রোতে ফিকে হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে উৎসবের আমেজে প্রকৃতির নিপুণ হাতে আঁকা পরিচিত সেই চিত্র! সেই মান্ধাতা যুগের গ্রামীণ আদলের শণের চাল, মাটির দেয়ালের ঘর, সন্ধ্যার অন্ধকারে লণ্ঠন কিংবা কুপি বাতির টিমটিমে মৃদু আলো দেখেই বেড়ে উঠেছি প্রজন্মের আমরা! আর এখানে এখন চলছে বিদ্যুতের ঝলকানি! আমার জন্মভূমির আঙিনা পুরোটাই সম্পূর্ণ বদলে গেছে! এখানে এসে চারপাশের দৃশ্যপট দেখলে মনে প্রশ্ন জাগে, ‘এ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমি?’
আমাদের এলাকা ঢাকা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে! সেই গ্রাম আর নেই! ঢাকার পূর্ব দিকে ক্রমবর্ধনশীল পূর্বাচল উপশহর সব গ্রাম গোগ্রাসে গিলে খাওয়ার জন্য হামলে পড়ছে! তার ফলে আগের সেই গ্রামীণ নান্দনিক পরিবেশ সমূলেই উৎপাটিত হতে চলেছে! দখিনা বাতাসে দোলায়িত প্রাণ মাতানো বোরো খেতের সবুজ বিস্তারী প্রান্তর ডেভেলপারদের করাল থাবায় এখন ধূ-ধূ বালির মরু!
নগরায়ণের ধাক্কায় আগের সেই গ্রামীণ নান্দনিক পরিবেশ ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যাবেলায় এখন আর আগের মতো শোনা যায় না নারী-পুরুষের সম্মিলিত উলুধ্বনি, ঢাক-খোল-করতাল ও শঙ্খের উদাত্ত আওয়াজ। আখড়া থেকে ভেসে আসে না কীর্তনের সেই সুমধুর মূর্ছনা।
আমাদের মাল্লাসহ পূর্বের কেটুন গ্রামের প্রায় অংশ এখন ডেভেলপারদের কবজায় চলে গেছে। অনেকেই বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। নগরায়ণের অপ্রতিরুদ্ধ ধাক্কায় শুধু ঘরবাড়ি বা জমির চেহারাই বদলায়নি, বদলে গেছে গোটা জনপদের জীবন-ব্যবস্থা, একটি সামাজিক সম্পর্কের জগৎ, একটি লোক-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। ভেঙে গেছে সেই সাজানো বাগান, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের সম্পর্কের পরিচয়টাই ছিল বড়।
এই প্রবাসে বসে আজ তাই ভাবি, আমাদের সেই অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির যতটুকু এখনো বেঁচে আছে, ভবিষ্যতে তার কতটুকু টিকে থাকবে?
তবু আমরা আশাবাদী। কারণ বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই অসাম্প্রদায়িক। শত বিভাজন, পরিবর্তন ও সময়ের ঝড়ের মধ্যেও সাধারণ মানুষ একে অপরের আনন্দে আনন্দিত হতে, দুঃখে পাশে দাঁড়াতে এবং আত্মার বন্ধনে পরস্পরকে আপন করে নিতে ভালোবাসে। উৎসবের রং বদলাতে পারে, মেলার দৃশ্য হারিয়ে যেতে পারে, এমনকি বাপ-দাদার ভিটেমাটিও অন্য কারও দখলে চলে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে সম্প্রীতির বীজ একদিন রোপিত হয়েছিল, তাকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়।
আজও শরতের সন্ধ্যায়, দূর দেশে বসেও হঠাৎ শুনতে পাই টানা ঢাকের শব্দ! দেখি সেই বালু নদের পাড়ে প্রতিমা বিসর্জনের দশমী মেলা!
তবে হ্যাঁ, আমার জন্মভূমির আঙিনায় অতীতের মতো না হলেও এখনো দুর্গোৎসব হচ্ছে। এখন প্রবাসে বসে ভাবি, আমাদের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি যতটুকু বেঁচে আছে, ভবিষ্যতে তার কতটুকু টিকবে?
আমাদের সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না। কিন্তু অতীতের স্মৃতি আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকবে হারিয়ে যাওয়া উৎসবমুখর সময়ের সাক্ষ্য হয়ে। একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন হয়ে, মানুষের সঙ্গে মানুষের চিরন্তন ভালোবাসার এক নীরব দলিল হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা জোগাবে আমাদের!
শারদীয় দুর্গোৎসবের এই শুভলগ্নে সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা!