বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬

বিজ্ঞাপন
​নিউইয়র্কে ড. সলিমুল্লাহ খান

মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হবে না

মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হবে না

বিজ্ঞাপন
মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও চিন্তাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ভাসানীর উপস্থিতি ছিল। তাই ইতিহাসে তাঁর অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। গত ২০ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের উডসাইডে কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ভাসানী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ভাসানী ফাউন্ডেশন নিউইয়র্কের উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে প্রবাসী বাংলাদেশি, লেখক, গবেষক, রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, “মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল।”
তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের নেতা। ক্ষমতা দখলের চেয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
“ভাসানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। তিনি ক্ষমতার কাছে যাননি; বরং ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন,” বলেন ড. সলিমুল্লাহ খান।
মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশীয় শোষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও ভাসানী আজীবন সোচ্চার ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে তিনি একই সূত্রে দেখতেন।
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তাধারাকে কেবল স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তাঁর জনমুখী রাজনীতি, মানবতাবাদী দর্শন এবং শোষণবিরোধী অবস্থান নতুন করে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতের একজন নেতাকে স্মরণ করা নয়। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ দেশের কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসা।”
বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা প্রসঙ্গে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, একটি ব্যক্তি, দল কিংবা নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসকে বিচার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ধারা আড়ালে থেকে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। সেই ইতিহাসে মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনের অবদান রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একজনকে এককভাবে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একাধিক প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বের ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসও বিভিন্ন নেতা, আন্দোলন ও রাজনৈতিক ধারার সম্মিলিত অবদানের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মওলানা ভাসানীর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাসানী কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতি করেননি। হিন্দু-মুসলমানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ধর্ম, সম্প্রদায় বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা তুলে ধরে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, আসাম থেকে পূর্ববাংলা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, ইতিহাসকে তার নিজস্ব সময় ও প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে। পরবর্তী সময়ের রাষ্ট্রীয় বা দলীয় বয়ান দিয়ে অতীতের সব ঘটনা ও ব্যক্তির ভূমিকা বিচার করলে ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আড়ালে থেকে যায়।
বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের প্রসঙ্গও টেনে আনেন ড. সলিমুল্লাহ খান। ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ বক্তৃতা ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণ বা ‘সেগ্রিগেশন’ চালু ছিল। সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল সার্বজনীন মানবতার ধারণা। মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনেও একই ধরনের মানবতাবাদী চেতনার শক্তিশালী ধারা দেখা যায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণআন্দোলন ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, জনগণের সম্মিলিত শক্তিকে উপেক্ষা করে কোনো শাসনব্যবস্থা স্থায়ী হতে পারে না। মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম শিক্ষা হলো- জনগণই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা।
তিনি বলেন, “জনগণের শক্তিকে যারা ছোট করে দেখে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই ভুল প্রমাণ করে। ভাসানী সারাজীবন জনগণের সেই শক্তির ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন।”
মওলানা ভাসানীর জীবন, সংগ্রাম, রাজনৈতিক চিন্তা ও বক্তব্য নিয়ে আরও গবেষণার পাশাপাশি তাঁর লেখা ও ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন ড. সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিকাশে যাঁরা অবদান রেখেছেন, ইতিহাসের স্বার্থেই তাঁদের প্রত্যেকের অবদান যথাযথভাবে স্বীকার করা প্রয়োজন।
সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সফররত প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন। 
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন লেখক ও গবেষক এম. সিরাজ উদ্দিন মিয়া, সমাজসেবক ও রাজনীতিক নাহিদ এইচ খান, রাজনীতিক এমরানুল হক চাকলাদার, লেখক, গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার, সংগঠনের কার্যকরী সদস্য ফার্মাসিস্ট সৈয়দ টিপু সুলতান এবং চিকিৎসা গবেষক জুনাইদ আহমেদ এহসান। প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তফা করিম ফরিদ। 
সম্মেলন আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মূলধারার রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী গিয়াস আহমেদ। সদস্য সচিব ছিলেন সাপ্তাহিক নবযুগ সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সাগর এবং সমন্বয়কারী ছিলেন কাজী আজম। ভাসানী ফাউন্ডেশন নিউইয়র্কের সভাপতি আলী ইমাম শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসেরসহ সংগঠনের কর্মকর্তারা সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
অনুষ্ঠানে মওলানা ভাসানী এবং বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে লোক ও মরমি সংগীত পরিবেশন করেন প্রবাসী শিল্পীরা। অতিথিদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
আলী ইমাম সভাপতি, শাহাব উদ্দিন সাগর সাধারণ সম্পাদক : সম্মেলনে ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনকের ২০২৭-২০৩০ মেয়াদের নতুন কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের।
নতুন কমিটিতে মোহাম্মদ আলী ইমাম পুনরায় সভাপতি এবং শাহাব উদ্দিন সাগর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। সহ-সভাপতি হয়েছেন মোস্তফা করিম ফরিদ ও কাজী সাখাওয়াত হোসেন আজম। যুগ্ম সম্পাদক নাজমুল আলম শ্যামল, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম ফেরদৌস, কোষাধ্যক্ষ নূর আমিন, ওভারসিজ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, প্রচার, তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক তানভির করিম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নার্গিস রহমান, সমাজকল্যাণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শিপন এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন সৌমিত্র দস্তিদার।
কার্যকরী সদস্যরা হলেন- এম এ সাদেক, শাহ আলম দুলাল, খন্দকার ফরহাদ, মাহমুদ খান তাসের, কিউ জামান, আবদুর রহিম হাওলাদার, এবিএম সালাহউদ্দিন, ফারুক হোসেন মজুমদার, বাসেত রহমান ও বিল্লাল চৌধুরী। এ ছাড়া মঈনুদ্দীন নাসের পদাধিকারবলে কমিটির সম্মানিত সদস্য হিসেবে থাকবেন।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্মেলন-পরবর্তী কার্যকরী কমিটির বৈঠকে ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টামণ্ডলী গঠন করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন


© 2026 All Rights Reserved by Thikana Group Of Media
Maintained by SolveEz