বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ :
• সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন • বিশ্বের চোখে বাংলাদেশের  মর্যাদা ব্যাপক ক্ষুণ্ন করছে শাহজালাল বিমানবন্দর! • শিশির মনিরকে জামায়াত থেকে বহিষ্কার চাইলেন রাশেদ খাঁন • জঙ্গল সলিমপুরে হবে পুলিশ একাডেমি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী • নিউইয়র্কে নিখোঁজের পাঁচ দিন পর বাংলাদেশি খোকনের মরদেহ উদ্ধার • চট্টগ্রামের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই • বাংলাদেশে স্টারলিংকের মোবাইল সেবা চালু • নিরাপদ পানির নিশ্চয়তায় ২৫ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার • নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের মহাধুম • ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ট্রাম্পের নগ্ন মূর্তি'র নাম ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
টাইমস স্কয়ারে দ্বিতীয়বার, নিউইয়র্ক-নিউজার্সিতে দুই ডজনের বেশি আয়োজন

নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের মহাধুম

নিউইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া—যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুর্গোৎসবের মহাধুম

ছবি সংগৃহীত

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে শরতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি অধ্যুষিত শহরগুলোতে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে নিউজার্সি, বস্টন থেকে শিকাগো, আটলান্টা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া এবং টেক্সাস থেকে বাফেলো—দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী বাঙালিরা আয়োজন করছেন দুর্গোৎসব। কোথাও কয়েক দশকের পুরোনো সংগঠনের ঐতিহ্যবাহী পূজা, কোথাও আবার নতুন প্রজন্মের উদ্যোগে গড়ে উঠছে নতুন আয়োজন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বাংলা খাবার, শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ, মেলা ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে এসব পূজা।

২০২৬ সালে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সি অঞ্চলে দুর্গাপূজার আয়োজনের ব্যাপ্তি বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন সংগঠন ও কমিউনিটি সূত্রের তালিকায় এ অঞ্চলে প্রায় দুই ডজনের বেশি পূজার আয়োজনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অক্টোবরজুড়ে নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলো কার্যত একেকটি ছোট বাংলায় পরিণত হচ্ছে।

টাইমস স্কয়ারে দুর্গোৎসব

বিশ্বের অন্যতম পরিচিত নগরকেন্দ্র টাইমস স্কয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গোৎসব। ১০ ও ১১ অক্টোবর ফাদার ডাফি স্কয়ারে আয়োজিত এ উৎসবে পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠ, ধুনুচি নাচ, নৃত্য ও সংগীতের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পীদের পরিবেশনা থাকছে। আয়োজকদের প্রকাশিত সূচিতে ১০ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজা থেকে শুরু করে সপ্তমী ও অষ্টমীর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার কথা রয়েছে।

টাইমস স্কয়ারের আয়োজনটির একটি বিশেষ দিক হলো—এটি প্রচলিত বাঙালি কমিউনিটি হলের বাইরে নিউইয়র্কের সবচেয়ে দৃশ্যমান জনপরিসরে দুর্গাপূজাকে নিয়ে এসেছে। প্রতিদিন বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের সামনে দেবী দুর্গার আরাধনা, বাংলা সংগীত, নৃত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

১০ অক্টোবর ২০২৬ মহালয়া হওয়ায় এবারের টাইমস স্কয়ার আয়োজনের সঙ্গে মহালয়ার বিশেষ তাৎপর্যও যুক্ত হয়েছে। তবে মহালয়া ও মূল দুর্গাপূজার সময়সূচির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে—আয়োজকেরা টাইমস স্কয়ারে বিশেষ কর্মসূচি হিসেবে ১০ ও ১১ অক্টোবরেই পূজার আয়োজন করেছেন।

নিউইয়র্কে দীর্ঘ ঐতিহ্য

যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার ইতিহাস খুব পুরোনো নয়, কিন্তু এর শিকড় বেশ গভীরে। নিউইয়র্কে প্রথম সংগঠিত দুর্গাপূজার আয়োজন হয় ১৯৭০ সালে। ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন নিউইয়র্কে বাঙালির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েকশ। পরবর্তী সময়ে অভিবাসী বাঙালির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজার সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

ইস্ট কোস্ট দুর্গাপূজা অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, তাদের আয়োজনে প্রতিবছর এক হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি এটি এখন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজারও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বাংলাদেশ পূজা সমিতি অব নিউইয়র্ক ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০২৬ সালে তারা ৩৭তম দুর্গাপূজার আয়োজন করছে। তাদের এবারের আয়োজন ৩১ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর। পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ এবং রাত পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি বাংলাদেশি বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত।

অর্থাৎ নিউইয়র্কে দুর্গাপূজা এখন শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; ভারতীয় ও বাংলাদেশি—উভয় ধারার বাঙালিদের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক ও নতুন প্রজন্মের পরিচয় নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

নিউজার্সি যেন আরেক বাংলা

নিউইয়র্কের পাশের নিউজার্সিতে দুর্গাপূজার আয়োজনের ব্যাপ্তি আরও বড়। জার্সি সিটির গার্ডেন স্টেট পূজা কমিটি ২০২৬ সালে ৪৫তম দুর্গোৎসব আয়োজন করছে। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর উইলিয়াম এল. ডিকিনসন হাইস্কুলে তাদের পূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজার পাশাপাশি ‘শারদ মেলা’, বাংলা খাবার, পোশাক, গয়না, বই, খোলা মঞ্চের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং সংগীতের আয়োজন থাকছে।

নর্থ জার্সি বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের পূজা হবে ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত ধারাবাহিক পূজা, ভোগ, সন্ধ্যারতি, সন্ধিপূজা ও সিঁদুরখেলার পাশাপাশি সংগীত পরিবেশনার ব্যবস্থা রয়েছে।

নিউজার্সির ক্যালললও ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর হিলসবোরোর আয়রন পিকে তিন দিনের দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে। সংগঠনটির এবারের উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ পূজা, খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সরাসরি সংগীত পরিবেশনা।

এ ছাড়া পূর্ব ব্রান্সউইক, এডিসন, হাইটসটাউন, র‌্যান্ডলফসহ নিউজার্সির বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সংগঠন পূজার আয়োজন করেছে। কোথাও পূজা পাঁচ দিন ধরে, কোথাও আবার সপ্তাহান্তকে কেন্দ্র করে দুই বা তিন দিনব্যাপী উৎসব হচ্ছে।

নিউ ইংল্যান্ডেও বাড়ছে আয়োজন

নিউইয়র্ক-নিউজার্সির বাইরে নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলেও দুর্গাপূজা এখন প্রবাসী বাঙালির অন্যতম বড় বার্ষিক উৎসব। বস্টন দুর্গাবাড়ি ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, ১৪ বছর ধরে তারা নিউ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে নিয়ে এই উৎসব আয়োজন করছেন এবং এটি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিটবিহীন—স্বেচ্ছা অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।

গ্রেটার বস্টনের বাংলা ও বিশ্ব সংগঠন ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর অ্যান্ডোভার হাইস্কুলে তিন দিনের পূজার আয়োজন করছে। রোড আইল্যান্ড ও দক্ষিণ ম্যাসাচুসেটসের বাঙালি সংগঠন বারিও ১৭ ও ১৮ অক্টোবর দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে।

কানেকটিকাটে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেটার হার্টফোর্ডের ৪০তম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর নিউইংটন হাইস্কুলে। পূজার পাশাপাশি সেখানে ভারতীয় পোশাক, গয়না, মেহেদি, খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের স্টলও থাকবে।

বাফেলো ও রচেস্টারেও দীর্ঘ ঐতিহ্য

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অন্য শহরগুলোতেও দুর্গাপূজা কয়েক দশকের ঐতিহ্য তৈরি করেছে। বাফেলোর বেঙ্গলি সাংস্কৃতিক সংগঠন সংস্কৃতি জানিয়েছে, তারা ১৯৮৬ সালে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করে। চার দশকের কাছাকাছি সময়ে পূজাটি সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষকে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
রচেস্টারে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেটার রচেস্টারের ২০২৬ সালের দুর্গোৎসব হবে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর। সেখানে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পূজা, অঞ্জলি, সন্ধিপূজা, সিঁদুরখেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে।

আটলান্টা থেকে ক্যালিফোর্নিয়া

দক্ষিণ ও পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রেও দুর্গাপূজার বিস্তার উল্লেখযোগ্য। আটলান্টায় বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেটার আটলান্টা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে। সংগঠনটির এবারের উৎসবে পূজা, খাবার এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচির পাশাপাশি শিল্পীদের পরিবেশনা থাকছে। নন্দন বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব আটলান্টাও একই সময়ে আলফারেটায় তিন দিনের পূজার আয়োজন করেছে।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার দুর্গোৎসব হবে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর। সেরিটোস সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসে আয়োজিত এ উৎসবে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধিপূজা, নবমী ও দশমীর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা থাকবে।

সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়াতেও নতুন সংগঠন ও নতুন আয়োজন দেখা যাচ্ছে। আবাহন বে এরিয়া ১০ ও ১১ অক্টোবর মিলপিটাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা আয়োজন করছে। আয়োজকেরা বলছেন, নতুন সংগঠন হলেও তাদের লক্ষ্য হলো বে এরিয়ায় বাঙালি পরিবারের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করা।

সিলিকন ভ্যালি সর্বজনীন ২৪ ও ২৫ অক্টোবর নিউয়ার্ক, ক্যালিফোর্নিয়ায় পূজার আয়োজন করেছে। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য শুধু পূজা নয়, বাঙালি ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডও এগিয়ে নেওয়া।

শিকাগো, টেক্সাস, ফ্লোরিডাতেও উৎসব

শিকাগোর ‘বেঙ্গলিস ইন শিকাগো’ ২৪ ও ২৫ অক্টোবর দুই দিনের দুর্গাপূজার আয়োজন করছে। সংগঠনটি ২০২৬ সালে তাদের পূজার ২০তম বছরে পা দিয়েছে। ২০২৫ সালের আয়োজনে ৫৭৩ জন অংশগ্রহণকারী ছিল বলে সংগঠনটির তথ্য থেকে জানা যায়।

টেক্সাসের ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকাতেও দুর্গাপূজার আয়োজন বেড়েছে। রিদম কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পূজা ২৩ ও ২৪ অক্টোবর ফার্মার্স ব্রাঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে। সংগঠনটি উত্তর টেক্সাসের দ্রুত বর্ধনশীল বাঙালি কমিউনিটির অন্যতম সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দুর্গাপূজাকে তুলে ধরেছে।

ফ্লোরিডাতেও পূজার আয়োজন রয়েছে। সোইকটের ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টারে হবে। সেখানে পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ, সিঁদুরখেলা, ধুনুচি নাচ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সরাসরি সংগীত পরিবেশনার আয়োজন রয়েছে।

অ্যারিজোনাতেও বাঙালি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো দুর্গাপূজাকে ঘিরে তিন দিনের উৎসব আয়োজন করছে। বাঙালি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনার ২০২৬ সালের আয়োজন ২৩ থেকে ২৫ অক্টোবর।

পূজার সঙ্গে খাবার, গান, নাচ ও মেলা

যুক্তরাষ্ট্রে দুর্গাপূজার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসবের একীভূত রূপ। সকালে পূজা ও অঞ্জলি, দুপুরে ভোগ বা প্রসাদ, বিকেলে শিশু-কিশোরদের অনুষ্ঠান এবং সন্ধ্যায় সংগীত বা নৃত্য—অনেক পূজার ক্ষেত্রেই এই ধারাটি দেখা যায়।
অনেক আয়োজনে বাংলা খাবারের স্টল, ভারতীয় পোশাক, গয়না, বই, মেহেদি, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসে। ফলে দুর্গাপূজা প্রবাসী বাঙালিদের জন্য একদিকে ধর্মীয় উৎসব, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক তৈরির জায়গা হিসেবেও কাজ করছে।

কিছু বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে শিল্পী আনা হচ্ছে। আটলান্টা, নিউজার্সি ও অন্যান্য শহরের পূজায় বাংলাদেশ ও ভারতের জনপ্রিয় শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনা এখন নিয়মিত আকর্ষণ। এতে পূজার সাংস্কৃতিক পরিসরও বড় হচ্ছে।

নতুন প্রজন্মকে ধরে রাখার চেষ্টা

প্রবাসে দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিকগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মকে বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখা। শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠ, নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, ঢাক বাজানো এবং স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন আয়োজনে।

টাইমস স্কোয়ারের পূজায় শিশু-কিশোরদের গীতাপাঠের আয়োজন রাখা হয়েছে। অন্যদিকে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির বিভিন্ন পূজায় শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রবণতা শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়। প্রবাসে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা, সংগীত, খাবার, পোশাক, সামাজিক সম্পর্ক এবং পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরির মাধ্যম হয়ে উঠছে দুর্গাপূজা।

ধর্মীয় উৎসব থেকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক

দুর্গাপূজা ২০২১ সালে ইউনেস্কোর মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বশীল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউনেস্কো দুর্গাপূজাকে শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, সামাজিক অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক প্রকাশের সম্মিলিত উৎসব হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটির নথিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, কলকাতার দুর্গাপূজা ভারত ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী বাঙালি প্রবাসীদের মধ্যেও পালিত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এর বাস্তব প্রতিফলনও স্পষ্ট। কয়েক দশক আগে অল্পসংখ্যক অভিবাসীর উদ্যোগে শুরু হওয়া পূজা এখন হাজারো মানুষের সমাবেশে পরিণত হয়েছে। গবেষণাতেও নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির দুর্গাপূজাকে বাঙালি অভিবাসীদের ধর্মীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিউইয়র্কের পূজা এখন সারা আমেরিকার প্রতিচ্ছবি

নিউইয়র্কে ১৯৭০ সালের ছোট পরিসরের পূজা থেকে শুরু করে আজ টাইমস স্কয়ারের মতো আন্তর্জাতিক জনপরিসরে দুর্গোৎসব আয়োজন—এই পরিবর্তন প্রবাসী বাঙালি সমাজের বিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় যেখানে কয়েকশ অভিবাসী মিলে একটি পূজা আয়োজন করতেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে একাধিক সংগঠন পৃথকভাবে পূজা করছে।

২০২৬ সালের আয়োজনগুলো দেখাচ্ছে, দুর্গাপূজা এখন আর শুধু নিউইয়র্ক, নিউজার্সি বা বোস্টনের মতো ঐতিহ্যবাহী বাঙালি কেন্দ্রগুলোর উৎসব নয়। আটলান্টা, ডালাস, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, অ্যারিজোনা, বাফেলো ও রচেস্টারসহ দেশটির নানা প্রান্তে এটি প্রবাসী বাঙালির বার্ষিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

প্রতিমার সামনে অঞ্জলি থেকে শুরু করে ধুনুচি নাচ, বাংলা গান, ভোগের খিচুড়ি, শিশুদের নাচ-গান, বন্ধুদের আড্ডা কিংবা বিজয়ার সিঁদুরখেলা—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্গাপূজা এখন একধরনের ‘ঘরে ফেরার’ অনুভূতি তৈরি করে। আর সেই ঘর কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থান নয়; প্রবাসে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির কাছে সেটি হয়ে উঠেছে স্মৃতি, সংস্কৃতি, পরিবার ও সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ঠিকানা।

ঠিকানা/এনআই

নিউজটি শেয়ার করুন


সর্বশেষ আপডেট

© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz