সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে বিপদে পড়া ১০১ অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে বেসরকারি মানবিক সহায়তা সংস্থা এসওএস মেদিতেরানের জাহাজ ওশান ভাইকিং। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত দুটি পৃথক উদ্ধার অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের মধ্যে কয়েকজন শিশু ও পাঁচজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন।
তাদের মধ্যে একজনকে চিকিৎসার জন্য ইতালির কোস্টগার্ডের একটি টহল নৌযানে করে ল্যাম্পেদুসায় নেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে ছিলেন তার স্বামী।
৬ অক্টোবর (মঙ্গলবার) রাত থেকে ৭ অক্টোবর (বুধবার) ভোর পর্যন্ত দুটি পৃথক উদ্ধার অভিযানে ১০১ অভিবাসীকে উদ্ধার করে এসওএস মেদিতেরানের মানবিক সহায়তা জাহাজ ওশান ভাইকিং।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংস্থাটি জানায়, “প্রথম উদ্ধার অভিযানটি লিবিয়ার অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকায় (এসএআর জোন) পরিচালনা করা হয়। ভূমধ্যসাগরে সক্রিয় এনজিও অ্যালার্ম ফোনের সতর্কতার পর অভিযানটি শুরু হয়।”
এ সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তরক্ষী বাহনী ফ্রন্টেক্সের একটি বিমান ওসপ্রে ২ থেকেও সতর্কতা প্রচার করা হয়। প্রথম নৌকাটিতে ৬০ জন অভিবাসী ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৭ পুরুষ, ২১ নারী এবং ১২ শিশু ছিলেন। নারীদের মধ্যে পাঁচজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ১২ শিশুর মধ্যে চারজনের বয়স ১ থেকে ৪ বছরের মধ্যে।
ওশান ভাইকিং জানায়, এই অভিবাসীরা দুই দিন ধরে সমুদ্রে ছিলেন। এ সময় তাদের কাছে কোনো পানি বা খাবার ছিল না।
শরীরে জ্বালানির কারণে পোড়ার ক্ষত
এসওএস মেদিতেরানে জানায়, “অনেকের শরীরে জ্বালানির কারণে পোড়ার ক্ষত রয়েছে।” সমুদ্রের পানির সঙ্গে পেট্রলের মিশ্রণে রাসায়নিক বিক্রিয়া তৈরি হয় এবং এর ফলে শরীরে গুরুতর পোড়া ক্ষত হতে পারে।
সাধারণত নৌকার মাঝখানে মেঝেতে এবং জ্বালানির কাছাকাছি অবস্থান করা মানুষের শরীরে এই ধরনের ক্ষত হয়৷
উদ্ধার করা অভিবাসীদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ‘চিকিৎসাজনিত কারণে’ ল্যাম্পেদুসায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ইতালির কোস্টগার্ডের একটি টহল নৌযানে করে তাকে দ্বীপটিতে নেওয়া হয়। এ সময় তার স্বামীও তার সঙ্গে ছিলেন।
দ্বিতীয় উদ্ধার অভিযানটি বুধবার ভোরে মাল্টার অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকায় পরিচালনা করা হয়।
এসওএস মেদিতেরানে জানায়, “অ্যালার্ম ফোন থেকে সতর্ক করা হয় যে আংশিকভাবে বাতাস বের হয়ে যাওয়া আরেকটি নৌকা বিপদে পড়েছে। নৌকাটিতে ৪১ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৮ পুরুষ, সাত নারী এবং ১৬ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন।”
সংস্থাটি জানায়, দ্বিতীয় নৌকার অভিবাসীরাও দুই দিন ধরে সমুদ্রে ছিলেন এবং তাদের কাছেও কোনো পানি বা খাবার ছিল না।
উদ্ধার করা অভিবাসীদের তীরে নামিয়ে দিতে ওশান ভাইকিংসকে ইটালির নেপলস বন্দরের দিকে যেতে হবে।
এসওএস মেদিতেরানের মতে, “দীর্ঘ এই যাত্রা উদ্ধার করা মানুষদের নাজুক শারীরিক অবস্থাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরও খারাপ করে তুলছে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।”
এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনে রয়েছে পিয়ান্তেদোসি ডিক্রি। ২০২২ সালে চালু হওয়া এই ডিক্রির মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এর মধ্যে অন্যতম হলো, কোনো জাহাজ প্রথমবার উদ্ধার অভিযান চালানোর পর ইতালির সরকার নির্ধারিত বন্দরে ‘বিলম্ব না করে’ যেতে হবে। ফলে রোমের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর পক্ষে আরেকটি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
অর্থাৎ, কোনো মানবিক সহায়তা জাহাজ সমুদ্রে অভিবাসীদের উদ্ধার করার পর ইতালির সরকার যে বন্দরে যেতে নির্দেশ দেয়, সেখানে সরাসরি যেতে হয়। এরপর আরেকটি বিপদগ্রস্ত নৌকার কাছাকাছি থাকলেও নতুন করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না, যদি না রোম থেকে বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়।
মানবিক সহায়তাকারীদের মতে, এর ফলে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকার কাছ থেকে অনেক দূরের বন্দরে যেতে হচ্ছে। এতে সমুদ্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে এবং জাহাজগুলোকে মধ্য ভূমধ্যসাগরের উদ্ধার এলাকা থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরে থাকতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগর অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ। প্রতি বছর লিবিয়া, টিউনিউশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে বিপজ্জনক ছোট নৌকায় করে ইউরোপের দিকে যাত্রা করেন হাজারো অভিবাসী। এসব নৌকার অনেকগুলোই সমুদ্রযাত্রার উপযোগী নয় এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৬৪৭ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন।