বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

ঢাকের শব্দ আর বাতাসের দোলায় কাশফুলের শুভ্রতা

ঢাকের শব্দ আর বাতাসের দোলায় কাশফুলের শুভ্রতা

বিজ্ঞাপন
আকাশ নেমেছে ওই পাড়ে
শরতের মেঘে চড়ে
বাতাস থেমেছে নদীপাড়ে
কাশফুলে নড়েচড়ে।
ছেলেবেলার গল্প দিয়েই শুরু করি। বিকেলে বন্ধুদের মাঝে অন্য রকম একটা খেলা ছিল—কাশফুল খেলা। গুচ্ছ কাশফুল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসা একাকী কোনো ফুল নিয়ে সেই প্রতিযোগিতা। উড়ে আসা কাশফুলটাকে বন্ধুদের মধ্যে কে বেশি ফুঁ দিয়ে উপরে তুলতে পারে, মাটিতে কিংবা কোনো ডালে বসার আগে কতক্ষণ হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখতে পারে—এটাই ছিল মূল আকর্ষণ। বাতাস যত প্রবল হতো, আমাদের খেলা হতো তত প্রাণবন্ত। ফুঁ দিতে দিতে গাল ব্যথা হয়ে যেত, পা ব্যথা করত, চোখ ঝাপসা হয়ে আসত—তবু খেলায় কোনো বিরতি ছিল না; ছিল কেবলই জেতার চেষ্টা। কখনো কখনো বাতাসের তালে ফুল উড়ে যেত দূরে। কোথায় যায়, কত দূরে যায়, অপলক দৃষ্টি তা অবলোকন করত গভীর উচ্ছলতায়। পরাজয়ের কালিমা দূর হয়ে যেত নিমেষেই। খেলা সাঙ্গ করে ফিরে যেতাম বাড়ি।
সেই কাশফুল, যা শরতের শুভ্রতার প্রতীক। প্রকৃতিতে কাশফুলের আনাগোনা দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শরৎ এসেছে। একান্তই আমাদের নিজস্ব ফুল এই কাশফুল, যার জন্ম এ উপমহাদেশেই। ভারত, নেপাল, ভুটান ও আফ্রিকা মহাদেশের কিছু এলাকাতেও কাশফুল ফোটে। ফুল হিসেবে এর বাজারজাত কদর নেই, কেউ তা চাষও করে না। তবুও বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো রুক্ষ এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের উঁচু স্থানে কাশফুলের রাশি অপরূপ শোভা ছড়ায়। মূলত নদীর তীরেই কাশফুল বেশি দেখা যায়; কারণ নদীর পলিমাটির আস্তরে কাশের মূল সহজে সম্প্রসারিত হতে পারে।

শরতের অন্যতম বড় আকর্ষণ এই কাশফুল। বাঙালির প্রাণের শারদোৎসবের আবহ তৈরি হয় এই কাশবনের দোলাতেই। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এ দেশে কাশফুল ছিল। সনাতন ধর্মে কাশফুলের জাতভাই ‘কুশ’-এর স্থান খুব উঁচুতে। শুভ কাজে এবং শারদীয় দুর্গোৎসবে কাশের পাতা বা ফুল ব্যবহার করা হয়। কাশফুল যেন মনের কালিমা দূর করে শান্তির শুভ্র বার্তা নিয়ে আসে।
বিস্তীর্ণ নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর কাশফুলের সমারোহ শরৎ প্রকৃতির এক নান্দনিক রূপ। ধবল কাশফুল, সবুজ প্রান্তর আর মেঘলা আকাশ মিলে প্রকৃতি নয়নাভিরাম হয়ে ওঠে। বাতাসের দোলায় সাদা কাশফুল যখন দুলতে থাকে, তখন মানবমনও আন্দোলিত হয়। আবহমান বাংলার চিরায়ত শরতের এই সুনন্দ স্নিগ্ধ ফুল এবং ব্রহ্মপুত্রের অপার সৌন্দর্য খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর কালজয়ী চিত্রকর্মে।

বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় কাশফুল ও শারদীয় আবাহন উঠে এসেছে নানাভাবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাচীন গ্রন্থ ‘কুশজাতক’ কাহিনি অবলম্বন করে ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্য রচনা করেছেন। বর্ষা-বিদায় কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম শরতের সাদা মেঘকে 
কাশফুলের সাথে তুলনা করে লিখেছেন :
‘ওগো ও কাজল মেয়ে, উদাস আকাশ ছলছল চোখ তব মুখে আছে চেয়ে। কাশফুল সম শুভ্র ধবল রাশ রাশ শ্বেত মেঘে তোমার তরীর উড়িতেছে পাল উদাস বাতাস লেগে।’
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় কাশফুল এসেছে নিসর্গের গভীর অনুভবে :
‘ধূ ধূ মাঠ, -ধানক্ষেত, -কাশফুল, -বুনোহাঁস, -বালুকার চর বকের ছানার মতো যেন মোর বুকের উপর এলোমেলো ডানা মেলে মোর সাথে চলিল নাচিয়া!’
কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘কাশফুলের কাব্য’ কবিতায় প্রেমানুভূতি ও শরতের আগমনী রূপ ফুটে উঠেছে অপরূপ ছন্দে :
‘সবে তো এই বর্ষা গেল শরৎ এলো মাত্র, এরই মধ্যে শুভ্র কাশে ভরলো তোমার গাত্র। ...শরৎ রানী যেন কাশের বোরখা খানি খুলে, কাশবনের ওই আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে।’
কবি শামসুর রাহমান নিজের শুভ্রকেশরাশির রূপক হিসেবে কাশফুলের কথা বলেছেন :
‘এই পরিণতি জেনেও এখনো বেহায়া মাথায় এক রাশ শাদা কাশফুল নিয়ে কখনো সকালে দুপুরে অথবা গভীর নিশীথে কলম চালাই।’
অন্যদিকে শারদীয় দুর্গোৎসব ও মর্ত্যে দেবীর আগমনী বারতায় কবি সুশান্ত হালদার ‘দেবী দুর্গাতিনাশিনী’ কাব্যে লিখেছেন :
‘শরতের শরবনে কাশফুলে প্রকৃতি হইয়াছে সুশোভিত নীলাকাশেও সাদামেঘ করিতেছে আনাগোনা অবিরত। মায়ের আগমনী বার্তা শুনিতেছি এই ত্রিভুবনে।’

বস্তুত, কাশফুল কেবল রূপেরই আধার নয়, এটি আবহমান বাংলার শারদোৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’-এর আগমন ঘটে এই কাশফুলের হাত ধরেই। বাতাসে কাশফুলের দোল আর ঢাকের কাঠি—এ যেন একই সূত্রে গাঁথা। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর পূজার সাথে কাশফুলের শুভ্রতা মিশে সৃষ্টি হয় এক পবিত্র ও আনন্দময় পরিবেশ।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় কাশফুল (বৈজ্ঞানিক নাম : Saccharum spontaneum) একধরনের ঘাসজাতীয় জলজ উদ্ভিদ, যা উচ্চতায় প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর পাতা বেশ ধারালো এবং ফুলগুলো তুলোর মতো নরম ও সাদা।

কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক কিংবা উৎসবে আনন্দ জোগানোই নয়, কাশফুলের রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। পিত্তথলিতে পাথর হলে নিয়মিত কাশের মূলসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি ওষুধ ব্যবহারে উপকার পাওয়া যায়। কাশমূল বাটা গায়ে মাখলে দুর্গন্ধ দূর হয় এবং শরীরে ব্যথানাশক ফোড়ার চিকিৎসায়ও এর মূল বেশ কার্যকর।
শরতের নীল আকাশ, শান্ত নদী, ঢাকের শব্দ আর বাতাসের দোলায় কাশফুলের শুভ্রতা—সব মিলিয়ে শারদোৎসবের এই দিনগুলোতে প্রকৃতি ও মানুষ মেতে ওঠে এক অনাবিল আনন্দের মহোৎসবে।
 

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz