বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
কাজী নজরুল ইসলাম

বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশ

বর্তমান বিশ্ব ও বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
কাজী নজরুল ইসলাম, তুমি এক নির্ভীক সৈনিক, বিদ্রোহ করলে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং সর্বোপরি সর্বপ্রকার শোষণের বিরুদ্ধে। তোমার বলিষ্ঠ ও সুচারু লেখনী দিয়ে তোমার অসাধারণ সৃজনশীলতার মাধ্যমে তুমি সৃষ্টি করলে এক কালজয়ী সাহিত্যের রত্নসম্ভার, মানবতার প্রতি ও পৃথিবীর প্রতি তোমার নিবিড় শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার অনুভূতি তুলে ধরলে এবং তুমি আত্মপ্রকাশ করলে তোমার সুতীক্ষè জীবনবোধ ও জীবনদর্শনের মাধ্যমে। তোমার লেখনীর শক্তি দিয়ে তুমি জাগিয়ে তুলেছিলে ভারতবাসীকে, কাঁপিয়ে তুলেছিলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি এবং বারবার প্রমাণ করেছ, অস্ত্রের চাইতে লেখনী অনেক বেশি শক্তিশালী। ধূমকেতু পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করে তুমি লিখেছিলে, ‘ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সব থাকবে ভারতীয়দের হাতে। যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশানভূমিতে পরিণত করেছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা পুঁটলি বেঁধে সাগরপাড়ে পাড়ি দিতে হবে।’

তোমার যে বলিষ্ট কণ্ঠ একদিন গর্জে উঠেছিল শৃঙ্খলিত ভারতীয়দের মুক্তির দাবিতে, আজ আবার সেই কণ্ঠই উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে বিশ্বকে, মানবমুক্তি, শান্তি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে আসতে। দেশ, কাল ও ভাষার বেড়াজাল পেরিয়ে তোমার কণ্ঠ আজ বেজে চলেছে বিশ্বময়।

তুমি তোমার বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে যত্নশীল হওয়ার কথা বললে। ‘রোজ-কেয়ামত বা প্রলয় দিন’ প্রবন্ধে নানাবিধ বৈজ্ঞানিক আলাপ-আলোচনার সূত্র ধরে তুমি বুঝিয়েছ যে জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহারের ফলে কীভাবে জলবায়ু দূষিত হয়ে উঠছে, ভৌগোলিক উষ্ণতা বেড়ে চলেছে, সমুদ্রের জলের উচ্চতা বেড়ে চলেছে এবং পৃথিবী কীভাবে আসন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতে চলেছে। এ প্রসঙ্গে তুমি মানুষকে সচেতন হতে আহ্বান জানালে।

বর্তমান বিশ্ব
নজরুল, আজকের পৃথিবীতে তুমি ফিরে এলে তোমার অন্তরাত্মা বেদনায় মুষড়ে পড়ত। ভারতবর্ষের পটভূমিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অন্যায়, অত্যাচার ও বর্বরতার যে নৃশংস ইতিহাস রচিত হয়েছিল, আজ আবার তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে সমগ্র বিশ্বে। পৃথিবী আজ খণ্ডিত—দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা বিশেষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শত শত খণ্ডে খণ্ডিত। হিংসা-বিদ্বেষের দাবানল জ্বলে উঠছে চারপাশে। নটরাজের মতো প্রলয়ের নেশায় মেতে উঠেছে মানুষ। ধর্মের ভেলায় চড়ে দস্যুর পতাকা উড়িয়ে মানুষ চালাচ্ছে মানুষেরই ধ্বংসযজ্ঞ। মানবকল্যাণ সাধনের নামে মানুষের মৃতদেহের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ সোচ্চার করছে তার জয়গান, হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের পিরামিডের চূড়ায় দাঁড়িয়ে প্রচার করছে তার বিজয়, ভাষণ দিচ্ছে হাজার মানুষের শবযাত্রার মিছিলে। তাসের দেশের মতো ধসে পড়ছে একেকটা দেশ, একেকটা সভ্যতা, একেকটা ইতিহাস। নবজাত শিশুর প্রথম ক্রন্দনের শব্দ চাপা পড়ে যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রের গর্জনে, সে হাঁটতে শিখেই হাতে তুলে নিচ্ছে মারণাস্ত্র তার প্রথম খেলনা মনে করে। গণতন্ত্রের নামে, দেশপ্রেমের নামে চলছে তাণ্ডবনৃত্য, ধর্মের নামে চলছে জিঘাংসা।

বিশ্ব তরণী আজ উত্তাল তরঙ্গের মুখে আসন্ন দুর্যোগের কবলে। রাজনৈতিক বর্বরতা আর ভৌগোলিক উষ্ণতার কবলে আসন্ন বিপর্যয়ের সম্মুখীন আজ পৃথিবী, ক্ষমতাসীন মানুষের দানবীয় কার্যক্রমের ফলে পৃথিবী আর প্রকৃতি আজ বিপর্যস্ত। অনর্গল বোমাবর্ষণ ও জনারণ্য ধ্বংস হওয়ার ফলে আকাশ-বাতাস দূষিত হয়ে উঠছে, সূর্যের আলো মøান হয়ে উঠছে আর পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের নীলনকশার ফলস্বরূপ ফসিল ফুয়েল নিয়ে চলছে দেশে দেশে রাজনীতি, চলছে যুদ্ধ, চলছে জলবায়ু দূষণের খেলা, প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতি চলছে চূড়ান্ত অবহেলা।

নজরুল, শুধু যদি আরেকবার বেজে উঠত তোমার কণ্ঠের মানবতার বাণী, একতার বাণী, ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরত কোটি কোটি কণ্ঠে, পৃথিবীর প্রতিটি কোনায়, দেখাতে পারত সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা, ন্যায় ও সত্যের পথ, হয়তো-বা তবে মানবজাতি ফিরে পেত মুক্তির পথ আর শান্তির পথের দিশা। তোমার অসাধারণ দূরদর্শিতা, অপরিসীম সহমর্মিতা আর আপসহীন নৈতিকতা একটি সুন্দর ও সৌহার্দ্যময় পৃথিবী গঠনে দিকনির্দেশনা করত।

আবার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরুক, ‘গাহি সাম্যের গান-/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। ... ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে বাজুক ... এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা বৃন্দাবন,/ বুদ্ধ-গয়া, জেরুজালেম, মদিনা, কাবা-ভবন,/ মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,/ এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়’, ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরুক কোটি কণ্ঠে পৃথিবীর প্রতিটি কোনায়। তোমার আদর্শের আলোকে ধুয়ে যাক সব ক্লেদ-গ্লানি।

আবার তুমি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানাও সেই বীর কান্ডারিকে, কঠিন হাতে ধরতে বলো ডুবন্ত তরীর হাল, মানুষ বেঁচে উঠুক জীবনের স্পন্দনে আসন্ন ধ্বংসের কবল থেকে। তুমি গেয়ে ওঠো, “দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার হে/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার! ... দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ/ ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?/ ... ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম?’ ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কান্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার!” তুমি মানুষকে সচেতন করে তোলো, আন্দোলন গড়ে তোলো, ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের বিরুদ্ধে; অনুপ্রাণিত করো রিনিউয়েবল জ্বালানি ব্যবহার করতে, প্রকৃতিকে সংরক্ষণ করতে এবং জীবজগৎকে সংরক্ষণ করতে যত্নশীল হতে। দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ করতে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে।
আবার বেজে উঠুক তোমার উদাত্ত কণ্ঠের উল্লাস, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-/ মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে’, তোমার কণ্ঠের সেই বাণীই আবার ধ্বনিত হোক দিকে দিকে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোমার পরিচিতি
আজ যেসব সমস্যা সমগ্র বিশ্বকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে সমগ্র বিশ্বে তোমাকে জানার এবং তোমার সাহিত্য ও দর্শন সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করার লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চলছে। আজ আমেরিকায়, জাপানে, চীন দেশে, রাশিয়াতে, আয়ারল্যান্ডে, মধ্যপ্রাচ্যে ও আরও অনেক দেশেই তোমাকে জানার, তোমার জীবন দর্শনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নতুন করে পৃথিবীকে গঠন করার প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। আমেরিকায় দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে—ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটে এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে নজরুল এনডাউমেন্টের মাধ্যমে এসব বিষয়বস্তু নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে এবং সেমিনার ও ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইউনিভার্সিটি অব কানেক্টিকাটে গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘Antislavery & Anticolonialism: Nazrul in context’ এবং ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘Nazrul & Religious Harmony’. বিশ্ববিদ্যালয়ের undergraduate শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেও নজরুলের দর্শন ও সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ ছাড়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদেরাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে নজরুলের ওপর গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন, বই লিখছেন, সেমিনার দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য হচ্ছেন Prof. Winston E. Langley, University of Massachusetts. Massachusetts, USA, Prof. Rachel F. McDerMott. Columbia University, New York, USA, Prof. Jason Chang, University of Connecticut, Connecticut, USA, Rachel Syed, Berkeley University, California, USA এবং আরও অনেকে।

নজরুল, তোমার জীবনের শেষ ভাষণ ‘যদি আর বাঁশি না বাজে’, এতে তুমি বললে, ‘আমার বাঁশি বিরহ যমুনার তীরে ফেলে চলে যাব। শুষ্ক যমুনার বালুচর থেকে সেই বেনু কুড়িয়ে যদি অন্য কেউ বাজাতে পারেন তবে আমার ফেলে যাওয়া বাঁশি ধন্য হবে।’ আজ দেশ, কাল ও ভাষার বেড়াজাল পেরিয়ে তোমার সেই ফেলে যাওয়া বাঁশি বেজে চলেছে বিশ্বময়!

বাংলাদেশ
স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের জনসাধারণের ভোটে নিযুক্ত হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। শ্রদ্ধেয় তারেক রহমান বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এই বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর আদর্শে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে পুনরায় একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
তরুণ সমাজকে উজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান দেশ পুনর্গঠনের কাজে এগিয়ে আসতে। তিনি বলেন, ‘তোমাদের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, দুর্দান্ত সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি নতুন বাংলাদেশ এবং তোমাদের ওপরই দেশ তাকিয়ে রয়েছে আগামীর পথে দেশকে এগিয়ে নিতে।’ তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রকৃতি সংরক্ষণে খাল খনন করতে, নদী খনন করতে, সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামলা বাংলাদেশ গড়তে এগিয়ে আসার প্রত্যয় নিয়ে। বাংলাদেশের নেতা, প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় তারেক রহমানের সঙ্গে দেশ গঠনে এগিয়ে আসার জন্য আমরাও অঙ্গীকারবদ্ধ।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz