ঢাকা–রিয়াদ রুটে ৭ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে আড়াই হাজার যাত্রী
বিমানবন্দরে অনিশ্চয়তায় প্রবাসীরা, চাকরি হারানোর শঙ্কা ও বাড়তি খরচের চাপ
এস আর শামস
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৫৪
•
অনলাইন সংস্করণ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রভাবে ঢাকা–রিয়াদ আকাশপথে যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। শনিবার রাত থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত রিয়াদগামী সাতটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রী। তাঁদের বড় অংশই সৌদি আরবের কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি। ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেকে চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন। পাশাপাশি নতুন করে টিকিটের তারিখ পরিবর্তন, যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রেন কিংবা ব্যক্তিগত পরিবহনে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন অনেক যাত্রী। সেখানে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে তাঁদের আবারও নতুন করে যাত্রার পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
রোববার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদগামী যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা যায়। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কবে ফ্লাইট চালু হবে, টিকিটের তারিখ কীভাবে পরিবর্তন করতে হবে কিংবা বিকল্প পথে যাত্রা করা যাবে কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেকে।
প্রবাসীদের অনেকেই সৌদি আরবের ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট কেটেছেন। ফলে টিকিট পরিবর্তন বা নতুন করে যাত্রার ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাঁদের সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। কর্মস্থলে নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে চাকরি ও আয় নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। যাঁরা দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসেছেন, তাঁদের বাড়তি যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচও বহন করতে হচ্ছে।
বিমানবন্দরের বাইরে রিয়াদপ্রবাসী শাহ আলম বলেন, “রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। রোববার দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। দেশের বাড়ি কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শরীফ উদ্দিনেরও যাওয়ার কথা ছিল সৌদি আরবের রিয়াদে। তিনি ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছেন। ভারতের মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁর যাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
শরীফ উদ্দিন বলেন, “ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাঁদের ট্রানজিট, তাঁদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না, মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট কেটেও যেতে পারব কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।”
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার (ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, বাতিল হওয়া সাতটি ফ্লাইটে মোট ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রীর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করতে হবে।
এর আগে শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। নিহত ও আহতদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মিসর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার খবরও আসে।
গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে অন্তত চারবার হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবারের হামলায় এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন।
রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসী শ্রমিকেরা। তাঁদের জন্য দ্রুত ও স্পষ্ট তথ্য জানানো, টিকিট পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা এবং বিকল্প যাত্রার বিষয়ে এয়ারলাইনসগুলোর কার্যকর যোগাযোগ এখন জরুরি। নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের কাছ থেকে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।