বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০৩০ সালে শীর্ষ ৩০-এ যেতে পারে: ইইউ
ঠিকানা অনলাইন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০৪
•
অনলাইন সংস্করণ
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটি হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে মাইকেল মিলার বলেন, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশের পরিধি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বড়।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি অন্যতম। একই সঙ্গে রাজনৈতিক রূপান্তর, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামলে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে দেখছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন—এমন মন্তব্য করে মাইকেল মিলার বলেন, সম্পর্ককে আর শুধু দাতা ও সাহায্যগ্রহীতার প্রচলিত কাঠামোয় দেখতে চায় না ইইউ। বরং উভয় পক্ষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে চায় তারা।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে মসৃণ ও সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একসঙ্গে কাজ করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনাও যাচাই করতে আগ্রহী ইইউ।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই এ ধরনের প্রস্তাব দেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম ও অনন্য উদ্যোগ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মাইকেল মিলারের ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য ইইউর মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশ যে গতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাবে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তবে সম্ভাব্য এফটিএর আগে দুই পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে ভারতের সঙ্গে এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদাহরণ তুলে ধরেন ইইউ রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সাফল্য শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করবে না। জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মাইকেল মিলার বলেন, এসব বিষয়কে কোনোভাবেই গৌণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ভিত্তি হিসেবে এগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং পূর্বানুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত সাংবিধানিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার ওপরও গুরুত্ব দেন। এ জন্য দেশের রাজনৈতিক পরিসরে আরও বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি, সবুজ প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং তরুণদের জন্য অর্থবহ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য বা ডেটার স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্ব দেন মাইকেল মিলার।
বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ সহযোগিতার প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউরোপীয় মূল্যবোধের সঙ্গে ইউরোপীয় বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটিয়ে বাংলাদেশে প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও উদ্ভাবন নিয়ে আসতে চায় ইইউ।
এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং গ্রিন বন্ড ইস্যুর মতো উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবের একটি বড় মূল্য সংযোজন হলো সরকারি প্রশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং একই সঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজকে নতুনভাবে সংগঠিত করার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায় ইইউ।
বাংলাদেশ যেন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ সামলে আধুনিক ও শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে এবং একই সঙ্গে উন্মুক্ত, সার্বভৌম, সহনশীল ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে—এই লক্ষ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদারত্বের প্রস্তাব বলে জানান মাইকেল মিলার।
অনিশ্চয়তার বিশ্বে নির্ভরযোগ্য অংশীদার চায় ইইউ
বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অবস্থানও তুলে ধরেন ইইউ রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে নেওয়া নয়। বরং উন্মুক্ত থাকা, তবে অসচেতন না হওয়া; বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকা, তবে কোনো একটি পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া—এটাই ইইউর অবস্থান।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব ক্রমেই বেশি লেনদেননির্ভর হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্যতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং নীতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা, ন্যায্য ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা এবং কার্যকর বহুপাক্ষিকতার পক্ষে অবস্থান করছে।
মাইকেল মিলার বলেন, অনিশ্চয়তার সময়ে দেশ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন অংশীদার প্রয়োজন, যারা নির্ভরযোগ্য এবং প্রতিটি সম্পর্ককে কেবল একটি লেনদেন হিসেবে দেখে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সহনশীলতায় বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত এমন অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায় ইইউ।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এ ক্ষেত্রে ইইউর ‘গ্লোবাল গেটওয়ে’ উদ্যোগকে বুদ্ধিমান, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির একটি বাস্তবভিত্তিক মডেল হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন দেশটির সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় বলে বক্তব্যে স্পষ্ট করেন মাইকেল মিলার। তার মতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক ঐকমত্য, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের সামনে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।