মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• বিদেশি বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের সাফল্য, কোন পথে বাংলাদেশ? • ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে গোপনে ১৭ লাখ ডলার পারিশ্রমিক নেওয়ার অভিযোগ • অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্যসচেতনতায় সেমিনার • বাংলাদেশি পাসপোর্টে রোহিঙ্গার মালয়েশিয়া ত্যাগের অভিযোগ • বসনিয়ায় অবৈধ সীমান্ত পারাপারে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ • কৃষি, ওষুধ ও পর্যটনে সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ–সাবাহ আলোচনা • ৩৬ বছরেই মারা গেলেন জিম্বাবুয়ের আম্পায়ার সারাহ • চিকিৎসাসেবায় এআই ব্যবহারের পরামর্শ জনপ্রশাসন উপদেষ্টার • নিজ হাতে প্রাক্তন স্ত্রীকে বিয়ে দিলেন স্পাইডারম্যান খ্যাত অভিনেতা • নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ব্যবস্থা নেবে সরকার

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন

বিদেশি বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের সাফল্য, কোন পথে বাংলাদেশ?

লক্ষ্যভিত্তিক শিল্পনীতি, সহজ বিনিয়োগসেবা ও ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এগিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড। বাংলাদেশের রয়েছে বড় শ্রমশক্তি, তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা, সম্ভাবনাময় অভ্যন্তরীণ বাজার ও কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কারে কতটা এগোতে পারবে বাংলাদেশ—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিদেশি বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের সাফল্য, কোন পথে বাংলাদেশ?

বিজ্ঞাপন
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ টানতে দেশটি পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশও থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ শিল্পায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে।

ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে দেশটির সাফল্যের মূল শিক্ষা শুধু বিনিয়োগের প্রস্তাব বাড়ানো নয়; বরং বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি এবং শিল্পনীতির সঙ্গে অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তির সমন্বয় ঘটানো।

বিনিয়োগে থাইল্যান্ডের এগিয়ে থাকার কারণ
থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে বিনিয়োগের জন্য ৩ হাজার ৩৭০টি প্রকল্পের আবেদন জমা পড়ে। এসব প্রকল্পে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ হাজার ২৩ কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেশি।

একই বছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ উন্নয়ন সুবিধা চেয়ে জমা পড়া আবেদনের প্রস্তাবিত মূল্য দাঁড়ায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি বাথ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ডিজিটাল খাতে বিনিয়োগ প্রস্তাবের মূল্য ছিল ৫২ হাজার ২৬০ কোটি বাথ। শুধু তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২৮টি প্রকল্পে প্রস্তাব করা হয়েছিল ৫২ হাজার ১২০ কোটি বাথ।

তবে এসব পরিসংখ্যান বিনিয়োগের আবেদন ও প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণ নির্দেশ করে, বাস্তবে সম্পন্ন হওয়া বিনিয়োগের পরিমাণ নয়। তা সত্ত্বেও এগুলো দেখায়, ভবিষ্যৎ শিল্পের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে থাইল্যান্ড সক্রিয় রয়েছে।

দেশটির অন্যতম কৌশল হলো সব শিল্পকে সমান সুবিধা না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও যন্ত্রাংশ, উন্নত ইলেকট্রনিকস, ডিজিটাল অবকাঠামো, আধুনিক উৎপাদনশিল্প এবং গবেষণা ও উন্নয়নভিত্তিক কার্যক্রমে বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের ধরন ও যোগ্যতা অনুযায়ী করসুবিধা, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড় এবং অন্যান্য সহায়তাও রয়েছে।

এর লক্ষ্য শুধু বিদেশি কোম্পানিকে এনে কারখানা স্থাপন করানো নয়; বরং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা, যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকে দেশীয় শিল্পের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে থাইল্যান্ড।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা। কোন খাতে বিনিয়োগ এলে রপ্তানি বাড়বে, কোথায় বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কোন শিল্প দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলবে—তা বিবেচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। শুধু করছাড় বা প্রণোদনা ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা, বাধা কোথায়
বাংলাদেশের বড় শ্রমশক্তি, তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা, অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবার মতো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যবসার উচ্চ ব্যয়, প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বড় বাধা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু শ্রমের সহজলভ্যতা বা বাজারের আকার দেখেন না; তাঁরা উৎপাদন ব্যয়, পণ্য পরিবহনের সময়, অনুমোদনপ্রক্রিয়া, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্থিতিশীলতাও বিবেচনা করেন।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত ব্যবসার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমানো। শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস, পর্যাপ্ত পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত পরিবহনসুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, শুল্কায়ন ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বন্দর ও প্রধান পরিবহনপথের সংযোগ উন্নত করতে হবে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে জমি, জ্বালানি, যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় কমতে পারে। এসব সুবিধা শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, দেশীয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও সহায়ক হবে।

ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যকর করাই বড় পরীক্ষা
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে থাইল্যান্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হলো প্রশাসনিক সেবা সহজ করা। দেশটির বিনিয়োগ বোর্ড বিনিয়োগকারীদের প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই, প্রণোদনা, অনুমোদন এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা দেয়।

বাংলাদেশেও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ওয়ান স্টপ সার্ভিস রয়েছে। ফলে নতুন করে ব্যবস্থা তৈরির চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। জমি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, কর, শুল্ক ও ব্যবসায়িক নিবন্ধনের জন্য বিনিয়োগকারীদের যেন বারবার বিভিন্ন দপ্তরে যেতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করলেই ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যকর হয় না। আবেদন থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল, সময়বদ্ধ ও স্বচ্ছ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে সিদ্ধান্ত না হলে তার কারণ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক বিরোধ সমাধানের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ, একটি দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতাও নতুন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ শিল্পায়নের সুযোগ
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি থাইল্যান্ডের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন ও শিল্পায়নের সুযোগ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, থাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও শিল্পায়নের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশে আম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মৌসুমি উৎপাদন বেশি হলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এসব খাতে আধুনিক প্রযুক্তি, হিমাগার, প্যাকেজিং এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য দাম, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের সুযোগও বাড়তে পারে।

হালাল খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মান অনুযায়ী উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশ আরও বেশি মূল্য সংযোজিত পণ্য রপ্তানি করতে পারবে।

যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ উৎপাদন, থাইল্যান্ডে মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা যেতে পারে। আবার পণ্যের ধরন অনুযায়ী এর বিপরীত ব্যবস্থাও সম্ভব। এ ধরনের সহযোগিতা দুই দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরস্পরের পরিপূরক করে তুলতে পারে।

তবে যৌথ উৎপাদন বাস্তবায়নে শুধু সমঝোতা বা আগ্রহ যথেষ্ট নয়। কোন পণ্য উৎপাদিত হবে, কারা বিনিয়োগ করবে, প্রযুক্তি কোথা থেকে আসবে, বাজার কোনটি এবং দুই দেশের প্রতিষ্ঠান কীভাবে লাভবান হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বন্দর যোগাযোগ বাড়লে কী লাভ
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণে রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

দুই বন্দরের মধ্যে কার্যকর সামুদ্রিক সংযোগ গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে পরিবহন রুটের কার্যকারিতা, জাহাজ চলাচলের নিয়মিততা, পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ব্যয় এবং দুই দেশের শুল্ক ও বন্দর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের ওপর।

থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর বিষয়টিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলা, পণ্যের মান উন্নয়ন এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আসে। এ খাতের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ দেশের বড় সম্পদ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন শিল্পে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবায় বিনিয়োগ সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তিতে প্রস্তুতি জরুরি
থাইল্যান্ডের বৈদ্যুতিক গাড়ি বা তথ্যকেন্দ্রভিত্তিক বিনিয়োগের মডেল সরাসরি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। এসব শিল্পে বড় অঙ্কের পুঁজি, দক্ষ জনবল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশকে তাই নিজস্ব সক্ষমতা ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে খাত নির্বাচন করতে হবে। কোন শিল্পে কত কর্মসংস্থান হবে, প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ কতটা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কতটা যুক্ত হতে পারবে এবং রপ্তানি আয় কতটা বাড়বে—এসব বিষয় বিনিয়োগনীতির অংশ হওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলে স্থানীয় কর্মীরা যেন শুধু সাধারণ শ্রমের কাজেই সীমাবদ্ধ না থাকেন, বরং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করে উচ্চতর দায়িত্ব নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই মূল চ্যালেঞ্জ
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একটি দেশে আসেন। তাঁদের কাছে নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও শুল্কনীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতা, ব্যাংক খাতে সুশাসন, সরকারি দপ্তরের জবাবদিহি এবং দ্রুত বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং অনুমোদিত সুবিধা সময়মতো নিশ্চিত করাও জরুরি।

প্রণোদনার কার্যকারিতাও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেই প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর বা রপ্তানি তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান, স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার ও রপ্তানি বৃদ্ধির ফলাফল পরিমাপ করতে হবে।

কোন পথে বাংলাদেশ
থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, সম্ভাবনাময় শিল্প চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগনীতি গ্রহণ। দ্বিতীয়ত, ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যকর করে অনুমোদন, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সুবিধা দ্রুত নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক সুশাসন ও দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করা।

এর পাশাপাশি থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য, যৌথ শিল্পায়ন এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। রেনং ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ উন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের বড় শ্রমশক্তি, অভ্যন্তরীণ বাজার, শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা ও ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু এসব সুবিধাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে ব্যবসার ব্যয় কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার বিকল্প নেই।

থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কোনো একক প্রণোদনা বা প্রচারাভিযানের ফল নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, উন্নত অবকাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সমন্বিত ফল। বাংলাদেশও যদি এ বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে না দেখে সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ করতে পারে, তাহলে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের পাশাপাশি নতুন শিল্প, উন্নত কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz